তত্ত্বাবধায়ক সরকার, জুলাই সনদ, সংবিধান
জুলাই সনদ। ইন্টারনেট

 

Advertisement

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মোটামুটি ঐকমত্য তৈরি হলেও নির্বাচনকালীন সরকার কিভাবে গঠিত হবে এবং প্রধান উপদেষ্টা কে ও কিভাবে নির্বাচিত হবেন- এ নিয়ে এখনো কাটেনি জটিলতা। জুলাই জাতীয় সনদে এ জন্য পাঁচ সদস্যের বাছাই কমিটি থেকে শুরু করে ৫ + ৫ + ২ পদ্ধতি, বিচার বিভাগের দুই প্রতিনিধি যুক্ত করা এবং সাত সদস্যের কমিটিতে গোপন ব্যালটে ‘র‌্যাংকড চয়েস’ ভোটের যে কাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছে, তার একাধিক ধাপ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমত রয়েছে। বিশেষ করে বিচার বিভাগের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্তি, প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনে র‌্যাংকড চয়েস পদ্ধতি এবং পদ শূন্য হলে উত্তরসূরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া নিয়ে রয়েছে নোট অব ডিসেন্ট। ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থায় নীতিগত ঐকমত্য এলেও সেটিকে কার্যকর সাংবিধানিক কাঠামোয় রূপ দেয়াই এখন বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। 
এমন প্রেক্ষাপটে গত রোববার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটির পঞ্চম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অবদান রাখা শ্রমজীবী মানুষ এবং ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা সংবিধান সংশোধন নিয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব দেন। বৈঠকে উত্থাপিত এবং লিখিতভাবে পাঠানো প্রস্তাবগুলো কমিটির প্রস্তুত করা প্রতিবেদনে উল্লেখ থাকবে বলে জানিয়েছে কমিটি। 
গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির ষষ্ঠ বৈঠকে সংবিধান সংশোধন কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা এমনভাবে সংবিধানে প্রতিস্থাপন করা হবে, ভবিষ্যতে এটি পরিবর্তন করতে হলেও জনগণের মতামত নিতে গণভোটের প্রয়োজন হবে। তিনি জানান, রাষ্ট্রপতি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হতে পারবেন না- এ বিষয়ে কমিটির মতামত রয়েছে। 
বিরোধী দল ছাড়াই সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ 
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি। তবে কমিটির সাথে মতবিনিময় ও সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো অংশ নেয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গতকালসহ মোট পাঁচটি বৈঠক করেছে। এই কমিটিতে জামায়াতসহ বিরোধী দলের পাঁচজনের প্রতিনিধি চাওয়া হলেও তা সরাসরি নাকচ করে দেয়া হয়। সংবিধান সংশোধন নয়, সংবিধান সংস্কার পরিষদ চায় বিরোধী দল। এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই এগিয়ে যাচ্ছে সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটির কার্যক্রম। এমনকি বিশেষ কমিটির বৈঠকে রাজনৈতিক দলগুলোকে আমন্ত্রণ জানালেও জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং তাদের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের শরিক দলগুলো মতবিনিময় সভায় অংশ নেয়নি। ফলে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রণীত জুলাই সনদ কিভাবে সংসদীয় ও সাংবিধানিক কাঠামোয় বাস্তবায়িত হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। 
সূত্র জানায়, বিশেষ কমিটি আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের মতামত নেয়া অব্যাহত থাকবে। পরবর্তী বৈঠকগুলোতে সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার প্রতিনিধি, নারী নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তি ও সংগঠন, জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের সাথে যুক্ত ব্যক্তি, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক ও আইনজীবী, শিক্ষক, শ্রমজীবী মানুষসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ জানানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।  
পাঁচ সদস্যের বাছাই কমিটি 
জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী, সংসদের স্বাভাবিক মেয়াদ শেষ হওয়ার ৩০ দিন আগে স্পিকারের তত্ত্বাবধানে সংসদ সচিবালয়ের ব্যবস্থাপনায় পাঁচ সদস্যের বাছাই কমিটি গঠন হবে। এতে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, স্পিকার, বিরোধী দলের ডেপুটি স্পিকার এবং সংসদের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের একজন প্রতিনিধি। একাধিক দলের আসনসংখ্যা সমান হলে নির্বাচনে সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া দলকে দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দল হিসেবে বিবেচনার প্রস্তাব রয়েছে। স্পিকার কমিটির বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন। 
কমিটি গঠনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের কাছ থেকে প্রধান উপদেষ্টা পদের যোগ্য ব্যক্তির নাম চাওয়া হবে। প্রতিটি দল বা স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য একটি করে নাম দিতে পারবেন। একই সাথে কমিটি নিজ উদ্যোগেও যোগ্য ব্যক্তিদের নাম অনুসন্ধান করতে পারবে। এ পর্যায়ে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। তাদের প্রস্তাব, ‘নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলসমূহ’ কথাটি বাদ দিতে হবে। 
প্রথম ধাপে ১২০ ঘণ্টায় সিদ্ধান্ত  
রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সংসদ সচিবালয়ে নাম জমা দেবেন। এরপর ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বাছাই কমিটি প্রস্তাবিত ও নিজস্ব অনুসন্ধানে পাওয়া নাম থেকে একজনকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে বেছে নেবে। নির্বাচিত ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেবেন; অর্থাৎ বাছাই কমিটি গঠনের পর নাম প্রস্তাব, যাচাই-বাছাই ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে মোট ১২০ ঘণ্টার সময় নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। 
ব্যর্থ হলে ৫ + ৫ + ২  
১২০ ঘণ্টার মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন সম্ভব না হলে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টায় সরকারি দল বা জোট পাঁচজন, প্রধান বিরোধী দল বা জোট পাঁচজন এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দল দু’জনের নাম প্রস্তাব করবে। মোট ১২ জনের তালিকা স্পিকার জনসাধারণের অবগতির জন্য প্রকাশ করবেন। 
এরপর সরকারি দলের পাঁচজনের তালিকা থেকে প্রধান বিরোধী দল একজন এবং প্রধান বিরোধী দলের পাঁচজনের তালিকা থেকে সরকারি দল একজনকে বেছে নেবে। দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের দু’জনের তালিকা থেকেও সরকারি দল ও প্রধান বিরোধী দল একজন করে বেছে নেবে। 
এভাবে পাওয়া নামগুলোর মধ্যে কোনো একজনকে নিয়ে সংশ্লিষ্ট দলগুলোর ঐকমত্য হলে তাকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মনোনীত করা হবে। ঐকমত্য না হলে পাঁচ সদস্যের বাছাই কমিটির অন্তত চারজন কোনো একজনের পক্ষে একমত হলে তাকেই মনোনীত করার বিধান রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোট ঐকমত্য পোষণ করেছে। 
বিচার বিভাগের দুই প্রতিনিধি 
এ পর্যায়েও সিদ্ধান্ত না হলে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় বাছাই কমিটিতে বিচার বিভাগের দুই প্রতিনিধি যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। একজন হবেন আপিল বিভাগের বিচারপতি এবং অন্যজন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি। তাদের মনোনয়নের জন্য সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি, কর্মরত প্রধান বিচারপতি ও আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতিকে নিয়ে তিন সদস্যের কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিচার বিভাগের প্রতিনিধিরা প্রধান উপদেষ্টা পদের জন্য কোনো নাম প্রস্তাব করতে পারবেন না। 
এই ধাপে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ ২৩টি দল একমত হয়েছে। তবে বিএনপিসহ সাতটি দল নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। 
সাত সদস্যের কমিটিতে র‌্যাংকড চয়েস 
