
সৈয়দ সামসুজ্জামান নীপু
দীর্ঘ ১২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা সনাতন পদ্ধতিতে স্ট্যাম্প শুল্ক আদায়ের দিন শেষ হতে চলেছে। আগামীতে এ-চালানের মাধ্যমে শুল্ক আদায় করা হবে। এতে করে একদিকে যেমন সরকারের বিপুল অঙ্কের অর্থ বেঁচে যাবে, অন্যদিকে জাল স্ট্যাম্পের ঝুঁকিও শেষ হয়ে যাবে।
প্রতি বছর স্ট্যাম্প মুদ্রণ ও ভেন্ডরদের কমিশন বাবদ সরকারকে ২৪৪ কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়। তাই আগামীতে সব রকম নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প শুল্ক আবশ্যিকভাবে ‘এ-চালান’ (অটোমেটেড চালান)-এর মাধ্যমে পরিশোধের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি)।
এ বিষয়টি অনুমোদনের জন্য আইআরডি ভারপ্রাপ্ত সচিব আহসান কামাল একটি প্রস্তাব অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদের কাছে পাঠিয়েছেন। তার সম্মতি পাওয়া গেলে সে বিষয়ে আইনগত মতামত (ভেটিং) নেয়ার জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। তারপরে এ বিষয়ে একটি গেজেট প্রকাশ করা হবে। খুব শিগগিরই এটি হবে বলে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।
আইআরডির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ১২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসছে ব্রিটিশ আমলের সনাতনী এই স্ট্যাম্প-পদ্ধতি। ১৮৯৯ সাল থেকে এখনো ইমপ্রেসড ও অ্যাডহেসিভ স্ট্যাম্পের মাধ্যমে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প শুল্ক আদায় করা হচ্ছে। তবে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগ এবং ক্যাশলেস বা স্মার্ট অর্থনীতি গড়ে তোলার অংশ হিসেবে এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও অটোমেটেড করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
সনাতন পদ্ধতির অন্তরায় ও রাজস্ব ক্ষতি
আইআরডির এক সূত্র জানায়, সনাতন পদ্ধতিতে স্ট্যাম্প শুল্ক আদায়ের প্রক্রিয়াটি কেবল অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও জটিলই নয়, বরং এটি সাধারণ নাগরিকদের জন্যও নানা ভোগান্তির কারণ। এর চেয়েও বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, জাল স্ট্যাম্পের রমরমা চক্রের কারণে প্রতি বছর সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। এ ছাড়াও স্ট্যাম্প ছাপানো, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কাগজ আমদানি, দেশজুড়ে সংরক্ষণ এবং নিরাপদ পরিবহনে সরকারের বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়।
অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বিগত মাত্র দুই অর্থবছরে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প মুদ্রণ বাবদ সরকারের কোষাগার থেকে ২১৪ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। পাশাপাশি স্ট্যাম্প বিক্রয় ও বিতরণে ভেন্ডরদের কমিশন হিসেবে দিতে হয়েছে অতিরিক্ত ৩০ কোটি টাকা। স্ট্যাম্প শুল্ক পরিশোধের পুরো প্রক্রিয়াটি অটোমেশন করা হলে একদিকে যেমন কাক্সিক্ষত রাজস্ব আদায় সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে মুদ্রণ, সংরক্ষণ, বিতরণ ও কমিশন বাবদ এই বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ সম্পূর্ণ সাশ্রয় করা সম্ভব হবে।
এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ বাস্তবায়নের পেছনে সুনির্দিষ্ট আইনি ভিত্তি রয়েছে। ‘দ্য স্ট্যাম্প ডিউটিস (অ্যাডিশনাল মোডস অব পেমেন্ট) অ্যাক্ট, ১৯৭৪’-এর ধারা ২(১) অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ দলিল নিবন্ধনের উদ্দেশ্যে প্রদেয় স্ট্যাম্প শুল্ক পরিশোধের আধুনিক পদ্ধতি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নির্ধারণ করার ক্ষমতা রাখে। এ ছাড়া ‘দ্য স্ট্যাম্প অ্যাক্ট, ১৮৯৯’-এর ধারা ১১ক অনুযায়ী বীমা পলিসির ওপর প্রদেয় স্ট্যাম্প শুল্ক পরিশোধ পদ্ধতিও প্রজ্ঞাপন দিয়ে নির্ধারণ করা যায়।
এই আইনি কাঠামোর ক্ষমতাবলে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ সব রকম নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প শুল্ক আবশ্যিকভাবে ‘এ-চালান’-এর মাধ্যমে আদায়ের লক্ষ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ খসড়া প্রজ্ঞাপন প্রস্তুত করেছে। সংশ্লিষ্ট সব অংশীজন ও স্টেকহোল্ডারদের সাথে ধারাবাহিক আলোচনা ও মতামতের ভিত্তিতে প্রজ্ঞাপনটি ইতোমধ্যে হালনাগাদ করা হয়েছে। সচিবালয় নির্দেশমালা, ২০২৪-এর নির্দেশ নম্বর-২৪(২) অনুযায়ী প্রজ্ঞাপন ও আইন প্রণয়নের ধারাবাহিকতায় এটি ভেটিংয়ের জন্য লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগে প্রেরণের সব প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে।
প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে জানা গেছে, ভেটিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর অর্থমন্ত্রীর সানুগ্রহ অনুমোদন সাপেক্ষে দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রজ্ঞাপনটি গেজেট আকারে প্রকাশিত হবে। এর মধ্য দিয়ে দেশের দলিল নিবন্ধন, বীমা পলিসি এবং অন্যান্য আইনি কার্যক্রমে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প শুল্ক পরিশোধের ক্ষেত্রে এক নতুন ডিজিটালাইজড যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে, যা দেশের সার্বিক রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে আরো বেশি স্বচ্ছ ও গতিশীল করবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্ট্যাম্প শুল্ক পরিশোধ পদ্ধতি পুরোপুরি অটোমেশন করা হলে একদিকে যেমন কাক্সিক্ষত রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে স্ট্যাম্প মুদ্রণ, সংরক্ষণ, বিতরণ ও কমিশন বাবদ সরকারের বিপুল অর্থ সাশ্রয় হবে। সবচেয়ে বড় কথা, জাল স্ট্যাম্প বিক্রি পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার ফলে জাতীয় রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।







