মতামত
মতামত। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

বিগত দেড় যুগে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের যেসব ক্ষয় দেখা গেছে, সেগুলো এখন নানা মাত্রায় ভারতে হাজির হয়েছে। বিষয়টি যেন নয়াদিল্লির জন্য একটি উপহাস। কারণ যখন ঢাকায় গণতন্ত্র ধ্বংসের একটির পর একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ হচ্ছিল তারা সেটিকে প্রণোদনা দিয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে এর উদ্যোক্তাও ছিল ভারত। বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ হিসাবে প্রতিবেশী বাংলাদেশের গণতন্ত্র রক্ষায় তারা কোনো ভূমিকাই রাখেনি। এখন তার অভিশাপ দৈত্যাকারে উপস্থিত হয়েছে তাদের দেশে। বিরোধী দল কোথাও থেকে কোনো প্রতিকার পাচ্ছে না। এমনকি বিচার বিভাগের কাছে ফরিয়াদ করেও তাদের লাভ হচ্ছে না। নরেন্দ্র মোদি ভারতের বিচার বিভাগের ওপরও অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছেন। হাসিনার ভক্ত কংগ্রেসের প্রধান নেতা রাহুল গান্ধী এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন বাংলাদেশের মানুষের দুঃসহ দিনগুলো। 
মোদি অত্যন্ত সফলভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনীতিকরণ করেছেন। নির্বাচনে সফলতার জন্য তিনি আইবি, ইডি এসব প্রতিষ্ঠানকে স্র্রেফ বিরোধীদের দমানোর অস্ত্র হিসেবে প্রয়োগ করেছেন। নির্বাচনের আগে আগে কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, আম আদমিসহ সব প্রতিযোগী দলের সম্ভাব্য বিজয়ী প্রার্থীর বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেন। সম্প্রতি শেষ হওয়া পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনকে নিশানা করে তৃণমূল কংগ্রেস নেতাদের বাড়িঘরে ঢালাও অভিযান চালিয়েছে। রাষ্ট্রীয় অপরাধ দমনের জন্য সৃষ্টি করা হলেও বিজেপি সরকার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব প্রতিষ্ঠানের ৯৫ শতাংশ অভিযান বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে চালিয়েছে। হাসিনা যেভাবে আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট ও দুদককে কাজে লাগিয়েছেন। দুদককে দিয়ে তিনি বিরোধীদের কোণঠাসা করার পাশাপাশি নিজের দলের লোকদের চারিত্রিক সনদ দেয়ার ব্যবস্থাও করেছিলেন। মোদি সরকার হাসিনাকে অনুসরণ করে ‘সফল’ হয়েছে। দেশটিতে বিরোধীরা বাংলাদেশের মতোই কোণঠাসা হয়ে গেছে।
ভারতের গণতন্ত্রের সবচেয়ে আস্থার জায়গাটি ছিল নির্বাচন কমিশন। নানা কলহ বিবাদ ও দারিদ্র্যের মধ্যে নিমজ্জিত একটি দেশে নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করে এই কমিশন প্রশংসা কুড়িয়েছে। মোদি তার ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করতে হাসিনার মতো এই নির্বাচন কমিশনকে কব্জা করেছেন। নুরুল হুদা, হাবিবুল আউয়ালের মতো জোগাড় করেছেন জ্ঞানেশ কুমারকে। ফ্যাসিস্ট হাসিনা একেবারে নিজের মতো পা চাটা নির্বাচন কমিশনার বানিয়েছিলেন। তারা হাসিনার পক্ষে নগ্নভাবে কাজ করতেন। দেশের জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়ায় কোনো রাখঢাক রাখতেন না। ভোটকেন্দ্রে একজন ভোটার উপস্থিত না হলেও তারা প্রকাশ্যে ঘোষণা করতেন— ভোটার উপস্থিতি কাক্সিক্ষত। নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। 
