
আলমগীর কবির. টরেন্টো, কানাডা থেকে
কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যখন বাণিজ্যিক উত্তেজনা বাড়ছে, তখনই শেষের পথে ৫১তম টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। এবারের উৎসবে চলচ্চিত্র নির্মাণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি চলচ্চিত্র শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে আয়োজকদের পদ্ধতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে। কানাডার স্থানীয় সময় রোববার উৎসবের পর্দা নামে। তার আগে এবারের উৎসবের কিছু উল্লেখযোগ্য সাফল্য, ব্যর্থতা এবং এখনো চূড়ান্তভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হয়নি. এমন কিছু বিষয় তুলে ধরা হলো।
টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসবের দর্শকনির্বাচিত পুরস্কার পাওয়ার লড়াই এবার বেশ জমে ওঠে। জেসি আইজেনবার্গের হাস্যরসাত্মক ছবি ‘দ্য ডেব্যু’ দর্শকদের আবেগাপ্লুত করেছে। দুটি উন্মুক্ত প্রদর্শনীতে ছবিটির নির্মাতা নিজেই দর্শকদের প্রশ্নোত্তর পর্ব পরিচালনা করেন এবং ব্যাপক উৎসাহের মুখে পড়েন। অতীতে টরন্টো উৎসবের প্রধান পুরস্কার পাওয়া চলচ্চিত্রগুলোর বেশ কিছু পরে অস্কারের সেরা চলচ্চিত্রের মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনাময় ছবি হিসেবে আলোচনায় এসেছে। পিটার ফ্যারেলির ‘আই প্লে রকি’ও দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। প্রিয় বক্সিং চলচ্চিত্র তৈরির পেছনের গল্প নিয়ে নির্মিত এই আবেগঘন ছবিটির প্রথম প্রদর্শনী ছিল বেশ প্রশংসিত।
হাডসন উইলিয়ামসের উন্মাদনা
দর্শকদের উচ্ছ্বাস এবং তাকে উদ্দেশ করে শোনা ‘আই লাভ ইউ’ চিৎকারের সংখ্যা বিবেচনায় এবারের উৎসবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় থাকা তারকা ছিলেন নিঃসন্দেহে হাডসন উইলিয়ামস। ‘হিটেড রাইভ্যালরি’ দিয়ে আলোচনায় আসা এই অভিনেতাকে ঘিরে কিং স্ট্রিটে বিপুলসংখ্যক ভক্তের সমাগম হয়। তাঁর নতুন টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘ইয়াগা’র প্রদর্শনী ও প্রশ্নোত্তর পর্বের টিকিটও ছিল পূর্ণ।
এক আলোচনা সভায় অভিনেতা আসন গ্রহণের সময় তার জুতার এক ঝলক দেখেই দর্শকদের মধ্যে উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে। খ্যাতি এবং চরিত্রের সাথে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে করা প্রশ্নের সরাসরি উত্তরও দর্শকদের আনন্দ দিয়েছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, হাডসন উইলিয়ামস যে অনুষ্ঠানটির মাধ্যমে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছেন, সেটির প্রচার শুরু হয়েছে মাত্র ১০ মাস আগে।
দর্শকদের উচ্ছ্বাস
টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসবে নিয়মিত যাওয়া দর্শকদের কাছে প্রদর্শনী শুরুর আগে প্রেক্ষাগৃহে দেখানো বিভিন্ন বিজ্ঞাপন ঘিরে দর্শকদের চিৎকার, উল্লাস ও নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া পরিচিত দৃশ্য। এবার সেই অংশগ্রহণ আরো বেশি দেখা গেছে। প্রসাধনী প্রতিষ্ঠান লরিয়েল এবং উৎসবের ভিআইপি বিশ্রামকেন্দ্র ভার্দার পুরোনো বিজ্ঞাপন নিয়ে দর্শকদের উচ্ছ্বাস এবার দেখা না গেলেও চলচ্চিত্র পাইরেসি বা অবৈধভাবে কপি করার বিরুদ্ধে প্রচারিত বার্তাটি দেখানোর সময় আগের চেয়ে বেশি জোরে দর্শকদের প্রতিক্রিয়া শোনা গেছে। প্রজেকশন প্রতিষ্ঠানের প্রতীক পর্দায় ভেসে উঠলে ‘উই লাভ ইউ, ক্রিস্টি’ বলে দর্শকদের সম্মিলিত চিৎকারও ছিল উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া ‘স্যাটারডে নাইট লাইভ’-এর অভিনেত্রী ভেরোনিকা স্লোইকোভস্কাকে নিয়ে তৈরি একটি স্বেচ্ছাসেবী বিজ্ঞাপনেও দর্শকদের কাছ থেকে ব্যাপক করতালি পাওয়া যায়।
রাজনীতিকদের উপস্থিতি
