
ভোরে পলো, হুসা ও জাল নিয়ে ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার দাদুড়িয়া বিলে নেমেছিলেন শত শত মানুষ।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত চলে এই ঐতিহ্যবাহী পলো বাওয়া উৎসব।
আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে মাছ শিকারি ও দর্শনার্থীদের সমাগমে বিলপাড় উৎসবমুখর হলেও আশানুরূপ মাছ না পেয়ে হতাশ হয়েছেন অনেকে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দেশীয় মাছের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ায় হুমকিতে পড়েছে গ্রামবাংলার এই লোকজ ঐতিহ্য।
বোয়ালমারী উপজেলার চতুল ও শেখর ইউনিয়নের দাদুড়িয়া বিলে আয়োজিত এ উৎসবে চতুল, ধুলপুকুরিয়া, দুর্গাপুর, তেলজুড়, নিধিপুর, পোয়াইল, শেখর, রাজাপুর, কলারণ, ছোলনা, গুনবহা, কুশাডাঙ্গাসহ আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের মানুষ অংশ নেন। কেউ পলো দিয়ে, কেউ হুসা বা জাল নিয়ে মাছ ধরার চেষ্টা করেন। মাছ শিকারের পাশাপাশি বহুদিন পর পরিচিতজনদের সঙ্গে দেখা হওয়া ও একসঙ্গে সময় কাটানোর আনন্দেও মেতে ওঠেন তারা।
পলো বাওয়া গ্রামবাংলার পুরোনো লোকজ আয়োজন। নির্দিষ্ট সময়ে দল বেঁধে বিলে নেমে মাছ ধরার এই রীতি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসছে। এটি শুধু মাছ শিকারের আয়োজন নয়, গ্রামীণ মানুষের সামাজিক বন্ধন ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও অংশ। তবে দাদুড়িয়া বিলে এবার মাছের স্বল্পতা সেই আনন্দে ভাটা ফেলেছে।
স্থানীয় মাছ শিকারিদের ভাষ্য, একসময় এ বিলে শিং, মাগুর, কই, বাইন, শোল, টাকি, পুঁটি, মলা ও ঢেলাসহ নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। এখন আগের মতো মাছ মিলছে না। তাদের ধারণা, অতিসূক্ষ্ম ফাঁসের চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার, বিলের মধ্যে অপরিকল্পিতভাবে পুকুর তৈরি এবং কৃষিজমিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে মাছ কমে থাকতে পারে। তবে এসব কারণের প্রভাব নির্ধারণে বৈজ্ঞানিক জরিপের তথ্য নেই।
গুনবহা গ্রামের বাসিন্দা মিকাইল বলেন, ‘বাবা-দাদার সময়ের ঐতিহ্য ধরে রাখতে পলো ও হুসা নিয়ে বিলে এসেছি। কিন্তু আশানুরূপ মাছ পাইনি।’
তার অভিযোগ, চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার দেশীয় মাছ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পলো বাওয়া উৎসবের এই দৃশ্য থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
আলফাডাঙ্গা থেকে আসা মাছ শিকারি আজিজুল ফকির জানান, অনেক আশা নিয়ে বিলে এসেছিলেন, কিন্তু মাছ কম থাকায় প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
শাহাবুল নামের আরেক মাছ শিকারি জানান, পলো দিয়ে মাছ না পেয়ে অনেকে বাঁশের কাঠামোয় মশারির কাপড় লাগানো বিশেষ ধরনের হুসা দিয়ে ছোট মাছ ধরার চেষ্টা করেছেন। তাতেও তেমন মাছ মেলেনি।
কুশাডাঙ্গা গ্রামের ইমরান জানান, পুরোনো দিনের স্মৃতি ধরে রাখতেই তারা এ আয়োজনে অংশ নিয়েছেন। কেউ কিছু মাছ পেয়েছেন, আবার কেউ খালি হাতে ফিরেছেন। দেশীয় মাছ ও পলো বাওয়ার ঐতিহ্য রক্ষায় চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
বোয়ালমারী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা পবিত্র কুমার দাস জানান, দেশীয় মাছের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ার বিষয়ে তাদের কাছে কোনো জরিপ নেই। তবে মাছের প্রজনন ও পোনা রক্ষায় জালের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। অনেক মাছের ডিম থেকে পোনা তৈরি হওয়ার পর সেগুলো সূক্ষ্ম ফাঁসের জালে আটকা পড়লে বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘জনবলসঙ্কটের কারণে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। চায়না দুয়ারি জাল জব্দ করতে গিয়ে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মুখেও পড়তে হয়। কিছু ব্যবসায়ী গোপনে এসব জাল বিক্রি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিক্রেতাদের শনাক্ত ও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রেও নজরদারির সীমাবদ্ধতা রয়েছে।’
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