নুরুল হুদা একবার বলেছিলেন, তাদের আয়োজিত নির্বাচনব্যবস্থা আমেরিকার চেয়েও উত্তম। এভাবে ডাহা মিথ্যা বলেও তারা পার পেয়ে গেছেন। এ ধরনের ঔদ্ধত্য দেখানোর শক্তিটিও এসেছিল তখন ভারতের সমর্থনের কারণে। ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার এতটা নগ্ন নির্লজ্জ হতে পারেনি। তবে তিনি তলে তলে যেটি করছেন, সেটি সাগরচুরির মতো। তার বিরুদ্ধে ১৩ কোটি ভোটার বাদ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এরা সংখ্যালঘু মুসলমান, আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর। যাদের ওপর মোদির আস্থা নেই। কিন্তু এই কাজ করতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছেন জ্ঞানেশ কুমার। দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী রেখাগুপ্ত, পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর এবং স্বয়ং একজন নির্বাচন কশিনারও বাদ পড়ে গেছেন ভোটার তালিকা থেকে। সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট, সাবেক সেনাপ্রধান ও সাবেক প্রধান বিচারপতিও আছেন এর মধ্যে। মোদিকে যারা ভোট দেবেন না তাদের বাদ দিতে গিয়ে নিজেদের আসল লোকদের বাদ দিয়ে বসেছেন জ্ঞানেশ। হিসাব মতে ভারতের ভোটার সংখ্যা বাড়ার কথা। সর্বশেষ ভোটার তালিকায় উল্টো কমে গেল ১৫ কোটি ভোটার। এ কারণে জ্ঞানের কুমার পড়েছেন বাটে। মোদির জেতার পথ নিষ্কণ্টক করতে গিয়ে সব লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছেন। জ্ঞানেশের চলে যাওয়া অনেকটা নিশ্চিত; মোদির গদিও এখন টালমাটাল।
ভারতেও এখন বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই নেমে এসেছে। সেখানে একই ধরনের লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ক্ষমতার প্রথম দুই মেয়াদে বিরোধীদের কোণঠাসা করতে মোদি, হাসিনার  মতোই সফল হয়েছেন। তৃতীয় মেয়াদে বিরোধীরা বাংলাদেশের হাসিনার বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মতো সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে পড়ে। তারা এখন রাষ্ট্রপতির কাছে ধরনা দিচ্ছেন। হাসিনার রাষ্ট্রপতির মতোই দ্রৌপদী মুর্মু বধির হয়ে আছেন। একগাদা অভিযোগ নিয়ে রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধীরা তার কাছে হাজির হয়েছেন; কিন্তু তার কিছু করারই সুযোগ নেই। সর্বশেষ তারা প্রধান বিচারপতির দ্বারস্থ হয়েছেন।