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্যিক উত্তেজনা বাড়ার প্রেক্ষাপটে কানাডায় দেশপ্রেমের আবেগও বেড়েছে। তাই টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের সম্মাননা অনুষ্ঠানের আগে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি যখন ফেয়ারমন্ট রয়্যাল ইয়র্ক হোটেলের সামনে লালগালিচায় হাজির হন, তখন সেখানে অপেক্ষমাণ সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ব্যাপক উচ্ছ্বাস পান। এই উচ্ছ্বাস ছিল সম্মাননা পাওয়া অভিনেতা ও কৌতুকশিল্পী শেঠ রোজেনের জন্য পাওয়া অভ্যর্থনার চেয়েও বেশি।
এদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোও উৎসবকে ব্যবহার করেছেন তাঁর নতুন বিনোদন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘হোপ অ্যান্ড হার্ড ওয়ার্ক’-এর যাত্রা শুরুর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে। দীর্ঘদিনের চিফ অব স্টাফ কেটি টেলফোর্ডকে সাথে নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করবেন তিনি। প্রতিষ্ঠানটি এরই মধ্যে কয়েকটি নির্মাণাধীন প্রকল্পের ঘোষণা দিয়েছে। এর মধ্যে রাজনীতি ও গণমাধ্যমের উচ্চঝুঁকিপূর্ণ জগতকে পটভূমি করে নির্মিত একটি প্রেমের হাস্যরসাত্মক ছবিও রয়েছে।
সিনেমার ভাণ্ডার
চলচ্চিত্রপ্রেমীদের জন্য আরেকটি আকর্ষণ ছিল ‘সিনেমা সেলার’। ক্রাইটেরিয়ানের সাথে অংশীদারত্বে পরিচালিত এই বিশেষ চলচ্চিত্রের দোকানে প্রতিদিনই দীর্ঘ সারি দেখা গেছে।
পুরনো ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের বিশাল সংগ্রহের জন্য চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে ক্রাইটেরিয়ান বেশ জনপ্রিয়। গত বছর টরন্টো উৎসব চলাকালে এই প্রতিষ্ঠানটি একটি ট্রাকের মধ্যে তাদের বিখ্যাত ‘ক্রাইটেরিয়ান ক্লোজেট’-এর আদলে একটি আয়োজন করেছিল। দর্শকদের সেখানে মাত্র তিন মিনিট সময় দেয়া হয়েছিল এবং সেই সময়ের মধ্যে পছন্দের চলচ্চিত্রের ডিভিডি বেছে নেওয়ার সুযোগ ছিল।
টিকিটের দাম
উৎসব শুরুর আগেই টিকিটের বেশি দাম নিয়ে দর্শকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়।
সদস্যদের জন্য আগাম টিকিট বিক্রিতে অংশ নেওয়া দর্শকদের কেউ কেউ জানান, অভিনয়শিল্পী বা পরিচালকের প্রশ্নোত্তর পর্বসহ বিশেষ প্রদর্শনীর টিকিটের দাম ১২৮ কানাডীয় ডলারেরও বেশি রাখা হয়েছিল। এমনকি পুনর্বিক্রয়কারী বিভিন্ন ওয়েবসাইটে কিছু টিকিটের দাম নির্ধারিত মূল্যের কয়েক গুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়।
টরন্টোর যানজট
টরন্টোর বাসিন্দাদের কাছে যানজট নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে এবারের উৎসবে তারকা অতিথিরাও এর স্বাদ পেয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ফেয়ারমন্ট রয়্যাল ইয়র্ক হোটেলের সামনে অভিনেতা শেঠ রোজেন নিরাপত্তাকর্মীদের কাছে জানতে চাইছেন, তিনি যে গাড়িতে আছেন সেটিকে নির্দিষ্ট প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে সরাসরি প্রবেশের অনুমতি দেয়া যায় কি না। ঘুরে যেতে তাঁর প্রায় ২৫ মিনিট সময় লাগতে পারে বলে তিনি জানান। অন্যদিকে অপরাধভিত্তিক রোমাঞ্চকর চলচ্চিত্র ‘ভিনটেজ ভায়োলেন্স’-এর প্রচারে টরন্টোয় আসা অভিনেতা কোল স্প্রাউস জানান, তিনি শহরে গণপরিবহন ব্যবহার করেছেন এবং এই ব্যবস্থার প্রশংসাও করেন।
‘ইঙ্ক’ ছবিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার
পরিচালক ড্যানি বয়েলের নতুন ট্যাবলয়েড সাংবাদিকতাভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘ইঙ্ক’-এ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়।
