লংমার্চ
রংপুর জিলা স্কুল মাঠে ১১ দলীয় জোটের লংমার্চের সমাপনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন জামায়াত আমির ডা: শফিকুর রহমান নয়া দিগন্ত

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, যে পথে হেঁটে শেখ হাসিনা ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, বর্তমান সরকারও সেই পথেই হাঁটছে বলে তারা দেখতে পাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘হাসিনার পথে হাঁটলে পরিণতি তার মতোই হবে।’

শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ৯টায় রংপুর জিলা স্কুল মাঠে ১১ দলীয় জোটের ঢাকা-রংপুর লংমার্চের সমাপনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘১৮ কোটি মানুষের অধিকার রক্ষায় প্রয়োজনে আমাদের আট দফা এক দফায় পরিণত হবে।’

গণভোটের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘জনগণের ৭০ ভাগ গণভোটে “হ্যাঁ” দিয়েছে। আমরা শুরু থেকেই এ কথা বলে আসছি। জাতীয় নেতার মুখ থেকে জনগণের প্রতি যে আহ্বান আসে, তা জাতির প্রতি তার অঙ্গীকার। কিন্তু সেই অঙ্গীকার রক্ষা করা হয়নি। গণভোটের রায় অগ্রাহ্য করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘সংবিধানে গণভোট না থাকলে ২০২৪ সালের গণবিপ্লব কোনো সংবিধান মেনে হয়েছে? ফ্যাসিস্টদের সংবিধান অনুসরণ করাতে পারেননি। তাহলে কি ফ্যাসিস্টমুক্ত বাংলাদেশ গড়া হয়েছে?’

জামায়াত আমির আরো বলেন, ‘যদি সংবিধানে গণভোট না থাকে, তাহলে ২০২৬ সালে বাংলাদেশে কোনো নির্বাচনও নেই, কোনো সরকারও নেই। সুতরাং মানতে হলে সবটা মানতে হবে, আর বাদ দিলে সবটা বাদ দেয়ার ঘোষণা দিতে হবে। তখন দেখা যাবে কার বুকের পাটা কতটুকু।’

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে সরকারের পক্ষ থেকে তিস্তা বাঁচানোর কথা বলা হলেও সাত মাসেও এর বাস্তব অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘জনগণকে বারবার ধোঁকা দেয়া ঠিক হবে না।’

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা নির্বাচনের আগেই মাঠে দাঁড়িয়ে বলেছিলাম, আল্লাহ আমাদের নির্বাচিত করে সরকার গঠনের সুযোগ দিলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করব। গোটা উত্তরবঙ্গকে কৃষির রাজধানী হিসেবে গড়ে তুলব এবং নদীগুলোর জীবন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করব।’

নির্বাচনের ফল মেনে নেয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা সবকিছু সহ্য করে দেশের স্বার্থে বৈষম্যহীন ফলাফল মেনে নিয়েছিলাম, যাতে দেশ শান্তির দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু সরকার গঠনের পর সংসদে গিয়ে তারা দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো ভুলে গেছে।’

বর্তমান সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘একটা একটা করে সবকিছু তারা উল্টো পথে নিয়ে যাচ্ছে। যেই পথে হাসিনা চলে ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছিলেন, আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি বর্তমান সরকারও সেই পথেই হাঁটছে। যদি একই পথে হাঁটেন, তাহলে পরিণতিও একই হবে।’

জামায়াত আমির বলেন, ‘আমরা আট দফা দিয়েছি জনগণের দফা হিসেবে। আপনারা ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পান না, রংপুরের মানুষ গ্যাস পায় না, কৃষক সার পায় না, সন্তানেরা হাতে কাজ পায় না। তবে একদলের লোকেরা কাজ পায়—সেটা চাঁদাবাজি।’

তিনি অভিযোগ করেন, চাঁদাবাজির কারণে সারা দেশের মানুষ অতিষ্ঠ। এর ফলে দ্রব্যমূল্য বেড়েছে এবং মানুষের জীবনও ঝরে যাচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

সিরাজগঞ্জে এক ব্যক্তির ওপর হামলার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘আমরা স্পষ্টভাবে হুঁশিয়ার করে দিচ্ছি, এ ধরনের সন্ত্রাস আবার করা হলে ১৮ কোটি মানুষকে সাথে নিয়ে সন্ত্রাসীদের কালো হাত ভেঙে দেয়া হবে।’

২০২৪ সালের আন্দোলনে নিহত আবু সাঈদের প্রসঙ্গ তুলে জামায়াত আমির বলেন, ‘আপনাদের বুকের সন্তান আবু সাঈদ ২৪-এর আন্দোলনের আইকন। সারা দুনিয়া তার জন্য কেঁদেছে, সারা দুনিয়ার বিপ্লবীরা তাকে নিয়ে গর্ব করে।’

তিনি আরো বলেন, ‘ইতিমধ্যে এমন একটি আইন পাস করা হয়েছে, যা স্পষ্টভাবে আল্লাহর কোরআন ও রাসুলে করিম (সা.)-এর খেলাফ। এর মূল্য দিতে হবে। আমরা রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ করেছি, তিনি যেন এতে স্বাক্ষর না করেন। কারণ তিনিই বলেছিলেন, কোরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন করা হবে না।’

