ইরান যুদ্ধের জেরে ইউরোপ থেকে সেনা কমাবে পেন্টাগন

 আলজাজিরা ও এনবিসি নিউজ
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করতে গিয়ে কৌশলগত জটিলতায় পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনীকে নিজস্ব ঘাঁটি ব্যবহার করে হামলা চালানোর অনুমতি না দেয়ায় ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর অসন্তুষ্ট ওয়াশিংটন সেখানে তাদের সামরিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করার চিন্তাভাবনা করছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ইউরোপে নিয়োজিত সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে নেয়ার একাধিক প্রস্তাব পেন্টাগনের শীর্ষ কমান্ডাররা শিগগিরই মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের কাছে উপস্থাপন করতে পারেন। ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকা এবং ইউরোপজুড়ে নিরাপত্তা আশঙ্কার মধ্যেই সামরিক উপস্থিতি কমানোর এই তোড়জোড় শুরু হলো। অতি সম্প্রতি জার্মানির একটি বিমানবন্দরে ড্রোন হামলার পেছনে মস্কোর হাত রয়েছে বলে দাবি করেছে দেশটি। দশকের পর দশক ধরে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো নিরাপত্তার জন্য নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন বা ন্যাটোর ওপর নির্ভরশীল হলেও গত এক বছরে মার্কিন প্রশাসনের নীতি ও অবস্থানের কারণে দুই পক্ষের প্রাতিষ্ঠানিক দূরত্ব তীব্র আকার ধারণ করেছে।
মার্কিন রণকৌশল পুনর্মূল্যায়ন ও অসন্তোষ
এনবিসি নিউজের তথ্য অনুযায়ী, ন্যাটোর সার্বিক কাঠামো পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে ইউরোপীয় অঞ্চলে সেনাসংখ্যা কাটছাঁটের নানা পরিকল্পনা যাচাই করছে পেন্টাগন। ব্রাসেলসে ন্যাটোর গত বৈঠকে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ স্পষ্ট বার্তা দিয়ে জানান, ইউরোপকে নিজ সুরক্ষার ‘প্রধান দায়’ নিজেদের কাঁধে তুলে নিতে হবে। বিশেষ করে ইরানের ওপর আক্রমণ চালানোর সুবিধার্থে ঘাঁটি, আকাশসীমা ও অন্যান্য সহায়তায় ইউরোপীয় দেশগুলোর অস্বীকৃতিকে তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। মার্কিন প্রশাসন মনে করে, এসব সুবিধা প্রদান পূর্বে নিশ্চিত থাকার কথা থাকলেও মিত্ররা তা না দিয়ে মার্কিন সেনাদের ঝুঁকিতে ফেলেছে।
 সেনা ও সরঞ্জাম প্রত্যাহারের নানা সমীকরণ
বর্তমানে ইউরোপীয় ভূখণ্ডে প্রায় ৬৮ হাজার মার্কিন সেনা দায়িত্বরত রয়েছে। প্রথম পরিকল্পনা অনুযায়ী, এর এক-তৃতীয়াংশ সরিয়ে নেয়া হতে পারে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে জার্মানি, ইতালি ও স্পেনে অবস্থিত ঘাঁটিগুলোতে। অন্য দিকে আরো বড় আকারের প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত হলে ৪০ হাজারের মতো সেনার পাশাপাশি আকাশযান, যুদ্ধজাহাজ ও ভারী সরঞ্জাম পুরোপুরি গুটিয়ে নেবে ওয়াশিংটন। এর বাইরে বিকল্প হিসেবে পশ্চিম ও মধ্য ইউরোপীয় দেশের অবস্থান থেকে সেনাদের সরিয়ে ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত অর্থাৎ রাশিয়ার সংলগ্ন দেশগুলোতে স্থানান্তরিত করা হতে পারে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে আগামী ৬ নভেম্বরের সময়সীমা নির্ধারণ করেছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী।
ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে প্রক্রিয়া
বাস্তবে রোমানিয়ায় থাকা দুই হাজার সেনার অর্ধেক ইতোমধ্যে প্রত্যাহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। জার্মানি থেকে আরো পাঁচ হাজার সেনা কমানোর পদক্ষেপ দৃশ্যমান। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সামরিক পদক্ষেপের সমালোচনা করায় জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রাথমিকভাবে ২৫ হাজার সেনা সরানোর উদ্যোগ নিলেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর মধ্যস্থতায় তা তখন স্থগিত ছিল। ইউরোপের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, বড় আকারের সেনা অপসারণ পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল করবে এবং রাশিয়ার জন্য কৌশলগত সুবিধাজনক পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে। তবে এটি মূলত সেনা সরানোর সময়সূচির ওপর নির্ভরশীল। রিপাবলিকান দলের সিনেটর রজার উইকার ও প্রতিনিধি মাইক রজার্স যৌথ বিবৃতিতে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে বলেছেন, এমন সিদ্ধান্ত ক্রেমলিনের কাছে ভুল বার্তা পাঠাবে।
অর্থনৈতিক নীতি, বাণিজ্যিক দ্বন্দ্ব ও এশীয় শঙ্কা
প্রতিরক্ষা ব্যয়ের ক্ষেত্রে ন্যাটো সদস্যদেশগুলোকে জিডিপির ৫ শতাংশ নির্ধারণের শর্ত দিয়েছেন ট্রাম্প, যদিও দেশগুলো আগামী ২০৩৫ সালের মধ্যে ৩.৫ শতাংশে পৌঁছানোর লক্ষ্য ধরেছে। প্রতিরক্ষা নীতির পাশাপাশি ইউরোপীয় পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ বাড়তি শুল্ক আরোপ এবং সম্প্রতি গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ অর্জন সংক্রান্ত ট্রাম্পের বাণিজ্যিক ও ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান ওয়াশিংটন-ইউরোপ তিক্ততা বাড়িয়ে দিয়েছে। ওয়াশিংটনের এই পরিবর্তনশীল নিরাপত্তা নীতি শুধু ইউরোপেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দীর্ঘদিনের মিত্র তাইওয়ানের মধ্যেও তৈরি করেছে গভীর উৎকণ্ঠা। চীনকে মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করা তাইওয়ানকে ট্রাম্প বার্তা দিয়েছেন, নিরাপত্তার জন্য তাদের নির্দিষ্ট অর্থ প্রদান করা উচিত। তদুপরি, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপে মনোযোগ দিতে গিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের বিমানবাহী রণতরি ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’সহ মূল সামরিক সক্ষমতা মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেয়ায় পূর্ব এশীয় অঞ্চলে প্রতিরক্ষাবলয় শিথিল হওয়ার শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। একইভাবে, ইয়েমেনের হুতি ও ইরানের যৌথ সামরিক প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সৌদি আরব ও উপসাগরীয় মিত্রদের সুরক্ষাতেও নতুন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।