
ফিলিস্তিনে নতুন করে গণহত্যা শুরুর পর কেটে গেছে তিন বছর। তিন বছর পরও সীমাহীন কষ্ট আর দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন ফিলিস্তিনিরা। যুদ্ধের ভয়াবহ ক্ষত এখনো বয়ে বেড়াচ্ছে গাজা। এ পর্যন্ত সেখানে ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন। ধ্বংস হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ বাড়িঘর, কল-কারখানা, বিদ্যালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সব অবকাঠামোর বড় অংশ। ধারণা করা হচ্ছে, গাজা আবার গড়ে তুলতে খরচ হবে ৭১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা ইরনা মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) জানায়, গত তিন বছরে গাজায় অসংখ্য অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। কিছু কিছু দেশের নীরবতা ও উদাসীনতার মধ্যে এসব ঘটেছে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের মতো কয়েকটি দেশ এসব অপরাধীদের সমর্থন করেছে। তাই গাজার সঙ্কট শুধু নিহত আর আহত মানুষের সংখ্যা দিয়ে বোঝা যাবে না। মানবিক সঙ্কট, অবকাঠামোর ধ্বংস আর পুনর্গঠনের বিপুল ব্যয়—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ৫ অক্টোবর ২০২৬-এর সর্বশেষ হিসাবে নিহতের সংখ্যা ৭৪ হাজার ২৪৩ এবং আহত ১ লাখ ৭৫ হাজার ২৩২ জন। ২০২৫ সালের অক্টোবরে কথিত যুদ্ধবিরতির পরও অন্তত ১ হাজার ৪৬০ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৫ হাজার ১১৬ জনের বেশি আহত হয়েছেন। অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি অপরাধ ও হামলা পুরোপুরি থামাতে পারেনি। এ কেমন যুদ্ধবিরতি! নিহতদের বড় অংশ শিশু, নারী ও বয়স্ক মানুষ। ফিলিস্তিন পরিসংখ্যান কর্তৃপক্ষের ১৮ জুলাই ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, গাজায় নিহতদের মধ্যে ১৮ হাজার ৫৯২ শিশু, ১২ হাজার ৪০০ নারী এবং ৪ হাজার ৪১২ জন বয়সী মানুষ রয়েছেন। নিহত হয়েছেন ১ হাজার ৪১১ স্বাস্থ্যকর্মী, ২৫২ সাংবাদিক, ৮০০ শিক্ষাকর্মী, জাতিসঙ্ঘের ২০৩ কর্মী এবং ১১৩ জন বেসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্য। নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ১১ হাজার ২০০ মানুষ। তাদের মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ৭০০ই নারী ও শিশু।
সারা জীবনের ক্ষত
গাজায় আহত ১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ শুধু একটি সংখ্যা নন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ বিস্তারিত হিসাবে, গাজায় প্রায় ৪২ হাজার মানুষ এমনভাবে আহত হয়েছেন, যা তাদের জীবন স্থায়ীভাবে বদলে দিয়েছে। তাদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ শিশু। এ ছাড়া ৫ হাজারের বেশি মানুষের অঙ্গচ্ছেদ করতে হয়েছে। অঙ্গ, মেরুদণ্ড, মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাত এবং ব্যাপকভাবে পুড়ে যাওয়া হাজার হাজার মানুষের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন প্রয়োজন। ইউনিসেফ জানিয়েছে, ২০২৬ সালের জুনের শেষ নাগাদ আহত শিশুর সংখ্যা প্রায় ৪৫ হাজার। তাদের মধ্যে ১১ হাজারের বেশি শিশু এমন আঘাত পেয়েছে, যা তাদের গোটা জীবন বদলে দিয়েছে।
গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থাও যুদ্ধের বড় লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের মার্চে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ৩৫টি হাসপাতালকে কেন্দ্র করে করা এক মূল্যায়নে দেখা যায়, সাতটি হাসপাতাল পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে এবং ২৬টি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাত্র ১৯টি হাসপাতাল বা ৫৪ শতাংশ আংশিকভাবে চালু ছিল। কোনো হাসপাতালই পুরোপুরি সচল ছিল না। ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জ্বালানির ঘাটতিতে চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
গাজার প্রায় ৯৮ শতাংশ স্কুল ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইউনিসেফের ২০২৬ সালের এপ্রিলের হিসাবে, ৯৩ শতাংশের বেশি স্কুলে বড় ধরনের সংস্কার বা পুরোপুরি পুনর্নির্মাণ দরকার। প্রায় ৭ লাখ ৪ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু প্রায় তিন বছর ধরে সরাসরি শ্রেণিকক্ষে পড়াশোনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। এখনো ৪ লাখ ২০ হাজার শিশু সরাসরি শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে না।
