জুলাই শহীদ
জুলাই শহীদরা। নয়া দিগন্ত

দেড় দশকের আওয়ামী লীগ শাসনামলে কুষ্টিয়ার রাজনীতিতে প্রভাবশালী এক নাম ছিলেন মাহবুব উল আলম হানিফ। কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক থেকে টানা তিনবারের সংসদ সদস্য—রাজনৈতিক উত্থানের সঙ্গে কুষ্টিয়া সদর ও শহরের রাজনীতিতে তার প্রভাব বিস্তৃত হয়। তার ঘনিষ্ঠদের উত্থান, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন-পীড়নের অভিযোগ এবং সম্পদ অর্জন নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর রায়ে আসে তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় পরিণতি। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে।

Advertisement

একই মামলায় কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খান, সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী ও শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতা ওরফে আতা আমৃত্যু কারাদণ্ড পেয়েছেন। চার আসামিই পলাতক থাকায় তাদের অনুপস্থিতিতে বিচার সম্পন্ন হয়। ট্রাইব্যুনাল তাদের স্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করে বিক্রয়লব্ধ অর্থ নিহতদের পরিবার ও আহতদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেয়ারও নির্দেশ দিয়েছেন।

রায়ের পর কুষ্টিয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনায় এসেছে হানিফের দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্থান, ক্ষমতার বলয় এবং তার ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ। স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও বাসিন্দাদের একাংশের মতে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাবের বিপরীতে এ রায় বিচারপ্রত্যাশীদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। তবে শহীদ পরিবারের সদস্যদের চাওয়া, শুধু রায় ঘোষণা নয়, এর কার্যকর বাস্তবায়নও নিশ্চিত করা হোক।

যেভাবে বিস্তৃত হয় রাজনৈতিক প্রভাব
১৯৯৬ ও ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুষ্টিয়া-২ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে পরাজিত হন মাহবুব উল আলম হানিফ। পরে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পান তিনি। ২০১৩ সালে কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর স্থানীয় রাজনীতিতে তার অবস্থান আরো শক্তিশালী হয়। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনেও একই আসন থেকে সংসদ সদস্য হন তিনি।

স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ও সংসদ সদস্য হিসেবে প্রভাব কাজে লাগিয়ে হানিফ কুষ্টিয়ার রাজনীতিতে একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। দলীয় নেতৃত্ব, স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং প্রশাসনিক বিভিন্ন বিষয়ে তার প্রভাব ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে ভিন্নমতের নেতাকর্মীদের কোণঠাসা করা এবং বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হামলা-মামলা ও হয়রানির অভিযোগও তুলেছেন বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষের নেতারা।

তবে এসব অভিযোগের সবকটির বিচারিক নিষ্পত্তি হয়নি। সংশ্লিষ্ট অভিযোগের ক্ষেত্রে অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য এবং প্রামাণ্য নথির ভিত্তিতে পৃথকভাবে সত্যতা যাচাই করা জরুরি।

পিটিআই রোড থেকে ‘হানিফ নগর’
কুষ্টিয়া শহরের পিটিআই রোডে অবস্থিত হানিফের বাড়িটি দীর্ঘদিন স্থানীয় রাজনৈতিক আলোচনার পরিচিত একটি ঠিকানা ছিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, হানিফের রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এলাকাটি ‘হানিফ নগর’ নামে পরিচিতি পেতে শুরু করে। যদিও এলাকাটির আনুষ্ঠানিক নাম পরিবর্তনের সরকারি নথি পাওয়া যায়নি, স্থানীয় পরিচিতিতে নামটি আলোচনায় এসেছে।

এলাকার কয়েকজন বাসিন্দার ভাষ্য, আগে পিটিআই রোড নামেই এলাকাটি বেশি পরিচিত ছিল। পরে হানিফের রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ার সঙ্গে ‘হানিফ নগর’ নামটি প্রচলিত হয়। তাদের দাবি, ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতার নাম জড়িয়ে থাকায় স্থানীয় পর্যায়ে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতেও অনেকে দ্বিধা বোধ করতেন।

ঘনিষ্ঠ আতার উত্থান ও দুদকের মামলা
হানিফের রাজনৈতিক উত্থানের সময় তার চাচাতো ভাই হিসেবে পরিচিত আতাউর রহমান আতারও কুষ্টিয়া শহর ও সদর উপজেলা রাজনীতিতে অবস্থান শক্ত হয়। তিনি সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এবং শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অভিযোগ, হানিফের রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে আতা শহর ও সদর উপজেলা পর্যায়ে আধিপত্য বিস্তার করেন। তাঁর বিরুদ্ধে নিয়োগ-বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি এবং রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় ছিল।

২০২২ সালে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে আতার বিরুদ্ধে নিয়োগ-বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি এবং বালুমহাল ও হাটবাজার ইজারার মাধ্যমে এক হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ সামনে আসে।

পরে ২০২৪ সালের ১১ মার্চ আতা ও তার স্ত্রী সাম্মিয়ারা পারভীনের বিরুদ্ধে ৬৩ লাখ ৬৬ হাজার ৫৭৪ টাকার অসংগতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করে দুদক। মামলায় স্ত্রীর সম্পদ অর্জনে আতার সহায়তার অভিযোগও আনা হয়।

