বিসিবি
আসিফ নজরুলের সিদ্ধান্তেই বিশ্বকাপে যায়নি বাংলাদেশ ছবি: প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশের গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল—তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এমন তথ্যই উঠে এসেছে। ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে বিসিবিকে পাঠানো চিঠির ভিত্তিতেই বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ। বিসিবিও সেই সিদ্ধান্তের সাথে দ্বিমত করেনি।

গত মার্চে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি কয়েক মাস তদন্ত শেষে মঙ্গলবার ২২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. এ কে এম ওলি উল্যার নেতৃত্বাধীন কমিটির অন্য দুই সদস্য ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর ও সাবেক জাতীয় অধিনায়ক এবং জাতীয় দলের বর্তমান প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার।

প্রতিবেদনে সরকারের সিদ্ধান্ত এবং আসিফ নজরুলের ভূমিকার কথা বলা হলেও সংবাদ সম্মেলনে শুরুতে সরাসরি কারো নাম বলতে চাইছিলেন না তদন্ত কমিটির সদস্যরা। পরে সাংবাদিকদের একের পর এক প্রশ্নের মুখে ব্যারিস্টার ফয়সাল বলেন-

‘তদন্তে যা উঠে এসেছে, সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে, সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন ও সবকিছু মিলিয়ে যা বলা যায়, যে মানুষটি দায়ী (বিশ্বকাপে না যাওয়ার জন্য), তিনি হলেন তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া উপেদষ্টা আসিফ নজরুল। সেই সময়ের সরকার ও তিনি দায়ী।’

তিনি জানান, ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকেই বিসিবিকে চিঠি পাঠিয়ে তাদের সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছিল। বিসিবি সেই সিদ্ধান্তের সাথে দ্বিমত করেনি। বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশ নেয়া উচিত ছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তদন্ত কমিটির প্রতিনিধি হিসেবে ফয়সাল বলেন, ‘বাংলাদেশের অবশ্যই বিশ্বকাপে খেলতে যাওয়া উচিত ছিল।’

২২ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনে ১২ জনের সাক্ষাৎকার নেয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মাঝে ছিলেন বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক লিটন কুমার দাস, টেস্ট অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত, সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমান বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল খান, বোর্ডের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল হক, বিসিবির প্রধান নির্বাহী নিজাম উদ্দিন চৌধুরী, জাতীয় দলের কোচ ও ওই সময়ের সিনিয়র সহকারী কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন এবং তৎকালীন বিসিবি পরিচালক ও ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের প্রধান নাজমূল আবেদীন।

এ ছাড়া যুব ও ক্রীড়া সচিব মো: মাহবুব-উল-আলমের সাথেও কথা বলে তদন্ত কমিটি। সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি হিসেবে সাক্ষাৎকার নেয়া হয় বাংলাদেশ স্পোর্টস জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আরিফুর রহমান বাবু, সাধারণ সম্পাদক এস এম সুমন এবং বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রেজোয়ান উজ জামান ও সাধারণ সম্পাদক সুদীপ্ত আহমেদের।

তবে পুরো ঘটনার কেন্দ্রে থাকা তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ও বিসিবির তৎকালীন সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলের বক্তব্য নিতে পারেনি তদন্ত কমিটি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন মাধ্যমে তাদের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

তদন্ত প্রতিবেদনে যুব ও ক্রীড়া সচিব মাহবুব-উল-আলমের বক্তব্যকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, ‘যুব ও ক্রীড়া সচিবকে সংবাদ সম্মেলনে যোগ দেয়ার জন্য ডাকার পর আসিফ নজরুল নিজেই তার সিদ্ধান্ত জানান। এর আগে ক্রীড়া সচিব পরামর্শ দিয়েছিলেন, বিসিবির সাথে যোগাযোগ করা উচিত, যেহেতু বিসিবি একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান।’

‘তবে সাবেক বিসিবি সভাপতি বুলবুল প্রবল চাপে ছিলেন, যেহেতু তিনি আসিফ নজরুলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কিছু বলতে পারছিলেন না। বিসিবির সহ-সভাপতি ও সাবেক সভাপতি ফারুক আহমেদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি মতামত দেন, বিশ্বকাপে খেলতে যাওয়া উচিত।’

তৎকালীন বিসিবি পরিচালক ও ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের প্রধান নাজমূল আবেদীনও তদন্ত কমিটির কাছে ক্রিকেটারদের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘ক্রিকেটারদের বিশ্বকাপে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল। তবে সরকার যদি এরকম সিদ্ধান্ত নেয়, ক্রিকেট বোর্ড সেই সিদ্ধান্ত মানতে বাধ্য।’

আসিফ নজরুলের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব না হওয়ায় সে সময় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তার বিভিন্ন বক্তব্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া পোস্টও তদন্তের অংশ হিসেবে বিবেচনায় নেয় কমিটি।

তদন্তে বিশ্বকাপে না যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণের কথা উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে ক্রিকেটে রাজনীতির প্রবেশ, আইসিসি ও বিসিবির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা এবং বিসিবির অব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলোও পর্যবেক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশের ক্রিকেটে ওই সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের কথাও তুলে ধরা হয়েছে।

বিশ্বকাপে না খেলার কারণের চূড়ান্ত মূল্যায়নে তদন্ত কমিটি বলেছে, ‘রাজনৈতিক উত্তেজনা, নিরাপত্তা নিয়ে মতবিরোধ, আইসিসির গভর্ন্যান্স সঙ্ঘাত, প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা এবং ব্যর্থ আলোচনা।’

সম্ভাব্য মূল কারণগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনৈতিক টানাপোড়েন, ভেন্যু পরিবর্তনে আইসিসির অপারগতা এবং বাংলাদেশ সরকারের হস্তক্ষেপকে ‘অতি উচ্চ’ গুরুত্বের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিসিবির কূটনৈতিক দক্ষতার ব্যর্থতাকে ‘উচ্চ’ এবং যোগাযোগ ভেঙে পড়াকে ‘মাঝারি’ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনের পরিসমাপ্তিতে ক্রিকেটার ও সমর্থকদের ভোগান্তির বিষয়টিও বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ছিল, ক্রিকেটাররা এবং সমর্থকেরাই সবচেয়ে বেশি ভুগেছেন।’ তামিম ইকবালের বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘সমাধান বের করার জায়গা ছিল।’

তদন্ত কমিটির মতে, ক্রিকেটারদের ভবিষ্যৎ ও বাংলাদেশের কোটি ক্রিকেটপ্রেমীর কথা বিবেচনায় রেখে এ ধরনের সিদ্ধান্ত কখনো একজনের একক সিদ্ধান্তে নেয়া উচিত নয়। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সাথে আলোচনা করেই এমন সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন।

ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে বেশ কিছু সুপারিশও করেছে তদন্ত কমিটি। এর মধ্যে রয়েছে ক্রিকেটকে রাজনীতির বাইরে রাখা, বিসিবির স্বাধীনতা আরো শক্তিশালী করা, সঙ্কটকালীন যোগাযোগের দক্ষতা বাড়ানো, ক্রিকেটারদের কল্যাণ ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেয়া এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান সুরক্ষিত রাখা।

এ ছাড়া বিসিবি, ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি জাতীয় ক্রীড়া কূটনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি।