ইরান যুদ্ধে আমেরিকার ব্যয় ৪৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়াল

 নয়া দিগন্ত ডেস্ক

ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের ব্যয় বেড়ে ৪৫ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। শুক্রবার মার্কিন আইনপ্রণেতাদের কাছে জমা দেয়া তথ্যের বরাতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে পেন্টাগন। সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিরক্ষা খাতের মূল ব্যয় ছিল ৪৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। এর সাথে যুদ্ধের বাড়তি জ্বালানিবাবদ যুক্ত হয়েছে আরো ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। তবে ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন ঘাঁটি ও ভবন সংস্কারের ব্যয় এখনো এই হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করেনি পেন্টাগন। খবর মিডল ইস্ট আই, আলজাজিরা, মেহের নিউজ এজেন্সি ও আনাদোলু।
পেন্টাগনের এই তথ্য কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের (সিবিও) আগের হিসাবকেও ছাড়িয়ে গেছে। সিবিও জানিয়েছিল, ১ আগস্ট পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের খরচ ছিল ৩৮ বিলিয়ন ডলার, যার সিংহভাগ (প্রায় ২১.৭ বিলিয়ন ডলার) গেছে ব্যবহৃত গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্র পুনরায় মজুদ করতে। সংস্থাটির শঙ্কা, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে প্রতি মাসে আরো ২ থেকে ৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয় যোগ হতে পারে। এর বাইরে ২০২৭ সালের প্রথম প্রান্তিকে মার্কিন মূল্যস্ফীতি প্রায় ০.৫ শতাংশ বাড়তে পারে বলে তারা ইঙ্গিত দিয়েছে।
অন্যদিকে, মার্কিন সংসদে পাস হওয়া ‘লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অব ২০২৬’ নামক আইনে স্বাক্ষর করেছেন প্রেসিডেন্ট   ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর ফলে ১৯৯৬ সালের ইরান নিষেধাজ্ঞা আইনের মেয়ার্দ ২০৩১ সাল পর্যন্ত বাড়ল। একইসাথে রাশিয়া থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়ানোসহ তেল-গ্যাসের ক্রেতা দেশগুলোর ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক চাপানোর প্রশাসনিক ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। ওয়াশিংটনের এ পদক্ষেপকে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ বলে উল্লেখ করে প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান।
এদিকে হরমুজ প্রণালী অবরোধের মুখে গত ৮০ বছরের মধ্যে বৈশ্বিক বাণিজ্য সবচেয়ে বড় বিপদের মুখে পড়েছে বলে চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ডব্লিউটিও প্রধান নগোজি ওকনজো-ইওয়েলা। কৌশলগত এই জলপথ থমকে যাওয়ায় খাদ্য ও সারের দাম লাফিয়ে বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে জ্বালানি তেলের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলার অতিক্রম করায় তা সার্বিক বাণিজ্য প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পরিস্থিতি সামলাতে মার্কিন নৌবাহিনী বিকল্প পথ তৈরির কথা বললেও বাস্তবে জাহাজের আসা-যাওয়া উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে বলে জানিয়েছে পর্যবেক্ষণ সংস্থা কেপলার। ওমান ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা’ কার্যকর করার বিষয়ে কূটনৈতিক আলাপ-আলোচনা অব্যাহত রেখেছে তেহরান, যা ইতোমধ্যে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি অনুমোদন করেছেন। 
একই প্রেক্ষাপটে কথা বলতে গিয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বিশ্বরাজনীতিতে নিয়ম না মানার প্রবণতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, কোনো বহিরাগত শক্তি চাপিয়ে দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না; বরং নিজেদের মধ্যে বিশ্বাস ও সম্মান বাড়িয়েই আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহেও। ড্রোন হামলায় সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন বিকল হওয়া এবং লোহিত সাগরে হাউছিদের সামরিক তৎপরতার কারণে অক্টোবরে ইউরোপীয় দু’টি তেল শোধনাগারে নির্ধারিত অপরিশোধিত তেল সরবরাহ বাতিল করেছে সৌদি আরব। বর্তমানে ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য প্রতি ব্যারেলে ১০৩ ডলারে পৌঁছেছে, যা বিশ্বজুড়ে প্রক্রিয়াজাত জ্বালানির বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি করেছে।
