
আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের আলোচনায় চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। কুনমিং থেকে মান্দালয় হয়ে বঙ্গোপসাগরের তীরে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর পর্যন্ত সড়ক ও রেলপথের স্বপ্ন নতুন নয়। চলতি বছরের জুনে প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফরের পর প্রস্তাবিত চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর আবার আলোচনার কেন্দ্রে। করিডোরের প্রস্তাব আকর্ষণীয় হলেও মাটিতে বাস্তবতা অনেক জটিল। করিডোরের প্রস্তাবের ব্যাপারে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত না দিলেও বাংলাদেশ চীনের সাথে অর্থনীতির ব্যাপ্তি ও যোগাযোগ বাড়াতে চায়। এ প্রস্তাব কার্যকর করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও চীন, দুই দেশকে মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতির অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে।
প্রস্তাবিত এই করিডোরকে কেবল সড়ক, রেলপথ ও বন্দর সংযোগের প্রকল্প হিসেবে দেখলে এর পূর্ণ তাৎপর্য বোঝা যাবে না। এর সাথে জড়িয়ে আছে মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ, রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, চীনের আঞ্চলিক কৌশল এবং ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাগত হিসাব-নিকাশ। এই অর্থনৈতিক করিডোরের প্রস্তাব ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ায় এক নতুন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ চড়তে শুরু করেছে। এক দিকে যুক্তরাষ্ট্রের মানবিক করিডোরের চাপ, অন্য দিকে চীনের অর্থনৈতিক করিডোরের প্রস্তাব, আর এই দুইয়ের বিপরীতে প্রতিবেশী ভারতের চরম বিরোধিতা। বাংলাদেশের জন্য তাই প্রশ্নটি শুধু করিডোর নির্মাণের সাথে সম্পৃক্ত নয়; বরং জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা সুরক্ষিত রেখে কিভাবে অর্থনৈতিক সুযোগ কাজে লাগানো যায়।
করিডোরের ধারণার জন্ম নেয় ১৯৯৯ সালে, যখন বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (বিসিআইএম) অর্থনৈতিক করিডোরের প্রস্তাব ওঠে। বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ নিয়ে কৌশলগত উদ্বেগ এবং দিল্লি-বেইজিং সম্পর্কের টানাপড়েনে কুনমিং, মান্দালয়, ঢাকা ও কলকাতা সংযোগের সেই পরিকল্পনা থেকে ভারত ধীরে ধীরে সরে যায়। ভারতকে বাদ দিয়ে নতুন যেরূপে প্রস্তাবটি ফিরেছে, তাতে বিসিআইএমের জায়গায় এসেছে ত্রিপক্ষীয় কাঠামো। চীন ইতোমধ্যে মিয়ানমারে নিজস্ব করিডোর গড়েছে। ইউনান থেকে মান্দালয় হয়ে রাখাইনের কিয়াউকফিউ পর্যন্ত তেল-গ্যাস পাইপলাইন আছে, গভীর সমুদ্রবন্দরের পরিকল্পনাও আছে। বাংলাদেশ পর্যন্ত সম্প্রসারণ মানে বেইজিংয়ের জন্য বঙ্গোপসাগরে দ্বিতীয় প্রবেশদ্বার। বাংলাদেশের জন্য এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে বাণিজ্যিক সংযোগ জোরদার করার সম্ভাবনা।
প্রস্তাবটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও প্রস্তাবটি যাচাই-বাছাইয়ের কথা জানিয়েছিল। তাই পূর্ণাঙ্গ রুট, অর্থায়ন, বাস্তবায়নকাল, পরিচালনাব্যবস্থা ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত শর্ত কিছু চূড়ান্ত হয়নি। তবে প্রস্তাবিত পথ মোটামুটি এমন : কুনমিং থেকে মান্দালয়, সেখান থেকে রাখাইন হয়ে বাংলাদেশের সীমান্ত, তার পর কক্সবাজার-চট্টগ্রাম বা মোংলা বন্দর। তবে কোন অংশে সড়ক, কোথায় রেলপথ এবং কিভাবে বন্দর ও সীমান্ত অবকাঠামো সমন্বিত হবে, তা এখনো চূড়ান্ত নয়। করিডোরের অর্থনৈতিক যুক্তি জোরালো। বাংলাদেশ পাবে বিশাল বাজার ও বিনিয়োগের সুযোগ। চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের স্থলবেষ্টিত প্রদেশগুলো সমুদ্রে সহজ প্রবেশ পাবে। মিয়ানমারের জন্যও বাণিজ্যপথ খুলবে। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর এ অঞ্চলের বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার হতে পারে। চীনা বিনিয়োগ, সড়ক-রেল সংযোগ, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও ট্রানজিট ফি দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। সীমান্ত বাণিজ্য পুনরুজ্জীবিত হলে কক্সবাজার-বান্দরবান অঞ্চলের অর্থনীতিও চাঙ্গা হবে। কিন্তু এসব সুবিধা পেতে হলে বাংলাদেশকে শর্ত নির্ধারণের ক্ষমতা রাখতে হবে। শর্ত নির্ধারণে দুর্বলতা দেখালে ঋণের ফাঁদ, একতরফা চুক্তি ও কৌশলগত নির্ভরতার ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হবে।
