
শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে সারাদেশে পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, জনসাধারণের নির্বিঘ্ন চলাচল, অপরাধ ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি প্রতিরোধ এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অক্ষুণ্ণ রাখতে ব্যাপক ও সমন্বিত নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পূজা উদযাপন কমিটির সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে দুর্গোৎসবের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আরো কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করা হয়। নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের পাশাপাশি দর্শনার্থীদের সেবা, নারী ও শিশুদের সুরক্ষা, মানবিক সহায়তা এবং জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে উৎসবের শান্তিপূর্ণ ও সম্প্রীতিময় পরিবেশ বজায় রাখতে আনসার-ভিডিপির সদস্য-সদস্যারা দায়িত্বশীলতা, পেশাদারিত্ব ও নিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে একথা জানানো হয়েছে।
এতে বলা হয়, এ বছর সারাদেশের ৩৩ হাজার ১৬৫টি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় ২ লাখ ১২ হাজার ৮১৮ জন আনসার-ভিডিপি সদস্য-সদস্যা মোতায়েন করা হয়। ব্যক্তিগত উদ্যোগে আয়োজিত পূজামণ্ডপগুলোতেও বাহিনীর নিজস্ব মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হয়, যা ছিল পরিকল্পিত ও বিস্তৃত নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার অংশ। জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেয়া ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সহায়তা নিশ্চিত করতে আনসার ব্যাটালিয়নের সমন্বয়ে ১০৪টি স্ট্রাইকিং ফোর্স টিমের ৬২৪ জন সদস্যকে প্রস্তুত রাখা হয়। ১৫ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া দুর্গোৎসবের নিরাপত্তা কার্যক্রম ২২ অক্টোবর পর্যন্ত সদস্যদের দায়িত্বে সক্রিয় রাখার মাধ্যমে পূজামণ্ডপ ও জনসমাগমপূর্ণ স্থানে নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা এবং বিশেষ করে নারী-পুরুষের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে পূজা-পরবর্তী নিরাপত্তাব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়েছে।
বাহিনীর সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, দুর্গাপূজাকেন্দ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে মোট ১৩১টি ঘটনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের প্রতিরোধমূলক ও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রতিমা ভাঙার চেষ্টাসহ ভাঙচুর প্রতিরোধের ২০টি, বিবাদমান সমস্যা সমাধানের ৩৬টি, অগ্নিসংযোগ প্রতিরোধের ২টি এবং মাদক সংক্রান্ত ১৩টি ঘটনার তথ্য রয়েছে। এ সময়ে ২৪টি পৃথক ঘটনায় ৪৯ জন দুষ্কৃতিকারীকে আটক, ১৫টি শিশুকে উদ্ধার এবং চুরির অপরাধে ৬ জনকে আটক করা হয়। এ ছাড়া ১৫টি ঘটনায় মূল্যবান সামগ্রী উদ্ধারসহ বিবিধ সমস্যা সংক্রান্ত ৯টি ঘটনার তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে। এসব পদক্ষেপ পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, অপরাধ প্রতিরোধ, শিশুদের নিরাপদে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়া এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়াদানের ক্ষেত্রে আনসার-ভিডিপি সদস্যদের সক্রিয়তা ও দায়িত্বশীলতার প্রতিফলন। পূজার দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন ঘটনায় ৪ জন আনসার-ভিডিপি সদস্য মৃত্যুবরণ করেন এবং ১৭ জন সদস্য আহত ও অসুস্থ হন।
বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ ঢাকাসহ দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের পূজামণ্ডপ পরিদর্শনকালে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, পূজা উদযাপন কমিটি ও আনসার-ভিডিপি সদস্যদের পারস্পরিক সহযোগিতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর সমন্বিত ভূমিকার প্রশংসা করেন। তার পর্যবেক্ষণে, ঐক্যবদ্ধ জনসাধারণ ও শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সম্মিলিত প্রচেষ্টা দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে আরো সুদৃঢ় করেছে। একটি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে আনসার-ভিডিপির তিন পর্যায়ভিত্তিক নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় নতুন ধারা সৃষ্টি করেছে। এ ক্ষেত্রে এভিএমআইএস সফটওয়্যারের মাধ্যমে সঠিক সদস্য নির্বাচন, এসটিডিএমএস সফটওয়্যারের মাধ্যমে সুশৃঙ্খল মোতায়েন এবং ‘শারদীয় সুরক্ষা অ্যাপের’ মাধ্যমে ডিজিটাল নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনা বিশেষ গুরুত্ব বহন করেছে।