আইনটি পাস হলে এর বিরুদ্ধে মুসলমানেরা প্রতিবাদ করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষায়, ‘এই আইন করা হলে বাংলাদেশের মুসলমানেরা বসে থাকবে না। এই আইনের কারণে ঘরে ঘরে বিপর্যয় সৃষ্টি হবে।’

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম  এমপি বলেছেন, "  সরকারকে বলব, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলব, আপনি পুলিশ সংস্কার কমিশন করেন নাই, আপনি গুম আইন করে গুমের সুযোগ করে দিয়েছেন। আপনারা এসআরবি করেছেন, আপনারা পুলিশকে আবারো ব্যবহার করার চেষ্টা করছেন বিরোধী দল দমনের জন্য। এই চেষ্টা ব্যর্থ হবে, কারণ বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা আর কাউকে এই স্বৈরাচারী হইতে দেবে না। যদি কেউ স্বৈরাচারী হওয়ার চেষ্টা করে, যা এই সরকার করছে, রংপুরের মাটি থেকেই প্রথম বিদ্রোহ, প্রথম বিপ্লবের আহ্বান আসবে ইনশাআল্লাহ।"

নাহিদ ইসলাম বলেন, " আপনারা গণভোটে ভোট দিয়েছেন, গণভোটের রায় কি বাস্তবায়ন হয়েছে? বিচার কি নিশ্চিত হয়েছে? আমরা ওসমান হাদীর বিচার পাইনি। কিছুদিন আগে এক বিচারের রায় এসেছে, কিন্তু রায় তাদের বা মৃত্যুদণ্ড তাদের জন্যই আসে যারা দেশে নাই। যারা দেশে অবস্থান তাদের মৃত্যুদণ্ডের রায় কেন আসে না? আমরা তাদের মৃত্যুদণ্ডের রায় দেখতে চাই, রায় কার্যকর দেখতে চাই।"

নাহিদ আরো বলেন, " আমরা দেখছি সারাদেশে বিদ্যুৎ, গ্যাস এবং সার সঙ্কট। এই রংপুর অঞ্চলের মানুষ বেশিরভাগ কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়, আজকে তারা সার পাচ্ছে না, গ্যাস পাচ্ছে না, বিদ্যুৎ পাচ্ছে না। আমরা দেখছি সারাদেশে নজিরবিহীন দলীয়করণ হয়েছে, সকল প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ করছে। আমরা দেখছি চাঁদাবাজ, দখলদারিত্বসহ সন্ত্রাসের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশের সকল ক্যাম্পাস, সকল এলাকা।"

জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলামের সভাপতিত্বে সমাবেশে আরো বক্তব্য দেন বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান ড. কর্নেল অলি আহমেদ বীর বিক্রম, মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাগপার রাশেদ প্রধান, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, জামায়াতে ইসলামীর অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ও রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চল পরিচালক মাওলানা আব্দুল হালিম, অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি রফিকুল ইসলাম খান, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও রংপুর-দিনাজপুর সহকারী অঞ্চল পরিচালক মাওলানা মমতাজ উদ্দিন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল, রংপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রব্বানী, রংপুর মহানগর আমির এ টি এম আজম খান, নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী, ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম, ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ, এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলম,  ছাত্রনেতা রেজাউল করিম শাকিল, সাবেক শিবির সভাপতি দেলোয়ার হোসেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিবির সভাপতি মুজাহিদ ফয়সাল, সাবেক শিবির সভাপতি রাজিবুর রহমান পলাশ, ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের রংপুর মহানগর সভাপতি মাওলানা ইব্রাহীম খলিল, জাগপার কেন্দ্রীয় নেতা অধ্যাপক ইকবাল হোসেন, এনসিপির মহানগর আহ্বায়ক আব্দুল মালেক, জেলার আহ্বায়ক আল মামুন এবং বাংলাদেশ লেবার পার্টির মহানগর সভাপতি শামসুদ্দিন রাজা প্রমুখ।

সমাবেশ সঞ্চালনা করেন মহানগর জামায়াতের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি আল আমিন হাসান, জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা এনামুল হক এবং শিবিরের রংপুর মহানগর সভাপতি আনিসুর রহমান।


এর আগে সকাল ৭টায় ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে উদ্বোধনী সমাবেশের মধ্য দিয়ে প্রায় ৩ হাজার গাড়ির বহর নিয়ে রংপুরের উদ্দেশে লংমার্চ শুরু হয়। পথে গাজীপুরের ভোগড়া, টাঙ্গাইলের নগর জালফৈ, সিরাজগঞ্জ চৌরাস্তা, বগুড়ার চারমাথা ও গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। পথে পথে হাজারো মানুষ লংমার্চকে স্বাগত জানায়।

বিকেল ৫টায় লংমার্চের রংপুর জিলা স্কুল মাঠে পৌঁছানোর কথা থাকলেও পথে মানুষের উপস্থিতির কারণে জাতীয় নেতারা রাত সাড়ে ৮টার দিকে সমাবেশস্থলে পৌঁছান। এ সময় মাঠে বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম হয়। বক্তব্যের ফাঁকে ফাঁকে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন দাবির পক্ষে সংগীত পরিবেশন করা হয়।

রংপুরের সমাবেশে সাত দফার সাথে স্থানীয় মানুষের দাবির প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি যুক্ত করা হয়। আয়োজকদের পক্ষ থেকে এটিকে উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার সাথে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ দাবি হিসেবে তুলে ধরা হয়।