
মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়। এটি দেশের সামুদ্রিক সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতির সাথে জড়িত একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত। প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৩৭ শতাংশ, ড্রেজিংয়ের ধারাবাহিক খরচ ও ঋণের চাপ নিয়েও উদ্বেগ আছে। এ নিয়ে ‘মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর : ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত পর্যালোচনা’ শীর্ষক সেমিনারে মূল প্রবন্ধে সতর্ক করা হয়েছে। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ হাসান নাসির। তার মতে, বন্দর নির্মাণের পাশাপাশি এর মালিকানা, নিয়ন্ত্রণ ও কৌশলগত স্বাধীনতাও নিশ্চিত করতে হবে।
আজ রোববার (৮ নভেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবে কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে এই সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে সক্ষমতার সীমায় পৌঁছেছে। বড় জাহাজ ঢুকতে না পারায় বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সামুদ্রিক অবস্থান দুর্বল। সিঙ্গাপুর ও কলম্বোর মতো বন্দরে ট্রান্সশিপমেন্টের কারণে খরচ, সময় ও ঝুঁকি তিনটিই বাড়ে। তাই গভীর সমুদ্রবন্দর শুধু বাণিজ্যিক প্রকল্প নয়, আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়ানো ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
সোনাদিয়া থেকে মাতারবাড়ি :
২০০৯ সালে জাপানের প্যাসিফিক কনসালট্যান্টস ইন্টারন্যাশনালের সমীক্ষায় সোনাদিয়া–মহেশখালী এলাকাকে সবচেয়ে উপযুক্ত বলা হয়। সেখানে প্রাকৃতিক গভীরতা ১৪ থেকে ১৬ মিটার, তাই ড্রেজিং তুলনামূলক কম লাগত। পরে চীন সেখানে বিনিয়োগের প্রস্তাব দেয়।
বিভিন্ন সূত্রে বলা হয়ে থাকে, ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফরে এ-সংক্রান্ত চুক্তি হওয়ার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে ভারতের আপত্তিতে তা বাতিল হয়। সোনাদিয়ার বিকল্প হিসেবে পায়রা বন্দর গড়ার উদ্যোগ নেয়া হয়। পায়রা নদীর প্রাকৃতিক ড্রাফট মাত্র ছয় মিটার। ২০১৬ সালে গণমাধ্যমে আসে, পায়রার ড্রেজিংয়ের জন্য একটি বেলজিয়ান কোম্পানির সাথে প্রথম ধাপে দুই বিলিয়ন ডলারের চুক্তি হয়েছে। ২০২০ সালে সরকার সোনাদিয়া প্রকল্প বাতিল করে, কারণ হিসেবে পরিবেশগত ঝুঁকি দেখানো হয়। প্রবন্ধের ভাষ্য, সংশ্লিষ্ট আইন না থাকলেও পরিবেশগত কারণই ছিল মুখ্য। তবে অনেক বিশ্লেষক ভূরাজনৈতিক চাপকে প্রধান কারণ মনে করেন।
ড্রেজিং এক চলমান চক্র :
বক্তারা বলেন, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ১৪.৩ কিলোমিটার দীর্ঘ, ২৫০ মিটার প্রশস্ত ও ১৬ মিটার গভীর চ্যানেল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু দুই বছরের মধ্যেই কিছু অংশে পলি জমে গভীরতা প্রায় ১০ মিটারে নেমে আসে। ২০২৬ সালের জুনে মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং শুরু করতে হয়।
বক্তাদের মতে, ড্রেজিং একবারের কাজ নয়, এটি একটি চলমান চক্র। এর সাথে জড়িয়ে আছে ঘোলা পানি ও ড্রেজড মাটি ফেলার স্থান, কচ্ছপ ও পরিযায়ী পাখির আবাসস্থল, জেলেদের জীবিকা এবং কোহেলিয়া নদীর পলি জমার প্রশ্ন। সোনাদিয়া বাতিলের সময় এসব প্রশ্ন যেমন প্রাসঙ্গিক ছিল, আজও তেমনই প্রাসঙ্গিক বলে প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যয় বৃদ্ধি ও ঋণঝুঁকি :
মাতারবাড়ী বন্দরের অনুমোদিত ব্যয় ছিল ১৭,৭৭১ কোটি টাকা, যা একাধিকবার বেড়ে প্রায় ২৪,৩৮১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর সম্ভাব্য সময় ২০২৯-৩০। এ সময়ের আগে ও পরে তিনটি ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে।
প্রথমত : প্রত্যাশার চেয়ে কম কার্গো এলে ঋণ পরিশোধের চাপ সরাসরি পরিচালন ব্যয়ের ওপর পড়বে।
দ্বিতীয়ত : নিয়মিত ড্রেজিংয়ের ব্যয় বিনিয়োগের প্রতিদান (আরওআই) দীর্ঘায়িত করতে পারে।
তৃতীয়ত : কয়লানির্ভর অবকাঠামো ভবিষ্যতে অব্যবহৃত সম্পদে পরিণত হতে পারে।
ভূরাজনীতির হিসাব :
গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা বলেন, সোনাদিয়ায় ভারত, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি ছিল। মাতারবাড়ি জাপানের ইন্দো-প্যাসিফিক কানেক্টিভিটি দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সংগতিপূর্ণ এবং ভারতের কাছেও গ্রহণযোগ্য। চীন এর বিরোধিতা করেনি; বরং মাতারবাড়ি চ্যানেলের ড্রেজিংয়ের কাজ করেছে।
তুলনায় প্রবন্ধে বলা হয়েছে, প্রাকৃতিক গভীরতা ও ড্রেজিংয়ের প্রয়োজনে সোনাদিয়া এগিয়ে। মাতারবাড়ি পিছিয়ে, কারণ সেখানে ব্যাপক, চলমান ও নিয়মিত ড্রেজিং লাগে। অর্থায়নের দিক থেকে সোনাদিয়া ছিল চীনা প্রস্তাবনির্ভর, যা বাস্তবায়িত হয়নি। মাতারবাড়ির অর্থায়ন ২৭ হাজার কোটি টাকা। কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতায় সোনাদিয়ার বিরুদ্ধে ভারত, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি ছিল, মাতারবাড়ির ক্ষেত্রে চীন নীরব। স্বল্পমেয়াদি সুফলের দিক থেকে দুটিই অনিশ্চিত।
আঞ্চলিক সংযোগ ও পাঁচ উদ্বেগ :
বক্তারা বলেন, মাতারবাড়ি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হতে পারে। এতে রাজস্ব, কর্মসংস্থান ও আঞ্চলিক সহযোগিতার সুযোগ আছে। বক্তাদের মতে, যোগাযোগ নিজে হুমকি নয়। ঝুঁকি তৈরি হয় তখনই, যখন নিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষা ছাড়া প্রবেশাধিকার দেয়া হয়। এ ক্ষেত্রে পাঁচটি উদ্বেগের কথা বলেন তারা।
প্রথমত : চুক্তি বাতিলের শর্তবিহীন ট্রানজিট দিলে সার্বভৌমত্ব ও চলাচল নিয়ন্ত্রণ ক্ষুণ্ন হবে।
দ্বিতীয়ত : অসম নির্ভরশীলতায় দরকষাকষির সক্ষমতা কমলে ন্যায্য রাজস্ব দাবি করা কঠিন হবে।
তৃতীয়ত : বাণিজ্যিক অবকাঠামোর সামরিক ব্যবহার কোনোভাবেই স্বয়ংক্রিয় হতে পারবে না।
চতুর্থত : বন্দর ভারত–চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার লজিস্টিক করিডরে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা আছে।
পঞ্চমত : টার্মিনাল, ডিজিটাল সিস্টেম ও ডেটাবেসে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের অতিনির্ভরতা সাইবার ও নিয়ন্ত্রণগত ঝুঁকি তৈরি করে।
চার প্রস্তাব :
ঝুঁকি মোকাবিলায় বক্তারা চারটি প্রস্তাব দিয়েছন।
প্রথমত : বন্দর চালুর আগেই ‘জাতীয় কৌশলগত নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক যোগাযোগ নীতিমালা’ প্রণয়ন করতে হবে। এতে জাতীয় মালিকানা, সমন্বিত সামুদ্রিক নিরাপত্তা, ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব, কৌশলগত নিরপেক্ষতা ও নিয়মিত সংসদীয় তদারকি থাকতে হবে।
দ্বিতীয়ত : ২০১৮ সালের বন্দর ব্যবহার চুক্তি, ২০১৯ সালের কার্যপদ্ধতি, নৌ-প্রটোকল ও উপকূলীয় নৌপরিবহন চুক্তিসহ বিদ্যমান সব ব্যবস্থা পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।
তৃতীয়ত : বাণিজ্যিক ট্রানজিট ও সামরিক প্রবেশাধিকারের মধ্যে স্পষ্ট আইনি পার্থক্য টানতে হবে। সামরিক-সংশ্লিষ্ট যেকোনো পরিবহনে কঠোর নিষেধাজ্ঞা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
চতুর্থত : একটি স্বাধীন তুলনামূলক বিশ্লেষণ করতে হবে, যেখানে সোনাদিয়া ও মাতারবাড়ির ৩০ বছরের ড্রেজিং ব্যয়, অবকাঠামো ব্যয়, পরিবেশগত ব্যয়, ঋণের সুদ ও সুযোগ-ব্যয় (অপারচুনিটি কস্ট) হিসাব করা হবে।
আসল প্রশ্ন :
প্রাকৃতিক গভীরতায় সোনাদিয়া এখনো এগিয়ে। অর্থায়ন, কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ও স্বল্পমেয়াদি সুফলের বিচারে এগিয়ে মাতারবাড়ি। বক্তার মতে, আসল প্রশ্ন ভারত সুবিধা পাবে কি না, তা নয়। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ ও কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রেখে সমানুপাতিক সুবিধা নিশ্চিত করতে পারবে কি না। বাংলাদেশের জনগণ কি ২০, ৩০ বা ৪০ বিলিয়ন ডলার ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়ে আরেকটি হাম্বানটোটার পথে হাঁটবে, নাকি বঙ্গোপসাগরে একটি বিশ্বাসযোগ্য, ভারসাম্যপূর্ণ ও টেকসই সামুদ্রিক রাষ্ট্র হিসেবে নিজের জায়গা করে নেবে?
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








