
মাঠজুড়ে পাকা ধানের সোনালী রোশনাই। কোথাও চলছে ধান কাটা, কোথাও মাড়াই, আবার কোথাও ধান শুকিয়ে ঘরে তোলার ব্যস্ততা। কৃষক-কৃষাণীদের এ মহাব্যস্ততার মাঝেও জেলার জীবননগরসহ জেলাজুড়ে কৃষকের মুখে নেই কাঙ্ক্ষিত হাসির রেখা।
প্রতিকূলতা কাটিয়ে চলতি মৌসুমে আউশ ধানের বাম্পার ফলন হলেও বাজারে ধানের দাম না থাকায় চরম হতাশায় দিন কাটছে স্থানীয় চাষীদের। বিঘা প্রতি ১ থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের; আর বর্গা চাষীদের অবর্ণনীয় লোকসানের বোঝা টানতে হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জীবননগরে ৭ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে উচ্চফলনশীল জাতের আউশ ধানের আবাদ হয়েছে। প্রতিকূল আবহাওয়া কম থাকা এবং রোগবালাই না হওয়ায় জমিতে ফলন হয়েছে চমৎকার। তবে মাঠের এ দৃশ্য যতটা স্বস্তির, বাজারের বাস্তবতা ঠিক ততটাই নির্মম।
বর্তমান বাজারে ভালো মানের শুকনো আউশ ধান বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৯৫০ থেকে ৯৮০ টাকা মণ দরে। অন্যদিকে কাঁচা ধানের দাম আরো কম, মণপ্রতি ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকা। কৃষি উপকরণ—বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিক খরচ কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় এ দামে উৎপাদন খরচই উঠছে না।
জীবননগরের চাষী হাসান আহম্মেদ আক্ষেপ করে জানান, দেড় বিঘা জমিতে ধান কাটা-মাড়াই পর্যন্ত প্রায় ২৫ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। সম্ভাব্য ফলন ২২ থেকে ২৩ মণ হলেও বর্তমান বাজারমূল্যে সব মিলিয়ে প্রায় ৩ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হবে। আরেক চাষী মিনারুল ইসলাম জানান, ১ বিঘা জমিতে ১৪ হাজার টাকা খরচের পর ধান পেয়েছেন ১৫ মণ। এতে নিজের হাড়ভাঙা খাটুনি তো বটেই, উল্টো ঋণের বোঝা মাথায় চাপছে। জমির মহাজন ও সারের দোকানের দেনা কীভাবে পরিশোধ করবেন—এ নিয়ে দিশেহারা তিনি।
ধানের বাজারে এ মন্দা ভাব নিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, বাজারে পুরোনো ধানের পর্যাপ্ত মজুত থাকায় নতুন ধানের চাহিদা কম। তাছাড়া পাইকারি বাজারে বিক্রি কম থাকায় চাইলেও বেশি দামে ধান কেনা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে মহাজনদের পাওনা ও সংসারের তাগিদে বাধ্য হয়েই কম দামে ধান বিক্রি করে দিচ্ছেন কৃষকেরা।
জীবননগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন জানান, চলতি মৌসুমে বারি-৯৮, বারি-৭৫, খাটোবাবু ও রডমিনিসহ বিভিন্ন উচ্চফলনশীল জাতের ভালো ফলন পাওয়া গেছে। বর্তমানে বাজারমূল্য কিছুটা কম হলেও কৃষকেরা কিছুদিন ধান ধরে রেখে বিক্রি করতে পারলে ভালো দাম পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
উৎপাদন খরচ না ওঠায় নতুন করে ধান চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন এই অঞ্চলের কৃষকেরা। কৃষক বাঁচলে বাঁচবে দেশ—তাই দ্রুত সরকারিভাবে ধান ক্রয়কেন্দ্র চালু করে সঠিক মূল্য নির্ধারণের জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী চাষীরা।







