অধ্যাপক ডা. শাহ মো: বুলবুল ইসলাম
অধ্যাপক ডা. শাহ মো: বুলবুল ইসলাম। নয়া দিগন্ত

প্রসঙ্গ-১
চলতি মাসের ১৫ ও ১৬ তারিখে নীলফামারী, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও যেতে হয়। ঠাকুরগাঁও শহরে পৌঁছি রাত প্রায় ১১টার দিকে। আশ্চর্য হই এত রাতে রাস্তায়, দোকানে, হোটেলে মানুষের ভিড় দেখে। যেন তিল ধারনের জায়গা নেই। উপলক্ষ আসন্ন দুর্গাপূজা। ভালো লেগেছিল এটা দেখে যে, প্রায় মধ্যরাতেও আমাদের সনাতনধর্মী ভাইবোনেরা সপরিবারে নিশ্চিন্তে কেনাকাটা করতে বেরিয়েছেন। নিরাপত্তার নিশ্চয়তা তাদের এত রাতে বাইরে বেরোবার সাহস জুগিয়েছে। তারা সারা দেশে উৎসবমুখর পরিবেশে পূজার আনন্দে মেতেছেন, আনন্দ অনুভূতি ভাগাভাগি করেছেন প্রতিবেশী বন্ধুবান্ধব ও নিকটজনের সাথে। এমন নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সরকার অবশ্যই প্রশংসা পাবার যোগ্য। এটি বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অপূর্ব চিত্র। সনাতন ধর্মীদের এই আনন্দধারায় দেশের মুসলিম সম্প্রদায় সহযোগিতা করেছেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে। যদিও কিছু ক্ষেত্রে এই স্বতঃস্ফূর্ততা দৃষ্টিকটু ঠেকেছে। বিশেষ করে সরকারীদলের কিছু নেতার বক্তব্যে। যেমন, ‘সমস্ত পৃথিবীর অন্যায় অনিয়ম দূর করার জন্য মা দুর্গার আবির্ভাব।’ ‘দুর্গাপূজা পুরো বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ উৎসব।’ ‘দুর্গাপূজা শুধু হিন্দুদের নয়, এটা বাঙালি জাতির উৎসব।’ এবং ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’। এসব বক্তব্য জাতীয়তাবাদের ধারণা এবং নিজ ধর্মবিশ্বাসের সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ তা নিয়ে যে কারো মনে প্রশ্ন জাগতে পারে। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের যে ধারণায় দেশের পথচলা উপরোক্ত বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞাকে নতুনভাবে ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তার প্রশ্ন আসে স্বাভাবিকভাবেই। অন্য দিকে পৃথিবীর সব ভালোমন্দ, জীবনমৃত্যু, শাস্তিদাতা, পুরস্কারদাতা ও খাদ্যের মালিক একমাত্র আল্লাহ, এই বিশ্বাসের ভিত নড়ে যায় ‘মা দুর্গাকে’ সব অন্যায় অত্যাচারের মোচনকারী হিসেবে মেনে নিলে। একই সাথে ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ বলে কোনো সনাতন ধর্মী ভাইকে মুসলমানদের ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহার আনন্দে শরিক করা যাবে কি? সম্ভব হবে কি বড়দিনের উৎসবে অথবা বুদ্ধ পূর্ণিমার অংশী করতে? সমাতন ধর্মীরা আমাদেরই প্রতিবেশী, ওরা আমাদের আমানত। এই আমানত রক্ষায় মুসলিমরা সর্বোচ্চ ত্যাগ করতে পারে তাদের ধর্ম বিশ্বাসের সীমারেখা মেনে নিয়েই, এটাই ইসলামের শিক্ষা। এক্ষেত্রে স্বকীয়তা বিসর্জন দেয়ার মনোভাবের সাথে ইসলামী সংস্কৃতির বিশ্বাসীদের সমন্বয়ের কোনো জায়গা নেই।
প্রসঙ্গ-২
এর মধ্যেই দেশে আরো একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা রাজনীতির অভিযাত্রাকে নাড়িয়ে দিয়েছে বেশ জোরে শোরে। তা হলো মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ। এ প্রসঙ্গে ফিলিপাইনের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি রদ্রিগো দুতার্তের (Rodrigo Duterte) কথা মনে পড়ে। মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে নিজে পরিচালনা করেন মাদকবিরোধী অভিযান। তার এই পদক্ষেপে সরকারি হিসাবে নিহত হন ছয় হাজারেরও বেশি মানুষ। এর ফলে দেশটিতে মাদক ব্যবসা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যালে তার বিরুদ্ধে মামলা চলমান। জনতোষণবাদী রাজনীতি তাকে জনপ্রিয়তা এনে দিলেও নিজ হাতে আইন তুলে নেয়ায় তিনি আজ দণ্ডিত আসামি। 
ইশরাক হোসেনের মাদকবিরোধী ভূমিকা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু একজন আইন প্রণেতা কোনোভাবেই আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারেন না। তিনি আইনের রক্ষক, প্রয়োগকারী নন। কাজটা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের। আইন হাতে নিয়ে ইশরাক তার প্রশংসনীয় ভূমিকাকে নিজেই খাটো করেছেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওপর আস্থাহীনতার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। তিনি ভুলে গিয়েছিলেন দুতার্তো নয়, দেশ চায় একজন আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নেতা, আইন প্রণেতা। এক্ষেত্রে বাস্তবতা মেনে কাজ করাই সমীচীন। 
প্রসঙ্গ-৩
সম্প্রতি সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশীর মৃত্যুদণ্ডের ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়নের শঙ্কা তৈরি হয়, যা অত্যন্ত সংবেদনশীল ঘটনা। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে ব্যাপারটিকে এমন পর্যায়ে উপস্থাপন করা হচ্ছিল যে, সাধারণের ভেতর একটা ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনা তৈরি হয়। এসব স্পর্শকাতর বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ, বিশ্লেষণে আরো যত্মশীল হওয়া প্রয়োজন ছিল। সৌদি আরবে রয়েছে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সংখ্যক প্রবাসী। দেশটির কারাগারে বন্দি রয়েছে প্রায় সাত হাজারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশী। যে কোনো সংবাদ প্রকাশ, সংবাদ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে বিষয়গুলো সামনে রাখা জরুরি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে দায়বদ্ধ করলে যথাযথ হতো। এ ধরনের সংবাদ প্রকাশে অতিউৎসাহের পেছনে দুই দেশের সম্পর্কে ফাটল ধরানোর কোনো অসদুদ্দেশ্য ছিল কিনা তাও খতিয়ে দেখা দরকার। 
লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ
shah.b.islam@gmail.com 

Advertisement