ভারতের বিচার বিভাগ হাসিনার মতো এখনো পুরোটা মোদির কব্জায় চলে যায়নি। তবে এটি নিশ্চিত করে বলা যায়, তারাও বড়দাগে স্বাধীনতা হারিয়েছে। রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধীরা প্রধান বিচারপতির কাছে ধরনা দিচ্ছে; কিন্তু সাড়া পাচ্ছে না। মোদি-বিরোধীদের দমাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করেছেন। বিচার বিভাগ স্বাধীন হলে বহু আগেই হস্তক্ষেপ করত। এ পর্যন্ত রাজনৈতিক অধিকার রক্ষায় সর্বোচ্চ আদালত থেকে কোনো রুলিং আসেনি। এমনকি ভোটার জালিয়াতির স্পষ্ট প্রমাণ থাকার পরও হস্তক্ষেপ করেননি প্রধান বিচারপতি। হাসিনার বিচারকদের মতো তাদের বিরুদ্ধে এখন সন্দেহের তীর। তারা কি লোক কল্যাণ মার্গের (প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন) দিকে তাকিয়ে থাকেন, সেখান থেকে মোদি কী নির্দেশ দিচ্ছেন। তা না হলে কেন মরতে বসা গণতন্ত্র রক্ষায় এই ক্রান্তিকালে বিচার বিভাগ কোনো ভূমিকা নিতে ব্যর্থ হচ্ছে। এভাবে বিরোধীদের যখন মোদি দুর্বল অক্ষম করে দিতে সফল হয়েছেন, তখনই দৃশ্যপটে এসেছে তেলাপোকা নামে তরুণরা। তাদের জন্মের ইতিহাস হাসিনার পালানোর গল্পের সাথে হুবহু মিলে যায়। 
হাসিনা জনপরিসরে মানুষকে তাচ্ছিল্য করে মজা পেতেন। প্রতিদ্বন্দ্বীদের উপহাস করা তার স্বভাব ছিল। অনেক সময় মুখ ফসকে তিনি জঘন্য সব কথাও বলে ফেলতেন। তরুণ ছাত্রসমাজকে তিনি ‘রাজাকারের বাচ্চা’ গালি দিয়ে বসেন। তারপরই আন্দোলন দাবানলের মতো সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। জেন-জির উত্তাল রক্তক্ষয়ী এক বিক্ষোভের মধ্যে তিনি প্রভুদেশ ভারতে পালিয়ে আশ্রয় নেন। ভারতের তেলাপোকা দলটি মোদির কোনো শ্লেষাত্মক মন্তব্য থেকে তৈরি হয়নি। তবে তারই অনুগত প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের এক মন্তব্য থেকে এর উৎপত্তি। এখন দেখার পালা— এই তরুণরা দেশটির জনগণের জন্য বাংলাদেশের মতোই কোনো প্রতিকার এনে দিতে পারে কি না। কারণ বিরোধী দলগুলো মোদি শাসনে, হাসিনার আমলের বাংলাদেশের বিরোধী দলগুলোর মতোই শক্তিহীন দুর্বল হয়ে গেছে।
মোদির অবস্থা হাসিনার মতো হবে কি না— তা এখনো নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে মোদির মধ্যে হাসিনার লক্ষণগুলো প্রকাশ পাচ্ছে। বিশেষ করে ১০ অক্টোবরে যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ সমাবেশ ঘিরে তার নেয়া পদক্ষেপগুলো হাসিনার ফ্যাসিবাদী আচরণের সাথে মিলছে। দমন-পীড়নের স্টাইলে হাসিনার কর্মকাণ্ডের ছাপ আছে। ওই দিন সব ধরনের যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ করে তিনি রাজধানী দিল্লিকে পুরো দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেন। নিয়োগ করেন ৩৫ হাজার সদস্যের বিশাল বাহিনী। এর পাশাপাশি দলীয় ক্যাডারদেরও লেলিয়ে দেয়া হয়। তারা বিক্ষোভে অংশ নেয়া তরুণদের বেধড়ক পিটিয়েছে। মসজিদে মসজিদে পুলিশ পাঠিয়ে উপস্থিত মুসল্লিদের নির্দেশনা দিয়েছে। মুসলমান যুবকরা যাতে এতে অংশ না নেয় সে জন্য এক ধরনের হুমকি দেয়া হয়েছে। সবচেয়ে উদ্ভট লেগেছে অল ইন্ডিয়া ইমাম অর্গানাইরেজশনের প্রধান উমর আহমদ ইলিয়াসিকে দিয়ে দেয়া বিবৃতি। এতে আহ্বান জানানো হয়, এই বিক্ষোভে যেন কেউ অংশ না নেয়। তরুণদের এই আন্দোলনকে তিনি দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র আখ্যা দেন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার আহ্বান জানান। হাসিনাও মসজিদগুলোকে ব্যবহার করেছিলেন। তিনি পালিয়ে যাওয়ার পর বহু ইমাম পালিয়ে গেছেন। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিবও ছিলেন। প্রতিদিন যখন হত্যা করা হচ্ছে, মসজিদ গুঁড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে, তখন ভারতের ইমাম অর্গানাইরেজশনের এই প্রধান মোদি সরকারের বিরুদ্ধে একটি কথাও বলেননি। মোদি ক্ষমতা থেকে ঝরে গেলে ক্ষমতার পাশে থাকা এই ইমামও টিকতে পারবেন না। 
হাসিনার পেটোয়া বাহিনীর মতো মোদির সমর্থকরা সামাজিক মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে চলমান আন্দোলন দমন করার অপচেষ্টা নিচ্ছে। অনেক গুজবের মধ্যে ধ্রুব রাঠেকে নিয়ে ছড়ানো গুজবটি ছিল ইউনিক। ছড়িয়ে দেয়া হলো— তিনি জার্মান পাসপোর্ট নিয়ে ভারতে এসেছেন। মোদি-হাসিনার একনিষ্ঠ সমর্থক পশ্চিমবঙ্গের কথিত সাংবাদিক ময়ূখরঞ্জন ফেসবুকে লিখলেন— ইংলিশ ব্রেকফাস্ট করার সময় তাকে সকালে আটক করা হয়েছে। এই গুজব তিনি একা ছড়াননি, বিজেপি প্রোপাগান্ডা মেশিন পুরোটা একযোগে এটিকে ভাইরাল করেছে। রাঠে ছাড়া পাওয়ার পর জানা গেলে বিষয়টি সম্পূর্ণ বিপরীত। এর সাথে হাসিনার গুজব সংগঠন সিআরআইয়ের মিল আছে।
ধ্রুব রাঠে বললেন, তাকে আটক করা হয়নি বরং তাকে কিডন্যাপ করা হয়েছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বাহিনী হাসিনা ঠিক যেভাবে আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে নাগরিকদের ধরে নিয়ে যেতেন, সেই স্টাইলে তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি নিজের বাড়িতে ঘুমাচ্ছিলেন। এ সময় তার বাসায় জোরপূর্বক প্রবেশ করে একটি দল। তাদের কোনো পরিচয় ছিল না। ঘুমের মধ্যে তাকে তুলে নেয়া হয়। মোদির বাহিনীর সদস্যরা তাদের পরিচয় প্রকাশ করার প্রয়োজন মনে করেনি। ধ্রুব রাঠের বিরুদ্ধে অভিযোগ কি— সেটিও জানায়নি। এ কারণে রাঠে মুক্তি পাওয়ার পর তাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টিকে কিডন্যাপ বলেছেন। 
হাসিনার সাথে মোদির যে লক্ষণটি মিলছে না, সেটি হলো— তিনি এখনো রাস্তায় খুনে বাহিনী নামাননি বা নামাতে পারেননি। হারুন, মনির ও বিপ্লবদের সেখানে দেখা যাচ্ছে না। কারো হাতে চাইনিজ রাইফেল নেই। ভবনের ছাদে নিযুক্ত হয়নি কোনো স্নাইপার। ফলে এখনো এই আন্দোলনে প্রাণহানি নেই। ভারতের গণতন্ত্রের একটি ধোঁয়াশা অবস্থা তৈরি হয়েছে। রাস্তায় নামা ককরোচরা যদি ভয়ে রাজপথ ছেড়ে দেন তাহলে তারা সামনে একজন হাসিনা পাবেন। নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগের পর তিনি নিরাপত্তা বাহিনীও কুক্ষিগত করবেন। এই আশঙ্কা আছে, তারা দেশের নাগরিকদের হাসিনার মতো হত্যা করবে। সে জন্য তাদের অপেক্ষা করতে হবে অনাগত এক জুলাইয়ের। সেটি আসতে কতদিন লাগবে তা কারো জানা নেই। 
লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত

Advertisement