করিডোর চালু হলে এসব সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাওয়া যাবে এমনও নয়। করিডোর দিয়ে চীনা পণ্যের আমদানির বিপরীতে বাংলাদেশের রফতানি সমান হারে না বাড়লে বাণিজ্য ভারসাম্য আরো খারাপ হতে পারে। শুধু ট্রানজিট সুবিধা দিয়ে বাংলাদেশের প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক লাভ নিশ্চিত হবে না। স্থানীয় শিল্প, পরিবহনসেবা, বন্দর ব্যবস্থাপনা ও রফতানিকারকদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। তাই প্রকল্পের অর্থনৈতিক মূল্যায়নে কেবল কত পণ্য পরিবহন হবে তা নয়; বরং বাংলাদেশ কত রাজস্ব পাবে, কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, রফতানি কতটা বাড়বে এবং ঋণের বিপরীতে কী পরিমাণ আয় আসবে— এসব প্রশ্নের উত্তর থাকা জরুরি।
কারণ কোনো অবকাঠামো নিজে সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না। চীন-লাওস রেলওয়ে, চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর কিংবা শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের অভিজ্ঞতা ওই শিক্ষা দেয়। কোথাও ঋণের বোঝা, কোথাও নিরাপত্তা সঙ্কট, কোথাও প্রত্যাশিত বাণিজ্যের অভাবে এসব প্রকল্প প্রত্যাশিত সাফল্য এনে দিতে পারেনি। তাই করিডোরকে তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক সমাধান না ভেবে দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক সংযোগের সম্ভাবনা হিসেবে দেখা যুক্তিসঙ্গত।
করিডোরের ভাগ্য অনেকটা নির্ভর করবে মিয়ানমারের বিবদমান দু’পক্ষের অবস্থানের ওপর। জান্তা সরকার আইনি স্বীকৃতি ও আন্তর্জাতিক চুক্তির কাঠামো দিতে পারবে, কিন্তু রাখাইনের বড় অংশে তার কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই। অন্য দিকে আরাকান আর্মি বাংলাদেশ সীমান্তের অধিকাংশ এলাকার ওপর প্রভাব প্রতিষ্ঠা করেছে। সেই সাথে নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলেছে। ফলে আরাকান আর্মির সম্মতি ছাড়া রাখাইনে কোনো করিডোর কার্যকর হবে না।
এ পরিস্থিতিতে জান্তা সরকারের সাথে চুক্তি করলে করিডোরের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। প্রকল্পের রুট আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রিত এলাকা অতিক্রম করলে সড়ক ও রেলপথ নির্মাণ, শ্রমিকদের নিরাপত্তা, পণ্য চলাচল ও অবকাঠামো রক্ষায় আরাকান আর্মির সাথে কার্যকর সমঝোতার প্রয়োজন হবে। তবে আরাকান আর্মির সাথে যোগাযোগের অর্থ তাদের স্বীকৃতি কিংবা মিয়ানমারের সার্বভৌমত্ব নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান পরিবর্তন করা নয়। এটি হবে সীমান্তের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ নিয়ে বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত।
বাংলাদেশের আশ্রয়ে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী আছে। রাখাইনে স্থিতিশীলতা ও রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন ছাড়া করিডোরের কোনো টেকসই ভিত্তি নেই। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মি উভয়ের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের ওপর গুরুতর নির্যাতনের অভিযোগ আছে। করিডোরের নিরাপত্তার স্বার্থে চীন যদি সত্যিই রাখাইনে স্থিতিশীলতা চায়, তবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে প্রকল্পের অংশ বা পূর্বশর্ত করতে তার ওপর কূটনৈতিক চাপ দেয়া যায়। অর্থনৈতিক প্রকল্পের নামে রোহিঙ্গা প্রশ্ন ঢাকা পড়ে গেলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক পুঁজি নষ্ট হবে। কোনো লিখিত নিশ্চয়তা ছাড়া করিডোরের অগ্রগতি মানে রোহিঙ্গা সঙ্কটের স্থায়ী বোঝা মেনে নেয়া। করিডোর নিয়ে যেকোনো আলোচনায় রোহিঙ্গা ইস্যু আমাদের সবচেয়ে বড় দরকষাকষির ক্ষেত্র হওয়া উচিত।