ছবির একটি অংশে পুরনো আলোকচিত্রগুলোকে নড়াচড়া করাতে এবং অন্য একটি দৃশ্যে ইঁদুর যুক্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হয়েছে। ছবির প্রদর্শনীর পর প্রশ্নোত্তর পর্বে পরিচালক যখন প্রযুক্তিটির দায়িত্বশীল ব্যবহারের পক্ষে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন, তখন দর্শকদের একাংশ তাকে উদ্দেশ করে বিরূপ প্রতিক্রিয়া জানায়।
প্রিন্সেস অব ওয়েলস থিয়েটারের বাইরে ছবিটির বিজ্ঞাপন দেয়া একটি বিলবোর্ডেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আপত্তিসূচক স্টিকার দেখা যায়।
প্রেক্ষাগৃহে দর্শকের আচরণ
দর্শকদের আচরণ নিয়েও এবারের উৎসবে অসন্তোষ ছিল। বারবার মুঠোফোন ও হাতঘড়ির পর্দা দেখা, খাবারের প্যাকেটের শব্দ করা-এসব নিয়ে দর্শকদের অভিযোগ ছিল। প্রেক্ষাগৃহের সারিতে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়েছেন। কেউ জানিয়েছেন, পাশের আসনে বসা দর্শক সিনেমা চলার সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেছেন। কেউ আবার সিনেমাজুড়ে পর্দার ঘটনা নিয়ে মন্তব্য করেছেন। এমনকি সামনের আসনে লাথি মারা কিংবা বারবার কাশি দেয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ করেছেন দর্শকরা।
দর্শক ও সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকার
চলচ্চিত্রভিত্তিক সংবাদ সম্মেলন না করা এবং অনেক প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের প্রচারমূলক সাক্ষাৎকার কমিয়ে দেওয়ার কারণে এবারের উৎসবে বড় তারকাদের কাছ থেকে সরাসরি কথা শোনার সুযোগও তুলনামূলক কম ছিল।
অভিনেত্রী আনা কেনড্রিক, রুনি ও কেট মারা এবং নাওমি ওয়াটস অবশ্য সংবাদমাধ্যমকে যথেষ্ট সময় দিয়েছেন। ‘দ্য অনলি লিভিং পিকপকেট ইন নিউ ইয়র্ক’ ছবির অভিনেতা জন টারটুরো লালগালিচায়ও চরিত্রের আবহ ধরে রেখেছিলেন। তিনি মজা করে সংবাদকর্মীদের মুঠোফোন নেওয়ার অভিনয় করেন।
অন্যদিকে ‘দ্য ডেব্যু’ ছবির পরিচালক জেসি আইজেনবার্গ নিজেই দর্শকদের প্রশ্নোত্তর পর্ব পরিচালনা করেন, কারণ দ্বিতীয় প্রদর্শনীতে টরন্টো উৎসবের নির্ধারিত সঞ্চালক দেরিতে উপস্থিত হন।
এখনো মূল্যায়নের অপেক্ষায়
এবারই প্রথম টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসব আনুষ্ঠানিকভাবে একটি চলচ্চিত্র বাজার চালু করেছে। এর উদ্দেশ্য ছিল নির্মাতাদের প্রকল্পের জন্য পরিবেশক খুঁজে দেওয়া, অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করা এবং উৎসবের দীর্ঘদিনের অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যিক কার্যক্রমকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা। তবে চলচ্চিত্র বিক্রি ও অর্থায়নের পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। ফলে এবারের বাজার কতটা সফল হয়েছে, তা এখনই চূড়ান্তভাবে বলা কঠিন। চলচ্চিত্র উৎসবের মুখপাত্র নিকোল ক্রাইসোস্টম-মারে শুক্রবার এক ই-মেইলে জানান, বাজারের মাধ্যমে ঠিক কতটি চুক্তি হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো তাদের হাতে নেই। তবে তিনি জানান, বাজারের মাধ্যমে ২৮টি আসন্ন চলচ্চিত্রের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে হ্যালি বেরি, জোয়ে ক্রাভিটজ ও কলিন ফার্থ অভিনীত একটি প্রেমের হাস্যরসাত্মক ছবি রয়েছে। মাইলস টেলার ও জেসন মোমোয়া অভিনীত একটি অপরাধভিত্তিক রোমাঞ্চকর চলচ্চিত্রও রয়েছে। এ ছাড়া টম হ্যাঙ্কসের কণ্ঠে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের চরিত্র সম্বলিত একটি অ্যানিমেশন ও বাস্তব অভিনয়ের সমন্বিত চলচ্চিত্রও রয়েছে। টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসবের তথ্য অনুযায়ী, এবারের চলচ্চিত্র বাজারে ৭ হাজার ১০ জনের বেশি প্রতিনিধি অংশ নিয়েছেন। সাধারণত উৎসবে প্রায় ৫ হাজার শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অংশ নেন।