২০২৪-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশ গঠনের প্রেক্ষাপটে স্বচ্ছতা, প্রযুক্তির ব্যবহার, জবাবদিহি এবং দায়িত্ব পালনে সদস্যদের মানসিকতার পরিবর্তনকে তিনি বাহিনীর চলমান সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরেন।
প্রান্তিক পর্যায়সহ রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন পূজামন্ডপ সরেজমিনে পরিদর্শনের ধারাবাহিকতায় ২০ অক্টোবর মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির আয়োজনে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে পূজামণ্ডপে শারদীয় শুভেচ্ছা বিনিময়কালে বাহিনীর মহাপরিচালক বলেন, ‘ক্ষমতাকেন্দ্রিক মানসিকতার পরিবর্তে জনসেবা, জবাবদিহি ও জনসম্পৃক্ততাকে প্রাধান্য দিয়ে সম্মিলিতভাবে দেশের জন্য কাজ করার এই সংস্কৃতি আরো সুদৃঢ় করতে হবে।’
নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রত্যাশিত রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে তার এ বক্তব্যে জনসেবামুখী দৃষ্টিভঙ্গি, পারস্পরিক আস্থা, জনসম্পৃক্ততা ও সমন্বিত নিরাপত্তাব্যবস্থার গুরুত্ব প্রতিফলিত হয়েছে। একই অনুষ্ঠানে দায়িত্ব পালনকালে মৃত্যুবরণকারী আনসার ও ভিডিপি সদস্যদের দেশের প্রতি আত্মত্যাগকে তিনি অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে অভিহিত করেন এবং তাদের আত্মত্যাগকে বাহিনীর সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা, কর্মচারী ও সদস্য-সদস্যাদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে উল্লেখ করেন।
মহাপরিচালকের দিকনির্দেশনা বাস্তবায়নে বাহিনীর সদর দফতরের কন্ট্রোল রুম ও মিডিয়া শাখা থেকে শুরু করে রেঞ্জ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং মাঠপর্যায়ের সদস্য-সদস্যাদের সমন্বিত তৎপরতা দুর্গোৎসবের নিরাপত্তা কার্যক্রমকে সুসংহত ও গতিশীল করেছে।
নিরাপত্তা কার্যক্রমে প্রযুক্তির কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে ব্যবহৃত হয় ‘শারদীয় সুরক্ষা অ্যাপ’, যার মাধ্যমে ৬৬ হাজার ৩৩০ জন নারী আনসার-ভিডিপি সদস্য এন্ড ইউজার (End User) হিসেবে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা নিরবিচ্ছিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। নিজ নিজ দায়িত্বপ্রাপ্ত পূজামণ্ডপ থেকে কোনো ঘটনা বা দুর্ঘটনার তথ্য তারা তাৎক্ষণিকভাবে অ্যাপে রিপোর্ট করেন। এর ফলে বিশৃঙ্খলা, উসকানি, গুজব ও সংঘটিত অপরাধ প্রতিরোধে পূজা উদযাপন কমিটি, পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন, এসআরবি ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার সাথে সমন্বিতভাবে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সমস্যার সমাধান সহজ হয়।
প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, স্বচ্ছ জনবল নির্বাচন, সুশৃঙ্খল মোতায়েন এবং মাঠপর্যায়ের তাৎক্ষণিক সাড়াদানের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এ নিরাপত্তাব্যবস্থা ভবিষ্যতের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান, বিশেষত আসন্ন নির্বাচনসহ বৃহৎ জনসমাগমপূর্ণ আয়োজনের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা হিসেবে বিবেচিত হবে। এ ব্যবস্থায় কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমই নয়, বরং পূজা উদযাপন কমিটি, স্থানীয় প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট সংস্থা এবং সাধারণ জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। দুর্গোৎসবের পূর্বপ্রস্তুতি, উৎসবকালীন নিরাপত্তা এবং প্রতিমা বিসর্জন-পরবর্তী দায়িত্ব পালনের ধারাবাহিকতা বাহিনীর পরিকল্পিত কার্যক্রম, সমন্বিত সক্ষমতা ও জনসেবামূলক ভূমিকার পরিচায়ক। মহাপরিচালকের দিকনির্দেশনা অনুসরণ করে সদর দফতর থেকে মাঠপর্যায় পর্যন্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সদস্য-সদস্যাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আরো গতিশীল, কার্যকর ও জনবান্ধব করেছে।
প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী দেশের বৃহত্তম জনসম্পৃক্ত নিরাপত্তা বাহিনী হিসেবে জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা এবং মানবিক সেবায় অঙ্গীকারবদ্ধ। শারদীয় দুর্গোৎসব-২০২৬ উপলক্ষে বাহিনীর সদস্য-সদস্যাদের সাহসিকতা, সতর্কতা, মানবিকতা, নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে নিরাপত্তা ও সেবার সমন্বিত যে দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে, তা বাহিনীর পেশাগত উৎকর্ষ, প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকায়ন এবং জনসম্পৃক্ত নিরাপত্তা দর্শনের সুস্পষ্ট প্রতিফলন যা ভবিষ্যতেও দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, জননিরাপত্তা এবং যেকোনো প্রয়োজনে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








