জাতিসঙ্ঘ-মানবাধিকার-ওয়াশিংটন-ত্যাগ-ইরান-বেসামরিক
জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার পরিষদের অধিবেশন চলছে। প্রেসটিভি

ইরানের একটি ইংরেজি চ্যানেল দাবি করেছে, জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার পরিষদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরে দাঁড়িয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। জাতিসংঘের একটি তথ্যঅনুসন্ধানী দল ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের জোড়া হামলায় যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হওয়ার ‘যুক্তিসঙ্গত কারণ’ পাওয়ার কথা জানানোর ঠিক পর পরই মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর এই সংস্থায় ওয়াশিংটনের সদস্যপদ ও অংশগ্রহণ বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি অভিযোগ করেছে, সংস্থাটি ‘মার্কিনবিরোধী অবস্থান’ নিচ্ছে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী সরকারগুলোর প্রতি নমনীয় আচরণ করছে। জেনেভায় গত ৭ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া পরিষদের ৬৩তম অধিবেশন চলাকালেই এই ঘোষণা এল।

Advertisement

ইরানের ইংরেজি চ্যানেল প্রেসটিভি (১৮ সেপ্টেম্বর) দাবি করে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের শুরু করা আগ্রাসী যুদ্ধ চলাকালে মার্কিন বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে জাতিসঙ্ঘের একটি স্বাধীন তথ্যঅনুসন্ধানী দল প্রতিবেদন প্রকাশের পরপরই যুক্তরাষ্ট্র এই প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়। জাতিসঙ্ঘ-সমর্থিত তদন্তকারীরা জানান, ইরানে বেসামরিক নাগরিক ও অবকাঠামোর ওপর নির্বিচার দুটি হামলার জন্য মার্কিন বাহিনী দায়ী এবং এগুলো যুদ্ধাপরাধের শামিল।

প্রথম ঘটনাটি ঘটে দক্ষিণাঞ্চলীয় মিনাব শহরের 'শাজারেহ তাইয়্যেবাহ' প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখানে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১২০টি শিশুসহ ১৬০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হন। জাতিসঙ্ঘের তথ্যঅনুসন্ধানী দল জানায়, বিদ্যালয়টি স্পষ্টভাবে একটি বেসামরিক প্রতিষ্ঠান ছিল।  সেখানে কোনো সামরিক কার্যক্রম চালানোর প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিদ্যালয়টিতে শিশুদের গ্রাফিতি ও খেলার স্থান ছিল, যা সহজেই শনাক্তযোগ্য। হামলার আগে এটি কোনো সামরিক লক্ষ্যবস্তু কি না, তা যাচাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে।

মিনাব শহরের 'শাজারেহ তাইয়্যেবাহ' প্রাথমিক বিদ্যালয়

 

দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে ফার্স প্রদেশের লামার্দ শহরে, যেখানে একটি ক্রীড়া কমপ্লেক্স ও পার্শ্ববর্তী আবাসিক এলাকায় নিখুঁত নিশানাযুক্ত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। মাটি ও অবকাঠামো ভেদ করতে সক্ষম হাজার হাজার ক্ষতিকর ধাতব ছররা বা ‘টংস্টেন পেলেট’ ছড়িয়ে দেওয়া এই হামলায় ২২ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। জাতিসঙ্ঘের তদন্তকারীদের মতে, বেসামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সুস্পষ্ট ঝুঁকি জেনেও যুক্তরাষ্ট্র হামলাটি চালিয়েছে, যা কেবল অবহেলা নয়, বরং একটি যুদ্ধাপরাধ।

যুক্তরাষ্ট্র এই তদন্ত প্রতিবেদনকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে। হোয়াইট হাউস ও মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর এই অনুসন্ধানের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড নির্দিষ্ট ওই তারিখে লামার্দে কোনো হামলা চালানোর কথাও অস্বীকার করেছে।

তবে স্বাধীন অস্ত্র বিশেষজ্ঞ, 'এয়ারওয়ার্স' ও গণমাধ্যমের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, হামলাটিতে লখিদ মার্টিনের তৈরি প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল (পিআরএসএম) ব্যবহার করা হয়েছিল, যা ইরানে প্রথমবারের মতো পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করা হয়। একটি মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেও এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। ধ্বংসাবশেষ ও টংস্টেন পেলেটের বিস্তার থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, বেসামরিক জীবন ও যুদ্ধের আইনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের চরম অবহেলার এটি একটি বড় উদাহরণ।

এর আগেও ওয়াশিংটন জাতিসঙ্ঘের একাধিক সংস্থা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে এবং ভবিষ্যতে মানবাধিকার পরিষদে আর যোগ দেবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে।