
আমরা ভাত খাই, ভাতের সাথে মাছ খাই। এই দুই মিলে ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’। এই প্রবাদের সাথে জড়িয়ে আছে নদী-নালা, হাওর আর বিলের মতো জলাশয়ের সংস্কৃতি। আমরা এখনো মাছ খাই; কিন্তু সেই মাছগুলোতে আগের মতো স্বাদ থাকে না। দেখা পাওয়া যায় না ‘গুতুম’ মাছের। টেংরা, মলা, ঢেলার স্বাদ আগের মতো নেই। কারণ এসব মাছও এখন চাষ হচ্ছে। চাষের মাছের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্য দেখিয়েছে বাংলাদেশ; কিন্তু ঐতিহ্যবাহী দেশী মাছ হারিয়ে যাচ্ছে।
আশার কথা হলো, দেশী মাছের উৎপাদন বাড়াতে ইতোমধ্যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। মাছের অভয়াশ্রম তৈরি করা হচ্ছে বলে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) বার্ষিক গবেষণা অগ্রগতি পর্যালোচনা কর্মশালায় জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। সরকারের এই উদ্যোগ সময়োপযোগী।
আমাদের মুক্ত জলাশয়গুলো দেশী মাছের প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র; কিন্তু নানা করণে এই ক্ষেত্রগুলো ভারসাম্য হারাচ্ছে। মৎস্য বিভাগের তথ্য বলছে, জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাব, কারেন্ট জালের অবাধ ব্যবহার, ফসলের জমিতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিকের প্রয়োগ, জলাশয় ভরাট, নদীর নাব্য কমে যাওয়া এবং মা মাছ ও ডিমওয়ালা মাছ নির্বিচারে নিধন দেশী প্রজাতির মাছ হারিয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ। মাছের বড় একটা উৎস হাওর। হাওরের লিজ নেয়া বিলগুলোতে শুকনা মৌসুমে সব পানি সেচে মাছ তুলে ফেলা হয়। মাছ ধরার আগে বিলের পানিতে ক্ষতিকর বিষ দেয়া হয়। এই বিষে মাছগুলো দুর্বল হয়ে পানির ওপর ভেসে ওঠে। এতে মাছ ধরার কাজ সহজ হয়; কিন্তু এই বিষে জলজ ইকোসিস্টেমের মারাত্মক ক্ষতি হয়। ধ্বংস হয়ে যায় জলজ উদ্ভিদের বীজ, মাছের খাবার। সেই সাথে মাছের ডিমগুলোও নষ্ট হয়। এসব কারণে মাছের অভয়ারণ্য হাওরেও এখন মাছ পাওয়া যায় না।
দেশী মাছ বাড়ানোর জন্য অভয়াশ্রম নিরাপদ করতে হবে। অভয়াশ্রম ছাড়া কৃত্রিম চাষে উৎপাদন বাড়ানো যেতে পারে; কিন্তু সেই মাছে আসল স্বাদ থাকবে না। দেশী মাছের অভয়াশ্রম তৈরি এবং গবেষণা জোরদার করতে সরকারের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তবে এই সঙ্কট উত্তরণে কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।
অভয়াশ্রম রক্ষা ও মুক্ত জলাশয়গুলোর লিজনীতিতে সংস্কার আনতে হবে। শুষ্ক মৌসুমে বিল সেচে মাছ ধরা এবং বিষ প্রয়োগের মতো ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। কৃষিজমিতে কীটনাশকের ব্যবহার কমাতে হবে। সেই সাথে কলকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য নদীতে ফেলা বন্ধ করতে হবে।
ক্ষতিকর কারেন্ট জালের ব্যবহার বন্ধে জেলে ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। জলাশয়গুলোতে মাছ মরে ভেসে ওঠার প্রকৃত কারণ বের করে আনতে হবে। অ্যামোনিয়া গ্যাস বা অন্য কোনো দূষণের কারণে এটা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা চালাতে হবে।
চাষের মাছ দিয়ে আমরা হয়তো প্রোটিনের ঘাটতি মেটাতে পারছি; কিন্তু স্বাদ ও ঐতিহ্যের শূন্যতা তা দিয়ে পূরণ সম্ভব নয়। হারিয়ে যাওয়া দেশীয় মাছ আবার জলাশয়ে ফিরিয়ে আনতে একযোগে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা নিতে হবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