বিচার বিভাগের দুই প্রতিনিধি যুক্ত হলে বাছাই কমিটির সদস্যসংখ্যা দাঁড়াবে সাত। এই কমিটি স্পিকারের তত্ত্বাবধানে গোপন ব্যালটে ‘র‌্যাংকড চয়েস’ বা ক্রমভিত্তিক ভোটিং পদ্ধতিতে প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন করবে। সময় থাকবে ২৪ ঘণ্টা। 
এ প্রস্তাবেও জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ ২৩টি দল একমত হয়েছে। বিএনপিসহ সাতটি দল নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। তাদের প্রস্তাব, এ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত জাতীয় সংসদের মাধ্যমে নির্ধারণ করা উচিত। 
নিয়োগ ও উত্তরসূরি নির্ধারণ 
যেকোনো পদ্ধতিতে প্রধান উপদেষ্টা মনোনীত হওয়ার পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রাষ্ট্রপতি তাকে ৯০ দিনের জন্য নিয়োগ দেবেন। তবে সংসদ বহাল থাকাবস্থায় তিনি শপথ নিতে পারবেন না। কোনো পদ্ধতিতেই প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন সম্ভব না হলে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুসরণের প্রস্তাব রয়েছে। তবে রাষ্ট্রপতিকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে বেছে নেয়া যাবে না। 
কোনো কারণে প্রধান উপদেষ্টার পদ শূন্য হলে র‌্যাংকড চয়েস ভোটে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা জ্যেষ্ঠতম ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেয়ার প্রস্তাব রয়েছে। তিনি অপারগ হলে পরবর্তী ব্যক্তি দায়িত্ব পাবেন এবং উপদেষ্টা পরিষদ বহাল থাকবে। এ প্রস্তাবে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ ২৪টি দল একমত হলেও বিএনপিসহ ছয়টি দল নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। তাদের প্রস্তাব, এ পর্যায়ের সিদ্ধান্তও জাতীয় সংসদের মাধ্যমে নির্ধারণ করা। 
সর্বোচ্চ ১৫ উপদেষ্টা, মেয়াদ ৯০ দিন  
প্রধান উপদেষ্টার পরামর্শ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি অনধিক ১৫ জন উপদেষ্টা নিয়োগ করবেন। প্রধান উপদেষ্টা প্রধানমন্ত্রীর এবং অন্যান্য উপদেষ্টা মন্ত্রীর পদমর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন। উপদেষ্টা হওয়ার সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৭২ থেকে বাড়িয়ে ৭৫ বছর করার প্রস্তাবও রয়েছে। 
সংসদের স্বাভাবিক মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সংসদ ভেঙে গেলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিলুপ্ত সংসদের অনুরূপ প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে বাছাই কমিটি গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ১৪ দিন বা ৩৩৬ ঘণ্টার মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। 
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ হবে অনধিক ৯০ দিন। দৈব-দুর্বিপাকের কারণে নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন সম্ভব না হলে মেয়াদ সর্বোচ্চ আরো ৩০ দিন বাড়ানো যাবে। নতুন সংসদ গঠনের পর নতুন প্রধানমন্ত্রী কার্যভার গ্রহণের তারিখে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলুপ্ত হবে।
তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা ভবিষ্যতে পরিবর্তনে গণভোটের প্রয়োজন হবে 
গতকাল মঙ্গলবার সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃস্থাপন নিয়ে বিশেষ কমিটির অবস্থানও বৈঠক শেষে স্পষ্ট করেছেন সংবিধান সংশোধন কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, আদালতের রায়ের বিষয়গুলো সংবিধান সংশোধনীতে প্রতিফলিত হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা এমনভাবে সংবিধানে প্রতিস্থাপন করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে এটি পরিবর্তন বা বাতিল করতে হলে জনগণের মতামত নিতে হয়; অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা শুধু সংবিধানে ফিরিয়ে আনার বিষয় নয়, ভবিষ্যতে কোনো সরকার বা সংসদ যাতে সহজে তা বাতিল করতে না পারে, সে জন্যও সাংবিধানিক সুরক্ষা দেয়ার চিন্তা রয়েছে। 