যুদ্ধের আগে গাজায় ছিল ১ হাজার ২৭৫টি মসজিদ। গাজার ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ২০২৬ সালের আগস্টের হিসাবে, এর মধ্যে ১ হাজার ৭৬টি পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে এবং আরো ১৬৫টি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সত্যের খবর থামিয়ে দেয়ার কোশেশ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজায় তিন বছরের এই ধ্বংসযজ্ঞের খবর যাতে বিশ্বের কাছে না পৌঁছায়, প্রাণপণে সে তৎপরতা চালানো হয়েছে বা হচ্ছে। সত্য তুলে ধরতে গিয়ে ফিলিস্তিনি সাংবাদিকদেরও বড় চড়া মূল্যই দিতে হয়েছে। এই সময়ে ২৬৩ সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। আরো শত শত সাংবাদিক আহত, গ্রেপ্তার কিংবা বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। গাজার অধিকাংশ সংবাদমাধ্যমের কার্যালয় ও প্রতিষ্ঠানও গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
অনেক সাংবাদিক নিজেদের বাড়ি, চাকরি এবং পরিবারের সদস্য হারিয়েছেন। কাজ চালিয়ে যেতে তাদের অনেকে বোমায় বিধ্বস্ত এলাকা, শরণার্থীশিবির ও হাসপাতালে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।
গাজায় ধ্বংস হওয়া স্থাপনার সংখ্যা ২ লাখ ছাড়িয়েছে। জাতিসঙ্ঘের উপগ্রহচিত্র অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৬ জুন পর্যন্ত গাজার মোট স্থাপনার ৮২ শতাংশ, অর্থাৎ ২ লাখ ১ হাজার ২৯০টি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪২২টি পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩ লাখ ২৮ হাজার ৬২৭টি আবাসিক ইউনিট। যুদ্ধে ১৯ লাখের বেশি মানুষ একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ হারিয়েছেন নিজেদের ঘরবাড়ি।
গাজার ধ্বংসস্তূপের পরিমাণ দেখলেই এই বিপর্যয়ের ভয়াবহতা বোঝা যায়। জাতিসঙ্ঘের হিসাবে, গাজায় তৈরি হয়েছে ৬ কোটি টনের বেশি ধ্বংসস্তূপ। এসব সরাতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে। পুনর্গঠন বাধাগ্রস্ত করার পাশাপাশি ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকা বিস্ফোরক এবং ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ধসে পড়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
জাতিসঙ্ঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের এপ্রিলের যৌথ মূল্যায়নে বলা হয়েছে, আগামী এক দশকে গাজার পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনে প্রয়োজন হবে ৭১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে সরাসরি ক্ষতির জন্য ৩৫ দশমিক ২ বিলিয়ন এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষতির জন্য ২২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার দরকার। শুধু প্রথম ১৮ মাসেই প্রয়োজন ২৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। আবাসন খাতে ১৬ দশমিক ২ বিলিয়ন, কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থায় ১০ দশমিক ৫ বিলিয়ন, স্বাস্থ্য খাতে ১০ বিলিয়ন এবং বাণিজ্য ও শিল্প খাতে ৯ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে। গাজার অর্থনীতি সংকুচিত হয়েছে ৮৪ শতাংশ। জাতিসঙ্ঘের মূল্যায়ন বলছে, গাজার মানব উন্নয়নের স্তর পিছিয়ে গেছে প্রায় ৭৭ বছর।
অক্টোবরে কথিত যুদ্ধবিরতির পর সংঘাতের তীব্রতা কিছুটা কমলেও সঙ্কটের সমাপ্তি ঘটেনি। বড় ধরনের হামলা ও হতাহতের ঘটনা এখনো ঘটছে। গাজার বিস্তীর্ণ এলাকায় মানুষের চলাচল ও সহায়তা পৌঁছানো কঠিন হয়ে আছে। বড় পরিসরে পুনর্গঠনও শুরু হয়নি। বাস্তব জীবনে ফিরতে এবং গাজা পুনর্গঠন করতে রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক বাধা এখনো রয়েছে।
গাজার সঙ্কট এখন শুধু যুদ্ধ বন্ধের বিষয় নয়। ধ্বংসস্তূপ সরানো, বাস্তুচ্যুত মানুষকে ঘরে ফেরানো, হাসপাতাল ও স্কুল পুনর্গঠন এবং জরুরি সেবা ফিরিয়ে আনতে বিপুল অর্থ, স্থায়ী নিরাপত্তা ও স্পষ্ট রাজনৈতিক ব্যবস্থা দরকার। এই হিসাবের মধ্যে থাকবে ধ্বংস হয়ে যাওয়া একটি শহর, অচল হয়ে পড়া জীবনধারণের জরুরি ব্যবস্থাও। অস্ত্র থেমে গেলেও গাজার এই সঙ্কট আরো বহু বছর থেকে যাবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








