বাণিজ্য মেলা
বাণিজ্য মেলার জন্য নির্ধারিত স্থান। নয়া দিগন্ত

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের ধোড়করা বাজারসংলগ্ন তেলিগ্রাম বালুর মাঠে প্রশাসনের অনুমোদন না নিয়েই বাণিজ্য মেলার আয়োজন করছে স্থানীয় একটি অসাধু চক্র। আজ বুধবার মাসব্যাপী কথিত এই মেলার উদ্বোধন করা হবে বলেও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। 

Advertisement

বাণিজ্য মেলার নামে এ আয়োজনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাজারের ব্যবসায়ী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সচেতন ব্যক্তিদের মধ্যে ক্ষোভ ও উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। স্কুল-মাদরাসাসহ বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংলগ্ন মেলার নামে অবৈধভাবে অর্ধশতাধিক দোকান বসানোর প্রস্তুতি শুরু করায় পড়াশোনার পরিবেশ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের বার্ষিক ও বৃত্তি পরীক্ষা সামনে থাকায় অনুমোদনহীন এ মেলা আয়োজনটি অসাধু  আয়োজকদের একটি হটকারী সিদ্ধান্ত ও অবৈধভাবে অর্থ কামানোর অপচেষ্টা বলে অভিযোগ করছেন এলাকাবাসী।

জানা গেছে, চিওড়া ইউনিয়নের ধোড়করা বাজার ইজারাদারসহ স্থানীয় কতিপয় প্রভাবশালী ব্যক্তি নিজেদের আর্থিক সুবিধার জন্য ধোড়করা রেসিডেন্সিয়াল স্কুল ও আল হক্ব ইসলামী একাডেমি সংলগ্ন তেলিগ্রাম বালুর মাঠে মাসব্যাপী এ বাণিজ্য মেলার আয়োজন করছে। অপরদিকে মেলার নামে এ অস্থায়ী বাজার বন্ধের জন্য চৌদ্দগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে পৃথকভাবে তিনটি লিখিত দরখাস্ত দিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে স্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও এলাকার সচেতন ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে। গত ২০, ২১ ও ২২ সেপ্টেম্বর ধোড়করা বাজারের বিভিন্ন মার্কেটের ব্যবসায়ী, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয়দের থেকে প্রশাসনের কাছে মেলা বন্ধের এ আবেদন করেন। আবেদনকারীদের অভিযোগ, আশপাশে মেলা, পণ্য প্রদর্শনী ও অস্থায়ী বাজার বসানো হলে স্থায়ী ব্যবসায়ীরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বেন। এতে স্থানীয় ক্ষুদ্র, মাঝারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের বিক্রি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ব্যবসায়ী নেতারা জানান, স্থায়ী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো দোকানভাড়া, কর্মচারীদের বেতন, বিদ্যুৎ বিল, কর-ভ্যাট ও ট্রেড লাইসেন্সসহ বিভিন্ন ব্যয় বহন করে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। বিপরীতে অস্থায়ী স্টলে তুলনামূলক কম খরচে পণ্য বিক্রির সুযোগ থাকায় মেলা চলাকালে স্থায়ী ব্যবসায়ীদের বিক্রি কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এছাড়া মেলা চলাকালে উচ্চশব্দে মাইকিং, যানজট, জনদুর্ভোগ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কার কথাও আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে শিক্ষার্থী, বয়স্ক, অসুস্থ ব্যক্তি, নারী ও শিশুদের চলাচলে বিঘ্ন ঘটতে পারে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেন।

ধোড়করা রেসিডেন্সিয়াল স্কুলের প্রধান শিক্ষক কাজী এমদাদুল হক মাছুম উল্লেখ করেন, বিদ্যালয়টিতে প্রায় ৪০০ শিক্ষার্থী ও পাশের আল হক্ব ইসলামী একাডেমিতেও শতাধিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। রয়েছে ছাত্রাবাস ও নাইট কেয়ারের ব্যবস্থাও। সামনে বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষা, পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বৃত্তি পরীক্ষা। এমন সময়ে এক মাসের মেলায় শব্দ, লোকসমাগম ও রাতের কোলাহলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হতে পারে। এ কারণে প্রশাসনের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। 

স্থানীয়দের পক্ষ থেকে দেয়া আবেদনে বলা হয়েছে, মেলার স্থানসংলগ্ন এলাকায় মসজিদ ও মাদরাসা রয়েছে। সেখানে নিয়মিত নামাজ ও মাদরাসার কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তাছাড়া মেলাস্থলের কয়েক শ’ গজ দূরে ধোড়করা বাজার, ধোড়করা উচ্চ বিদ্যালয়, সিনিয়র মাদরাসা, দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ ৮/১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। মেলার কার্যক্রম চললে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মারাত্মক বিঘ্ন ঘটতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। 