সামরিক শক্তির বিচারেও পরিবর্তনের দাবি তুলছে তেহরান। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ দাবি করেছেন, মার্কিন বাহিনীর অত্যাধুনিক এফ-৩৫ ও এফ-১৫ যুদ্ধবিমানের একচ্ছত্র অধিপত্যের দিন এখন অতীত। যুক্তরাষ্ট্র জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনও স্বীকার করেছেন যে, তাদের সামরিক বাহিনীকে এখন নতুন ধরনের যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
এদিকে ইরানে ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের হয়ে সামরিক ও ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির গোপনীয় নথিপত্র পাচারের অপরাধে হোসেইন পেদারান নামের এক ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে ইরান। বিচার বিভাগীয় সংবাদ মাধ্যম মিজানের বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স গতকাল নিশ্চিত করেছে যে, দেশটির সুপ্রিম কোর্ট সাজা বহাল রাখার পর তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। পেদারানের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে মধ্য ইসফাহান প্রদেশের স্পর্শকাতর সামরিক অবকাঠামো ও ১২ দিনের যুদ্ধ চলাকালীন ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির তথ্য ইসরাইলের কাছে হস্তান্তরের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছিল।
পশ্চিম এশিয়ায় মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের সময় মার্কিন বাহিনীর প্রাণহানির প্রকৃত চিত্র পেন্টাগনের প্রকাশিত তথ্যের চেয়েও বেশি হতে পারে বলে দাবি করেছে ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’। মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতরের ছয়জন অভ্যন্তরীণ সূত্রের তথ্যানুযায়ী, সঙ্ঘাত শুরু থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ২২ জন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন, যদিও অফিশিয়াল ক্যাসজুয়ালটি ট্র্যাকিং সিস্টেমে নিহতের সংখ্যা ১৮ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
অন্য এক আন্তর্জাতিক পদক্ষেপে, ইরানের ওপর বিশ্বসংস্থার ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ‘ব্যাংক মেলাত’ নামের একটি বিশিষ্ট ইরানি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা লাইসেন্স বাতিল করেছে তুরস্ক। গতকাল প্রকাশিত সরকারি গেজেটের বরাতে জানা যায়, দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্থায়িত্ব ও আমানতকারীদের সুরক্ষার লক্ষ্যে ব্যাংকিং আইনের ৭১বি ধারায় এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এর পূর্বে রেভল্যুশনারি গার্ডের (আইআরজিসি) সাথে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগে তুর্কি বিনিয়োগ ব্যাংক ‘গোল্ডেন গ্লোবাল ব্যাংক’-এর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল মার্কিন অর্থ বিভাগ।
কূটনৈতিক ফ্রন্টে, জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উত্থাপিত ইরানবিরোধী একটি বিতর্কিত খসড়া প্রস্তাবে রাশিয়া ও চীনের ভেটো প্রদানকে ‘ঐতিহাসিক ও অমূল্য’ বলে আখ্যা দিয়েছেন রাশিয়ায় নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূত কাজেম জালালি। ২০১৫ সালের আন্তর্জাতিক পরমাণু চুক্তির (জেসিপিওএ) আওতায় প্রত্যাহার হওয়া পুরনো বিধিনিষেধ ও নজরদারি প্যানেল পুনর্বহালের এই চক্রান্ত ভেস্তে যাওয়ায় তিনি মস্কো ও বেইজিংকে বিশেষ ধন্যবাদ জানান। নিউ ইয়র্কে ইরানের স্থায়ী মিশনও নিশ্চিত করেছে যে মার্কিন ওই রাজনৈতিক প্রস্তাব নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপনের পর নাকচ হয়ে গেছে।