সবচেয়ে সংবেদনশীল প্রশ্নটি নিরাপত্তার। রাখাইনের অস্থিরতা সীমান্ত পেরিয়ে আসতে পারে : অস্ত্র ও মাদক পাচার, নতুন শরণার্থী ঢল, সশস্ত্র গোষ্ঠীর কার্যক্রম। সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে এবং বাংলাদেশ কি অন্যের ভূরাজনীতির মঞ্চ হয়ে উঠবে? এসব প্রশ্নের উত্তর আগে খুঁজতে হবে। একই সাথে সম্ভাব্য এসব সমস্যা সমাধানের প্রস্তুতিও নিতে হবে।
অন্য দিকে অর্থনৈতিক করিডোরের পেছনে বেইজিংয়ের হিসাব স্পষ্ট। মালাক্কা প্রণালীর ওপর নির্ভরতা কমানো, বঙ্গোপসাগরে সরাসরি প্রবেশ, ইউনানসহ দক্ষিণ-পশ্চিম প্রদেশের উন্নয়ন এবং দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার। এসব করিডোর শুধু অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগত গভীরতা তৈরির হাতিয়ারও। চীন-পাকিস্তান করিডোরে বালুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হামলা বেইজিংয়ের জন্য একটি সতর্কবার্তা। তবু ঝুঁকি নিয়ে চীন বাংলাদেশ পর্যন্ত অর্থনৈতিক করিডোর বাস্তবায়ন করতে চায়, কারণ দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত লাভ তার কাছে অগ্রাধিকার। তবে চীনের কৌশলগত সুবিধা এবং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ সব ক্ষেত্রে এক হবে এমন নিশ্চয়তা নেই। চীন দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ চাইতে পারে; বাংলাদেশকে একই সাথে ঋণের স্থায়িত্ব, বাণিজ্যিক লাভ, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক ভারসাম্য বিবেচনা করতে হবে। রাখাইনে ভারতের নিজস্ব বিনিয়োগ ও কালাদান প্রকল্প থাকায় সে এ অঞ্চলে সক্রিয় থাকতে চাইবে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের সম্প্রসারণ, গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও সরবরাহপথে চীনের প্রভাব এবং বঙ্গোপসাগরে বৃহত্তর কৌশলগত উপস্থিতির বিষয়গুলো বিবেচ্য হতে পারে।
তাই বাংলাদেশকে প্রথমে করিডোরের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করে ধাপে ধাপে আলোচনায় জোর দেয়া উচিত। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে লিখিত ও সময়সীমাভিত্তিক নিশ্চয়তাসহ করিডোর আলোচনার কেন্দ্রীয় শর্ত করা দরকার। একই সাথে ভারত, যুক্তরাষ্ট্রকেও আস্থায় রাখা জরুরি। বাংলাদেশকে চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র কারো শিবিরে পুরোপুরি না ঢুকে স্বার্থভিত্তিক ভারসাম্যপূর্ণ নীতি বজায় রাখতে হবে। জনগণকে আস্থায় রাখতে চুক্তির শর্ত, অর্থায়ন ও ঋণের কাঠামো স্বচ্ছ রাখা এবং সংসদ ও জনগণের সামনে উন্মুক্ত আলোচনা প্রয়োজন। সেনাবাহিনী, কূটনীতিক ও অর্থনীতিবিদদের সমন্বয়ে একটি সমন্বিত জাতীয় অবস্থান তৈরি করা উচিত, যাতে নিরাপত্তা উদ্বেগ আলোচনার টেবিলে প্রতিফলিত হয়।
বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত করিডোরের সমর্থনকে কোনো বৃহৎ শক্তির প্রতি আনুগত্যের প্রশ্নে পরিণত না করা; বরং বাস্তবসম্মত সম্ভাব্যতা যাচাই, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, স্বচ্ছ অর্থায়ন, রফতানি বৃদ্ধির সুযোগ ও রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের অগ্রগতিকে সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে রাখতে হবে। কারণ ভূগোল সুযোগ তৈরি করতে পারে; কিন্তু সেই সুযোগকে জাতীয় স্বার্থে রূপান্তর করতে প্রয়োজন দূরদর্শী কূটনীতি, স্বচ্ছ অর্থনৈতিক হিসাব এবং সুস্পষ্ট নিরাপত্তা নীতি। মনে রাখতে হবে, চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর ঢাকার জন্য একই সাথে একটি অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও কূটনৈতিক পরীক্ষা। এটি সফল হলে আঞ্চলিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ, পরিবহন এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক যোগাযোগে নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
লেখক : এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজ অ্যান্ড থটস (কাস্ট), সাবেক অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








