রিন্টু আনোয়ার
রিন্টু আনোয়ার। নয়া দিগন্ত

মানুষের মনস্তত্ত্ব অদ্ভুত। চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ছোটখাটো অনিয়ম বা দুর্নীতিতে যতটা প্রতিক্রিয়া দেখায়, বিপুল অঙ্কের রাষ্ট্রীয় অর্থের লুটপাটে ঠিক ততটা নির্বিকার থাকে। এর কারণ সম্ভবত এই যে, একটি নির্দিষ্ট সীমার পর বড় সংখ্যার অঙ্কগুলো সাধারণ মানুষের কাছে কেবল কিছু শূন্যের সমাহার বলে মনে হতে পারে। তারা সেই সংখ্যার বিশালত্ব অনুধাবন করতে সমর্থ নয়। ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে দেশ থেকে প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার হওয়ার যে ভয়াবহ তথ্য সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এবং খোদ রাষ্ট্রযন্ত্রের গবেষণায় উঠে এসেছিল, তা নিয়ে জনপরিসরে তেমন কোনো উত্তাপ ছড়ায়নি। অথচ সেই একই সময়ে অগ্রণী ব্যাংকের ভল্টে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের ৮৩২ ভরি স্বর্ণ পাওয়ার খবরে দেশ তোলপাড় হয়েছিল। সাড়ে আট কোটি টাকার স্বর্ণ মানুষের মনে যে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল, ২৮ লাখ কোটি টাকার পাচার তেমন ঝড় তোলেনি। এমনকি জনপ্রতিনিধিদের খেজুরের হিসাব নিয়ে মফস্বলে যে তুমুল বিতর্ক হয়েছিল, রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে উধাও হয়ে যাওয়া হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে তার সিকিভাগ আলোচনাও হয়নি। একজন সাধারণ মানুষ, যিনি জীবনে হয়তো একসাথে ১০ লাখ টাকাও দেখেননি, তার কাছে এক হাজার কোটি টাকা আর ২৮ লাখ কোটি টাকার মধ্যে গুণগত কোনো পার্থক্য আছে কি? তার কাছে দুই-ই কেবল ‘অনেক টাকা’। এ মনস্তাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে আসছে দেশের শাসকগোষ্ঠী এবং তাদের মদদপুষ্ট আমলাতন্ত্র।
অর্থনীতিবিদরা একটি কথা বলে থাকেন, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দুর্নীতি বা লুটপাটের মোক্ষম ও নিরাপদ অস্ত্র ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ। শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, গবেষণা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি বা দারিদ্র্যবিমোচনের মতো মানবিক খাতগুলোতে বিনিয়োগ না করে, কংক্রিটের ইমারত আর পিচঢালা রাস্তার মেগা প্রকল্প হাতে নেয়ার পেছনে যে শুধু দেশের উন্নয়ন ভাবনা কাজ করে, তা ভাবার কোনো কারণ নেই; বরং এর পেছনে লুকিয়ে থাকে হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার এক নিখুঁত ও ঝুঁকিহীন বন্দোবস্ত। এই বন্দোবস্তের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে সাধারণ জনগণ, যাদের ঘামের টাকায় ঋণ শোধ করতে হয়।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার পরিবর্তন হয়, নতুন নেতৃত্ব আসে; কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার মজ্জায় লুকিয়ে থাকা লুটপাটের এই মেগা সংস্কৃতি কি আদৌ বদলায়? প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিকভাবে আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। বিগত নির্বাচনের আগে বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে বারবার একটি জোরালো বার্তা দেয়া হয়েছিল; বিএনপির অন্যতম লক্ষ্য কোনো মেগা প্রকল্পে না যাওয়া। মেগা প্রকল্প মানে মেগা দুর্নীতি। রাষ্ট্রের অর্থ জনগণের শিক্ষা, স্বাস্থ্যের উন্নতির পেছনে খরচ করা হবে। 
তখন বলা হয়েছিল, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে কংক্রিটের মেগা প্রকল্পের বদলে দেশের মানুষের দক্ষতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও আত্মকর্মসংস্থানের ওপর জোর দেয়া হবে। জনবান্ধব এসব প্রতিশ্রুতি সাধারণ মানুষকে আশান্বিত করেছিল; কিন্তু সরকার গঠনের মাত্র তিন মাসে সেই প্রতিশ্রুতির উল্টো পথে হাঁটা শুরু করে নতুন প্রশাসন। একের পর এক মেগা প্রকল্পের অনুমোদন এবং বিগত সরকারের নেয়া প্রকল্পগুলোর ব্যয় দ্বিগুণ করে তা চালিয়ে নেয়ার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা অর্থনীতিবিদদের ভাবিয়ে তুলেছে।
অনেকে ভাবতে পারেন, একজন বেকার যুবক বা সাধারণ গৃহিণী তো আর সরকারকে সরাসরি আয়কর দেন না, তাহলে মেগা প্রকল্পের এই ব্যয়ে তাদের কী আসে যায়? এটি একটি মস্ত বড় ভুল ধারণা। রাষ্ট্রের প্রতিটি মেগা প্রকল্পের মাশুল সাধারণ মানুষকে কড়ায় গণ্ডায় মেটাতে হয়। আপনি যখন বাজার থেকে একটি সাবান কেনেন, তখন আপনি ভ্যাট দেন। সরকারের উন্নয়ন ব্যয়ের বিপুল ঘাটতি মেটাতে দফায় দফায় বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়, যার প্রভাব সরাসরি পড়ে আপনার সাংসারিক খরচের ওপর। জ্বালানির দাম বাড়লে বাড়ে পরিবহন খরচ, ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রতিটি জিনিসের দাম আকাশ ছুঁয়ে যায়। বছরের পর বছর ব্যাংকে জমানো আপনার টাকার মান কমে যায় মূল্যস্ফীতির কারণে। এভাবে এক কলমের খোঁচায় আপনার অজান্তে আপনার পকেট, আপনার আলমারি লুট হয়ে যায় মেগা প্রকল্পের নামে।
গণমাধ্যমে প্রায়ই একটি কথা অত্যন্ত সাবলীলভাবে প্রচার করা হয়, অমুক প্রকল্পে জাইকা, এডিবি বা বিশ্বব্যাংক এত হাজার কোটি টাকা ‘দেবে’। খবরটি এমনভাবে পরিবেশন করা হয়, যেন বিদেশী সংস্থাগুলো আমাদের ভালোবেসে অনুদান বা সাহায্য দিচ্ছে। বাস্তবতা হলো— এগুলো সব কঠিন শর্তযুক্ত ঋণ। আজ থেকে ১০ বা ১৫ বছর পর সুদসহ এর প্রতিটি পয়সা দেশের মানুষকে পরিশোধ করতে হবে। শুধু তাই নয়, ঋণ দেয়ার সময় বিদেশী সংস্থাগুলো সুকৌশলে শর্তজুড়ে দেয়, দাতা দেশের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে হবে। এতে প্রকল্পের ব্যয় কৃত্রিমভাবে কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
মেগা প্রকল্পের ব্যয়ে আমলাতান্ত্রিক কারসাজির আরো একটি দিক হলো ‘হিডেন কস্ট’ বা লুক্কায়িত ব্যয়। আমাদের প্রকল্পগুলোতে মূল অবকাঠামোর খরচ সামনে এনে আনুষঙ্গিক খরচগুলো চাতুর্যের সাথে আড়াল করা হয়। প্রকল্পের মেয়াদ এবং ব্যয় বৃদ্ধির সংস্কৃতি আমাদের মজ্জাগত হয়ে দাঁড়িয়েছে। 
উন্নয়নের এমন দর্শনের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আমাদের নগর পরিবহন এবং সামষ্টিক অর্থনীতির প্রকৃত অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত, তা নিয়ে দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও প্রকৌশলীরা বারবার সতর্ক করে আসছেন। বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল হকের মতে, ঢাকার যানজট নিরসনে মেট্রোরেল কোনো জাদুর কাঠি নয়। শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার স্থায়ী সমাধানে বাস রুট রেশনালাইজেশন, ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থা চালু করা এবং ট্রাফিক সিগন্যাল আধুনিকায়নের মতো অত্যন্ত জরুরি অথচ স্বল্প ব্যয়ের কাজগুলো না করে সরাসরি মেগা প্রকল্পে হাত দেয়াটা বোকামি। কোনো শক্ত ভিত্তি ছাড়া ওপরের স্তরের এ উন্নয়ন কখনো টেকসই হবে না।
অন্য দিকে মেগা প্রকল্পের সুযোগ ব্যয় বা ‘অপরচুনিটি কস্ট’ নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন যে বিষয়টি সামনে এনেছেন, তা বর্তমান নীতিনির্ধারকদের গভীরভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন। একটি এক লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার মেট্রোরেল বা ৮৩ হাজার কোটি টাকার ‘কর্ডলাইন’ রেলপথ নির্মাণের বিপরীতে আমরা যদি সেই অর্থ দিয়ে সারা দেশের লাখ লাখ কিলোমিটার ভাঙাচোরা গ্রামীণ সড়ক সংস্কার করি, তবে তার সুফল দেশের প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় তাৎক্ষণিকভাবে পৌঁছাবে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে যে গতি সঞ্চারিত হবে, তা একটি উড়ালপথের চেয়ে বহুগুণ বেশি জাতীয় প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করবে। আর্থিক সঙ্কটের এই সময়ে, যখন সরকারের রাজস্ব আদায়ে বিশাল ঘাটতি এবং জিডিপির তুলনায় ঋণের বোঝা ক্রমেই ভারী হচ্ছে, তখন নতুন করে মেগা প্রকল্পের ফাঁদে পা দেয়া হবে অর্থনীতির জন্য বোকামি।
সরকারকে বুঝতে হবে, ঢাকা শহর আজ বসবাসযোগ্যতার দিক থেকে পৃথিবীর তলানিতে অবস্থান করছে। দূষিত বায়ু আর দূষিত নদীর এই জনারণ্যে নতুন করে মানুষ টেনে আনার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। প্রকৃত উন্নয়ন চাইলে উন্নয়নের বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। 
ক্ষমতাসীনদের মনে রাখা প্রয়োজন, মানুষ আগের চেয়ে অনেক সচেতন। বিগত সরকারের পতনের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল লাগামহীন দুর্নীতি আর মেগা লুটপাটের প্রতি জনরোষ। প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ করে বর্তমান সরকারও যদি সেই একই আমলাতান্ত্রিক চক্রান্তে পা দেয় এবং বিদেশী দাতা সংস্থাগুলোর প্রলোভনে মেগা প্রকল্পের নামে ঋণের বোঝা চাপিয়ে দেয়, তবে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হতে সময় লাগবে না। সময় থাকতে উন্নয়নের সংজ্ঞা ঢেলে সাজানো এবং কংক্রিটের বদলে মানবতায় ও দক্ষতায় বিনিয়োগ করা হোক নতুন বাংলাদেশের দর্শন। 
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
rintuanowar.com

Advertisement