জামিন
নূরুল আমীনকে ফুল দিয়ে বরণ করে নিচ্ছেন নেতা-কর্মীরা। নয়া দিগন্ত

আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত টঙ্গীর শ্রমিক নেতা নূরুল আমীন দীর্ঘ ২১ বছর আট মাস কারাভোগের পর মুক্তি পেয়েছেন। 

Advertisement

মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) দুপুর ১২টার দিকে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তিনি মুক্তি পান। কারাফটকে বের হওয়ার পর বিপুলসংখ্যক সমর্থক, স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষী তাকে ফুলের মালা পরিয়ে বরণ করে নেন।

নূরুল আমীনের মুক্তির খবরে সকাল থেকেই কাশিমপুর কারাগারের প্রধান ফটক ও টঙ্গীতে তার নিজ বাসভবনের সামনে ভিড় জমতে থাকে। দীর্ঘ কারাজীবনের পর প্রিয়জনদের মাঝে ফিরে আসার মুহূর্তটি ছিল তার পরিবার ও অনুসারীদের জন্য আবেগঘন।

কারা সূত্র ও সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, জেল কোডের ৫৬৯ ধারায় বন্দিমুক্তির বিধানের আওতায় নূরুল আমীন মুক্তি পেয়েছেন। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মেয়াদ সাধারণত ৩০ বছর হলেও কারাবিধি অনুযায়ী তিনি সাড়ে সাত বছরের রেয়াদ (রেমিশন) সুবিধা পেয়েছেন। একই মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত মোহাম্মদ আলীর মুক্তির প্রক্রিয়াও চলছে। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষ হলে বুধবার তিনি মুক্তি পেতে পারেন বলে কারা সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

২২ বছরের মামলা, এখনো শেষ হয়নি রায়
নূরুল আমীনের মুক্তির মধ্যেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে প্রায় ২২ বছর ধরে চলা আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলা। ২০০৪ সালের ৭ মে টঙ্গীর নোয়াগাঁও এম এ মজিদ মিয়া উচ্চবিদ্যালয় মাঠে সমাবেশে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় আওয়ামী লীগ নেতা, সাবেক সংসদ সদস্য ও শ্রমিক নেতা আহসান উল্লাহ মাস্টারকে।

২০০৫ সালের ১৬ এপ্রিল দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের রায়ে বিএনপি নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরুল ইসলাম সরকারসহ ২২ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। ২০১৬ সালে হাইকোর্ট ছয়জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন, দু’জনের যাবজ্জীবন বহাল রাখেন, সাতজনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন করেন এবং ১১ জনকে খালাস দেন। নূরুল আমীনের যাবজ্জীবনও বহাল ছিল।

এরপর আসামিরা আপিল করেন। চলতি বছরের ৭ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগে চূড়ান্ত শুনানি শেষ হয়েছে এবং মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে। ফলে নূরুল আমীনের মুক্তির পরও মামলাটির আইনি নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।

রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার
নূরুল আমীনের ভাতিজা ও টঙ্গী থানা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি মো: আইয়ুব আলী অভিযোগ করেন, আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত বিচারকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিতর্কিত করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘এই হত্যাকাণ্ড আওয়ামী লীগের দলীয় কোন্দলের জের হলেও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে যুবদলের তৎকালীন জনপ্রিয় কেন্দ্রীয় নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরুল ইসলাম সরকারসহ বিএনপি পরিবারের কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছিল। আমিও এই মামলায় ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে দীর্ঘদিন জেল খেটে হাইকোর্টের আপিলের রায়ে মুক্তি পেয়েছি।’

তার দাবি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে জনপ্রিয় কয়েকজন নেতাকে মামলায় জড়িয়ে দেয়ায় প্রকৃত অপরাধীরা আড়ালে থেকে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে। তিনি আশা করেন, আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়ে প্রকৃত সত্য সামনে আসবে।

টঙ্গীর রাজনৈতিক মহলে এ নিয়ে দু’টি প্রশ্নও সামনে এসেছে— আহসান উল্লাহ মাস্টারের মতো জনপ্রিয় নেতার হত্যার প্রকৃত অপরাধীরা কি বিচারের আওতায় এসেছে, নাকি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে মামলাটি অন্যদিকে মোড় নিয়েছিল? অন্যদিকে এ মামলায় মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা নূরুল ইসলাম সরকার ও নূরুল ইসলাম দীপুর মতো নেতাদের দীর্ঘ কারাভোগ ও দেশান্তরের দায়ও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

নূরুল ইসলাম সরকারকে দীর্ঘ ২২ বছর ফাঁসির সেলে রেখে জনগণের সেবা থেকে দূরে রাখা হয়েছে বলে তার সমর্থকদের অভিযোগ। জাতীয় ছাত্র সমাজের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম দীপুকেও এ মামলায় জড়িয়ে দেশছাড়া করা এবং তার ব্যবসা-বাণিজ্য ও সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগ রয়েছে তাদের।

নূরুল আমীন বৃহত্তর টঙ্গী থানা যুবদলের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি এবং টঙ্গীর ন্যাশনাল ফ্যান ফ্যাক্টরির সিবিএর সাবেক সভাপতি। দীর্ঘ দুই যুগের কাছাকাছি সময় কারাগারে কাটিয়ে মুক্তির পর তাকে ঘিরে টঙ্গীর রাজনৈতিক অঙ্গনে তাই নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।