তাছাড়া সম্প্রতি এ এলাকায় মাদক কারবারি ও কিশোর গ্যাং সদস্যদের তৎপরতা উদ্বেগজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ নিয়ে গত কয়েক মাসে এ এলাকায় খুন, আত্মহত্যাসহ বেশ কয়টি অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটেছে। মেলাকে কেন্দ্র করে এসকল অপ্রীতিকর ঘটনা আরো ব্যাপকহারে বাড়ার আশঙ্কা করছে তারা। 

প্রস্তুতকৃত মেলার জায়গার মালিকদের পক্ষে তেলিগ্রামের কাজী আবুল কাশেম সুমন, জামাল উদ্দিন পাটোয়ারী, কামরুল ইসলাম ও শাহাদাত হোসেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে সোমবার মেলার কার্যক্রম বন্ধের জন্য লিখিত আবেদন জানিয়ে বলেন, তেলিগ্রামসহ চিওড়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের কতিপয় ব্যক্তি কোনোরকম পূর্বানুমিত না নিয়েই তাদের মালিকানাধীন জায়গা বালুর মাঠে মাসব্যাপী একটি মেলা বসানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ মেলা চালু হলে গ্রামে বিভিন্ন এলাকা থেকে  ছাত্র, কিশোর, যুবকসহ বিভিন্ন শ্রেণির নারী-পুরুষের সমাগম হবে। এতে যেকোনো সময় হানাহানি, মারামারি ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এ মেলা করতে দেয়া সমীচীন হবে না।

তবে মেলা আয়োজক কমিটির অন্যতম সদস্য সফিউল ইসলাম জিয়া বলেন, ‘ধোড়করা বাজার ইজারাদারের উদ্যোগে ২০ দিনব্যাপী স্বল্পমূল্যের অস্থায়ী বাজার আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বর এটি উদ্বোধনের কথা রয়েছে। মেলা আয়োজনের জন্য প্রশাসনের কাছে অনুমতি চাওয়া হয়েছে এবং প্রস্তুতি কার্যক্রম চলমান রয়েছে।’

অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানদের সাথে কথা বলে আমরা প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে মেলা কার্যক্রম শুরু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে সাউন্ড সিস্টেম সীমাবদ্ধ রাখা হবে। এছাড়া মেলা প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকায় যানজট নিয়ন্ত্রণে ২০ সদস্যের একটি স্বেচ্ছাসেবক টিম রাখার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।’

মেলার আয়োজকদের আরেক সদস্য তেলিগ্রামের জাহাঙ্গীর কবিরের কাছে মেলার প্রস্তুতির ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি নিজেকে মেলার আয়োজক কমিটির সদস্য হিসেবে সরাসরি স্বীকার না করে বলেন, ‘আমি একটি দলের সক্রিয় কর্মী হিসেবে এলাকার দলীয় কয়েকজন লোক মেলা আয়োজনের ব্যাপারে আমার সম্পৃক্তা ও সহযোগিতা চেয়েছেন।’ গ্রামের কথা চিন্তা করে তিনি এর বেশি কোনো মন্তব্য করতে পারবেন না বলে জানান।

এ বিষয়ে চৌদ্দগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহাদাৎ হোসেন বলেন, ‘কোথাও কোনো মেলা বসাতে হলে অবশ্যই জেলা প্রশাসক মহোদয়ের অনুমোদন থাকতে হবে। এবিষয়ে জেলা প্রশাসক মহোদরের পক্ষ থেকে আমাকে কিছু জানানো হয়নি। তাই যেকেউ মেলা জাতীয় কোনাকিছুর প্রস্তুতি নিলেও সেখানে মেলা বসাতে পারবে না। তাছাড়া কয়েকদিন আগে স্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগের ভিত্তিতে আমি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সৈয়দ শাফকাত আলীর নেতৃত্বে পুলিশের একটি টিম পাঠিয়েছি, অনুমোদন ছাড়া যেন কোনো ধরনের মেলা কিংবা অস্থায়ী বাজার বসানো না হয়। এতে কেউ আইন অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

এ ব্যাপারে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো: আরিফ হোসাইন বলেন, ‘প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়া ধোড়করা এলাকায় বাণিজ্য মেলার প্রস্তুতি চলার অভিযোগ পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মহোদয়ের নির্দেশে এসিল্যান্ড মহোদয়ের সাথে থানা থেকে একজন অফিসারসহ প্রয়োজনীয় ফোর্স পাঠাই। প্রশাসনের নির্দেশ মোতাবেক পুলিশ তার দায়িত্ব যথাযথ পালন করবে।’