ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে পুতিনকে রাজি করাতে ব্যবসার টোপ ট্রাম্পের
গত বছর আলাস্কায় বৈঠকের আগে পুতিন ও ট্রাম্প ছবি: ইন্টারনেট

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দূতেরা চলতি মাসে ক্রেমলিনে রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সাথে বৈঠকে বসেন। সেখানে রুশ নেতা বেশ আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। পুতিন বলেন, কয়েক মাসের মধ্যেই রুশ সেনারা ইউক্রেনের পুরো দনবাস অঞ্চল দখল করে নেবে। একই সাথে রাশিয়া ইউক্রেনের বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় ব্যাপক হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও জানান তিনি। ফলে ইউক্রেনকে একটি ভয়াবহ শীতের মুখোমুখি হতে হবে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।
তখন ট্রাম্পের দূতদের একজন জ্যারেড কুশনার পাল্টা যুক্তি দেন। আলোচনার বিষয়ে অবগত এক ব্যক্তি এবং এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, ‘কুশনার বলেন, যথাযথ সম্মানের সাথে বলছি- এক বছর আগেও আপনি আমাদের ঠিক একই কথা বলেছিলেন। আরেক বছর পর আমরা যদি আবার এখানে ফিরে আসি এবং আপনি আবার একই কথা বলেন, তখন কী হবে? আমরা কি একটি বছর নষ্ট না করেই এগোতে পারি?’
এই কথোপকথনটি ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্পের ১৮ মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা প্রচেষ্টার মূল সঙ্কটকে তুলে ধরেছে। চলতি সপ্তাহে মার্কিন কংগ্রেস একটি গুরুত্বপূর্ণ নিষেধাজ্ঞা বিল পাস করেছে। এতে রাশিয়ার জ্বালানি খাতকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের জন্য দেশটিকে আরো ‘ভুগতে’ বাধ্য করা এবং পুতিনকে সমঝোতায় চাপ দেয়ার এটি নতুন একটি উদ্যোগ।
তবে বিলটি ট্রাম্পের অনুমোদনের জন্য হোয়াইট হাউজে যাওয়ার সময়ই ট্রাম্প প্রশাসন ভিন্ন একটি কৌশলের ওপর জোর দিচ্ছে। এই কৌশলের আওতায় রাশিয়াকে বিভিন্ন সুবিধা দেয়ার কথা ভাবা হচ্ছে, যাতে পুতিন যুদ্ধ বন্ধের বিষয়টি বিবেচনা করেন। নতুন প্রস্তাবিত সুবিধাগুলোর মধ্যে রয়েছে, ইউক্রেনে যুদ্ধ বন্ধ করার আগেই রাশিয়ার সাথে ব্যবসায়িক চুক্তি সই করা। আলোচনার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত দুই ব্যক্তি এ তথ্য জানিয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, আলোচনা সম্পর্কে খোলামেলা কথা বলার জন্যই তিনি পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি। তিনি জানান, যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই রাশিয়ার সাথে কিছু চুক্তি করা সম্ভব। কারণ এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক নতুন করে গড়ে তোলার বিষয়ে সত্যিই কতটা আন্তরিক, তা দেখানো যাবে। এই অবস্থান গত বছর ট্রাম্পের দেয়া প্রতিশ্রুতির পরিবর্তনকে তুলে ধরছে। তখন তিনি বলেছিলেন, ‘যুদ্ধের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত’ রাশিয়ার সাথে কোনো ব্যবসায়িক চুক্তি হবে না।
এটি আরো ইঙ্গিত করছে যে যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার রাশিয়াকে যুদ্ধ থামাতে রাজি করানোর জন্য নতুন উপায় খুঁজছেন। কারণ, এখন স্পষ্ট হয়ে গেছে- ইউক্রেন নিজের ভূখণ্ডের যে বিস্তীর্ণ অংশ রাশিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, সেই অঞ্চল থেকে সরে যাবে না। অথচ পুতিন যুদ্ধ শেষ করার আগে ওই ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ চান।