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, রাষ্ট্রপতি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হতে পারবেন না- এ বিষয়ে কমিটির মতামত রয়েছে। তবে সরকারপ্রধান বা প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের পদ্ধতি, অন্যান্য সদস্যের কাঠামোসহ তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিস্তারিত প্রক্রিয়া এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এ বিষয়ে বিভিন্ন পক্ষের মতামত পর্যালোচনা করা হবে। 
গত ২৯ সেপ্টেম্বর বিশেষ কমিটির চতুর্থ বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার কী প্রক্রিয়ায় এবং কাদের নিয়ে গঠিত হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রস্তাব নেয়া হবে এবং আলোচনার মাধ্যমে যে প্রস্তাব উপযুক্ত মনে হবে, সেটি সংসদীয় প্রক্রিয়ায় বিবেচনা করা হবে।  
এর আগে ২০ সেপ্টেম্বর সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেভাবেই তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হবে। সনদে থাকা নোট অব ডিসেন্টের বিষয়গুলোও আলোচনার মাধ্যমে বিবেচনা করার কথা জানান তিনি। একই সাথে দ্রুত সংসদে সংবিধান সংশোধন বিল আনার কথা জানিয়েছিলেন। 
‘আমরা-মামুরা সংশোধন কমিটি’  
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ বর্তমান সংবিধান সংশোধন কমিটিকে ‘আমরা-মামুরা সংশোধন কমিটি’ বলে মন্তব্য করেছেন। গত রোববার অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করা অনেককেই চেয়ার, পদ কিংবা মন্ত্রণালয়ের প্রলোভন দেখিয়ে নিজেদের পক্ষে নেয়া হয়েছে। শেষ পর্যন্ত জনগণই তাদের মূল্যায়ন করবে এবং তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলবে- এমন মন্তব্যও করেন তিনি। 
গণভোটের ফলাফল প্রসঙ্গে হাসনাত বলেন, ফলাফলের কিছু বিষয় মেনে নেয়া এবং কিছু বিষয় প্রত্যাখ্যান করার মাধ্যমে সংশ্লিষ্টরা দ্বিমুখী অবস্থান নিয়েছেন। তার অভিযোগ, জনগণের রায় বাস্তবায়নে সরকারের অনীহা স্পষ্ট হয়েছে। 
তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়েও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। তার দাবি, ২০০৬ সালের মতো একদলীয় নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের জন্য বিএনপি নতুন কোনো ফর্মুলা সামনে আনতে পারে। এ ক্ষেত্রে ‘প্রতারণামূলক’ কোনো ব্যবস্থা এবং ধর্মীয় আবেগ ব্যবহারের আশঙ্কার কথাও বলেন তিনি। তার বক্তব্য, জনগণের দেয়া রায় আগে বাস্তবায়ন করতে হবে। 
নোট অব ডিসেন্টসহ সনদ সংসদে আনা হোক  
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, নোট অব ডিসেন্টসহ জুলাই সনদে সরকারের যে অবস্থান রয়েছে, সেগুলোসহ পুরো বিষয়টি সংসদে আনা উচিত। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ সংসদে জুলাই সনদকে ‘অন্তহীন প্রতারণার দলিল’ বলেছেন- এমন প্রসঙ্গ তুলে মিলন বলেন, যারা ওই দলিলে স্বাক্ষর করেছেন, তারাই যদি সেটিকে প্রতারণার দলিল বলেন, তাহলে বিষয়টি জনগণই বিচার করবেন। তবে এ নিয়ে অর্থহীন বিতর্কে যেতে চান না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। 
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার পটভূমি 
রাজনৈতিক দলগুলোর দীর্ঘ আন্দোলনের পর ১৯৯৬ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে যুক্ত করে। পরে ২০১১ সালে সংবিধানের সংশোধনীর মাধ্যমে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার এই ব্যবস্থা বাতিল করে। 
বর্তমানে জুলাই জাতীয় সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে যে রাজনৈতিক ঐকমত্যের কাঠামো তৈরি হয়েছে, সেটিকে সংবিধানে কিভাবে কার্যকর রূপ দেয়া হবে, সেটিই বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার অন্যতম প্রধান প্রশ্ন। 
বিশেষ কমিটি এক দিকে বিভিন্ন পক্ষের মতামত নেয়ার প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে, অন্য দিকে বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষগুলোর অংশগ্রহণ ও নোট অব ডিসেন্টের বিষয়গুলো কিভাবে সংসদীয় প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। ফলে জুলাই সনদের রাজনৈতিক ঐকমত্যকে সাংবিধানিক ও সংসদীয় কাঠামোয় রূপ দেয়ার ক্ষেত্রে পরবর্তী আলোচনা ও সিদ্ধান্তগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।