
শফিকুল আলম ভূঁইয়া রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ)
দুই বগলে দু’টি কাঁচা লাউ চেপে ধরে থরথর করে কাঁপতে থাকা চার ইঞ্চি চওড়া এক ফালি বাঁশের ওপর পা ফেলছেন বৃদ্ধ হেলাল মিয়া। নিচে কুচকুচে কালো, তীব্র দুর্গন্ধযুক্ত নদীর পানি। একটু পা পিছলে গেলেই পঙ্গুত্ব বা অবধারিত মৃত্যু। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৭৫ নম্বর ওয়ার্ডের বালু নদী তীরের ২৫টি গ্রামের ৫০ লাখ মানুষের কাছে এটি নিত্যদিনের ঘটনা।
রাজধানীর খুব কাছে হলেও খাতা-কলমে মেগাসিটির অভিজাত ট্যাক্স প্রদানকারী এই বাসিন্দারা যেন এক প্রদীপের নিচে অন্ধকার রাজ্যে বাস করছেন। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে ২০২৬ সালেও খিলগাঁও, বাসাবো বা মতিঝিলে যাতায়াতের জন্য তাদের ভরসা ১৭টি নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো।
নগরপাড়া, খামারপাড়া, কামশাইর, গৌড়নগর, দাসেরকান্দিসহ ২৫টি গ্রামের মানুষের জীবনের গতি আটকে আছে ১৫০ থেকে ৩০০ ফুট দৈর্ঘ্য এবং মাত্র আড়াই-তিন ফুট প্রস্থের এসব ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকোতে। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় হোল্ডিং ট্যাক্স তিন থেকে পাঁচ গুণ বাড়লেও নাগালের বাইরে রয়ে গেছে মৌলিক নাগরিক সুবিধা। স্থানীয় প্রবীণ আলী মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, কত্তো এমপি আইলো আর গেলো, কেউ সেতু কইরা দেয় না। ইলেকশন আইলে কয়, পরে আর খবর থাহে না।
সরকারি অর্থায়নে সেতু না হলেও এই সাঁকো তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণে চলছে রমরমা টোল বাণিজ্য। সাঁকো পারাপারে জনপ্রতি পাঁচ টাকা এবং মালামালসহ ১০ টাকা পর্যন্ত নেয়া হচ্ছে। একেকটি সাঁকো থেকে দিনে তিন হাজার থেকে সাত হাজার এবং মাসে লাখ টাকার বেশি টোল ইজারাদারদের পকেটে যাচ্ছে।
এখন কেবল চলাচলের মাধ্যম নয়, এই ১৭টি সাঁকো রূপ নিয়েছে একেকটি মৃত্যুকূপে। স্থানীয়রা জানান, সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে না পেরে এবং সাঁকো থেকে পড়ে গত পাঁচ বছরে অন্তত ২১ জন মারা গেছেন। ২০২৪ সালে গৌড়নগরের শফি মিয়া পড়ে গিয়ে মারা যান, ২০২৫ সালে পঙ্গুত্ব বরণ করে ১০ বছরের শিশু ফাতেমা। কেবল চলতি ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই ঘটে গেছে অন্তত ৯টি বড় দুর্ঘটনা। প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান জানান, একটি নদীতে ১৭টি বাঁশের সাঁকো থাকা দুঃখজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করা হবে।