ট্রাম্প প্রশাসনের এই অবস্থান কংগ্রেসের রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় দলের সমর্থিত পদ্ধতির সাথে ভিন্ন। ইউক্রেন এবং ইউক্রেনের ইউরোপীয় মিত্ররাও একই ধরনের অবস্থান নিয়েছে। তাদের মতে, পুতিনকে সমঝোতায় বাধ্য করতে হলে রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ আরো বাড়াতে হবে। টেক্সাসের রিপাবলিকান প্রতিনিধি মাইকেল ম্যাককল বুধবার বলেন, ‘এই বিল রাশিয়ার যুদ্ধযন্ত্রকে পঙ্গু করে দেবে এবং শেষ পর্যন্ত পুতিনকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসবে।’
দলীয়ভাবে সমর্থিত এই বিলটি ২৬২-১৫৯ ভোটে পাস হয়। বিলটির অন্যতম প্রধান সমর্থক ছিলেন দক্ষিণ ক্যারোলাইনার রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম। জুলাইয়ে তার মৃত্যুর পর তার বোন ডারলাইন গ্রাহাম তার আসনে দায়িত্ব নেন। ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তিনি বিলটিতে স্বাক্ষর করবেন। বিলটি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে রাশিয়ার সবচেয়ে বেশি তেল বা গ্যাস কেনা দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেবে। একই সাথে রাশিয়ার সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। সিনেটর ডারলেইন গ্রাহাম বলেন, বিলটি ‘প্রেসিডেন্টের আলোচনার ক্ষমতা বাড়াবে।’
তবে ট্রাম্প প্রশাসন যদি পুতিনের ক্ষেত্রে চাপ ও প্রণোদনা, অর্থাৎ ‘স্টিক অ্যান্ড ক্যারট বা লাঠি ও গাজর’ নীতি অনুসরণ করে থাকে, তাহলে আপাতত গাজরের দিকেই বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। মার্কিন ওই কর্মকর্তা বলেন, প্রশাসন রাশিয়ার প্রভাবশালী মহলের সদস্যদের শান্তির পক্ষে অবস্থান নিতে আরো উৎসাহিত করতে চায়। তার মতে, যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই কিছু ব্যবসায়িক চুক্তি বাস্তবায়ন করা হলে পুতিনের আশপাশের রাশিয়ার সেই কট্টরপন্থী ও আমেরিকাবিরোধী মহলকে বোঝানো সম্ভব হতে পারে যে ট্রাম্প সত্যিই রাশিয়ার সাথে নতুন সম্পর্ক গড়ে তুলতে চান।
ইউক্রেনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাবেক কূটনীতিক এবং বর্তমানে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান আর. পলিটিকের সাথে কাজ করা বালাজস জারাবিক বলেন, বিভিন্ন ইঙ্গিত থেকে মনে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ‘রাশিয়ার দিকে আরো বড় ধরনের ছাড় দেয়ার কথা বিবেচনা করছে।’ আলোচনাটি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা জারাবিক বলেন, ‘ওয়াশিংটন এখন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে মস্কো যদি প্রথমে বাস্তব ও দৃশ্যমান সংযম দেখায়, তাহলে কিছু চুক্তি এগিয়ে নেয়া যেতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘এর আগে যুদ্ধবিরতি হওয়ার আগে এ ধরনের চুক্তি সই করতে ওয়াশিংটন আপত্তি জানিয়ে আসছিল।’
ঠিক কী ধরনের চুক্তি বিবেচনায় রয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। গত ৫ সেপ্টেম্বর পুতিনের সাথে উইটকফ ও কুশনারের বৈঠকের পর ক্রেমলিনের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা ইউরি উশাকভ বলেন, ‘অর্থনৈতিক বিষয় এবং পারস্পরিকভাবে লাভজনক হতে পারে এমন বড় রুশ-আমেরিকান প্রকল্প নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।’