শ্রমিক, মজুরি
বক্তব্য রাখছেন সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ। নয়া দিগন্ত

শ্রমিকের রক্তের দায় শুধু আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিয়ে শেষ করা যাবে না। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই এই দায়ের যথাযথ প্রতিফলন ঘটাতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন শ্রম সংস্কার কমিশন ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ।

Advertisement

শনিবার সকাল ১০টায় রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে আয়োজিত জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক কনভেনশন-২০২৬-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, জীবনমানের উন্নয়ন ও শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় ১০ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে গার্মেন্টস শ্রমিক উন্নয়ন মঞ্চ এর আয়োজন করে।

সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, শ্রমিকের রক্তের দাগ রাজপথে লেগে গেছে। ফলে মজুরি বোর্ডের ওপর শ্রমিকের রক্তের একটি দায় তৈরি হয়েছে। এই দায় শুধু ক্ষতিপূরণ দিয়ে শেষ হবে না। শ্রমিকের ন্যায্যমজুরি নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই এই দায়ের যথাযথ প্রতিফলন ঘটাতে হবে।

Advertisement

তিনি বলেন, মজুরি কোনো অনুগ্রহের বিষয় নয়, এটি শ্রমিকের মৌলিক অধিকার। মানুষ কাজ করে তার শ্রমের ন্যায্যমূল্য ও প্রাপ্য হিস্যা পাওয়ার জন্য। কোনো জাতির শ্রমিক যদি ন্যায্য মজুরি না পেয়ে কোনোরকমে জীবন ধারণ করে, তাহলে সেই জাতি কখনো প্রকৃত অর্থে উন্নত হতে পারে না। তাই জাতীয় উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

শ্রমিক অধিকার আদায়ের সংগ্রাম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শ্রমিকের অধিকার এমনিতেই প্রতিষ্ঠিত হয় না। এর জন্য রাজপথে লড়াই করতে হয়, আলোচনার টেবিলে লড়াই করতে হয়। একই সাথে গণমাধ্যমেও শ্রমিকদের দাবি ও অধিকার তুলে ধরতে হয়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই শ্রমিকদের সংগঠিত ও সোচ্চার ভূমিকা প্রয়োজন।

সরকারের ন্যূনতম মজুরি পর্যায়ক্রমে নির্ধারণের ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী যেহেতু বিষয়টি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের কথা বলেছেন, আমরা এটিকে সাধুবাদ জানাই। আমরাও শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি আদায়ের লক্ষ্যে কাজ করছি। তবে শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন।

তিনি আরো বলেন, শ্রমিকের অধিকার আদায়ের অন্যতম প্রধান শক্তি হলো সংগঠনগুলোর ঐক্যবদ্ধ অবস্থান। বিভিন্ন মত ও পথের শ্রমিক সংগঠনগুলোকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। বিভক্তি নয়, ঐক্যই শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথকে সুগম করবে।

কনভেনশনে সভাপতির বক্তব্যে গার্মেন্টস শ্রমিক উন্নয়ন মঞ্চের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, আশির দশক থেকে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প ধীরে ধীরে একটি গতিশীল ও সম্ভাবনাময় শিল্প খাতে পরিণত হয়েছে। এ শিল্পের শ্রমিকেরা বিশ্বদরবারে বাংলাদেশকে একটি ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। অথচ সেই শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য রাজপথে রক্ত ঝরাতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, বেশ কিছুদিন ধরে পোশাকশিল্পে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির দাবিকে কেন্দ্র করে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। শ্রমিকদের যে জীবনমান থাকা প্রয়োজন এবং যে ন্যায্য অধিকার পাওয়ার কথা, তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের আন্তরিক ভূমিকা থাকা দরকার। কিন্তু বিগত কোনো সরকারই শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রত্যাশিত আন্তরিকতা দেখিয়েছে বলে আমরা মনে করি না।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে শ্রমিকদের দুর্বিষহ জীবনযাপনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নবম পে-স্কেল ঘোষণার পরও বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দামসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষ দিশেহারা। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী থেকে শুরু করে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ- সবাই জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চাপে পিষ্ট হচ্ছেন। এর সাথে বাড়িভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় পোশাকশ্রমিকদের জীবন আরো দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।

শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের আবাসন সঙ্কটের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, শিল্পশ্রমিকদের বাঁচাতে হলে শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকায় সরকারি উদ্যোগে আবাসন ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে শ্রমিকেরা ন্যায্য ভাড়ায় বসবাস করতে পারেন। পাশাপাশি শ্রমিকদের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। ন্যায্যমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় কিছুটা হলেও কমবে।

তিনি শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, সম্মানজনক জীবনমান ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার, মালিকপক্ষ এবং সব শ্রমিক সংগঠনকে কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ও গার্মেন্টস শিল্প সেক্টরের ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের সদস্য বাবুল আক্তার। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন গার্মেন্টস শ্রমিক উন্নয়ন মঞ্চের সদস্য সোহেল রানা মিঠু।