এরপর ২০২৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি আতার বিরুদ্ধে আরও একটি মামলা করে দুদক। মামলার এজাহারে তার বিরুদ্ধে ১০ কোটি নয় লাখ ৬৮ হাজার ৯৪১ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করে ভোগদখলে রাখার অভিযোগ করা হয়। সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশের পর নির্ধারিত সময়ে হিসাব জমা না দেয়ার বিষয়টিও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।

হানিফের সম্পদ ও ব্যাংক লেনদেন নিয়ে তদন্ত
রাজনৈতিক প্রভাবের পাশাপাশি হানিফের সম্পদ অর্জন ও আর্থিক লেনদেন নিয়েও তদন্ত করেছে দুদক। ২০২৫ সালের ১৪ জুলাই তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও অর্থপাচারের অভিযোগে দু’টি মামলা করা হয়।

দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, হানিফ ২৭ কোটি ৩৯ লাখ ২৯ হাজার ৩১ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন। তার ১৮টি ব্যাংক হিসাবে ৮৬ কোটি ৬৬ লাখ ৬৯ হাজার ৪৯৭ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্যও মামলায় উল্লেখ করা হয়।

একই সময়ে তার স্ত্রীর বিরুদ্ধেও পৃথক অভিযোগ আনে দুদক। স্ত্রীর নামে চার কোটি ৬৯ লাখ ৬৮ হাজার ৪৯০ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং ১৬টি ব্যাংক হিসাবে ৩৩ কোটি ১৩ লাখ ৫০ হাজার ৬০৯ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগ করা হয়।

২০২৫ সালের মে মাসে হানিফ ও তার স্ত্রীর ৪০টি ব্যাংক হিসাবের প্রায় ৪৪৮ কোটি টাকা জব্দের আদেশ হয়। তবে ব্যাংক হিসাবে জমা ও উত্তোলন মিলিয়ে বড় অঙ্কের লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেলেই তা সরাসরি আত্মসাৎ বা অবৈধ সম্পদের পরিমাণ হিসেবে গণ্য হয় না। এসব অভিযোগেরও বিচারিক নিষ্পত্তি হয়নি।

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ক্ষোভ
কুষ্টিয়ায় দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিরোধী দলগুলোর নেতাদের অভিযোগ, হানিফ ও তার ঘনিষ্ঠদের প্রভাবের কারণে স্থানীয় রাজনীতিতে ভিন্নমতের মানুষ চাপের মুখে ছিলেন। দলীয় কোন্দল, হামলা-মামলা এবং রাজনৈতিক হয়রানির অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।

কুষ্টিয়া জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের দফতর সম্পাদক ইমন বলেন, ‘দীর্ঘদিন কুষ্টিয়ার রাজনীতিতে হানিফ ও তার ঘনিষ্ঠদের একচ্ছত্র প্রভাব ছিল। তাদের রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে আওয়ামী লীগের অনেক ত্যাগী ও ভিন্নমতের নেতাকর্মী কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন। বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, মামলা ও হয়রানির অভিযোগও রয়েছে। সাধারণ মানুষ অনেক সময় ভয়ে প্রতিবাদ করতে পারেননি।’

তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে কেউ যেন মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন করতে না পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হওয়া প্রয়োজন। রাজনীতিতে প্রতিহিংসার পরিবর্তে আইনের শাসন ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’

কুষ্টিয়া জেলা জামায়াতের সাবেক সেক্রেটারি সুজাউদ্দিন বলেন, ‘ক্ষমতায় থাকার সময় ক্ষমতার দাপটে সাধারণ মানুষের ওপর জুলুম-নির্যাতন চালানো হয়েছে। ক্ষমতাসীনরা ভেবেছিলেন, তারা চিরকাল ক্ষমতায় থাকবেন। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে রাজনীতিকদের শিক্ষা নেয়া উচিত।’

কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সদস্যসচিব জাকির হোসেন সরকার বলেন, ‘হানিফ ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, হামলা-মামলা ও হয়রানির অভিযোগ করে আসছিলেন কুষ্টিয়ার মানুষ।’ 

তার দাবি, বিভিন্ন রাজনৈতিক মতের মানুষ ক্ষমতার বলয়ের কাছে অসহায় হয়ে পড়েছিলেন। 

তিনি বলেন, ‘মানুষের ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা পূরণ এবং রাজনৈতিক নিপীড়নের বিচার প্রতিষ্ঠা গণতন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।’

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কুষ্টিয়া জেলা শাখার সদস্যসচিব সুলতান মারুফ তালহা বলেন, ‘আসামিরা দেশের বাইরে পলাতক থাকলে তাঁদের দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর করাই হবে সরকারের আন্তরিকতার প্রমাণ।’ 

রায় কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত সন্তোষ প্রকাশের সুযোগ নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

রায় কার্যকরের অপেক্ষায় শহীদ পরিবার
মৃত্যুদণ্ডের রায়ে কুষ্টিয়ার সাধারণ মানুষের একাংশের মধ্যে স্বস্তির কথা জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা নাসিমা খাতুন। 

তিনি বলেন, ‘রাজনীতি মানুষের জন্য হওয়া উচিত। ক্ষমতার কারণে মানুষ যদি ভয়ে কথা বলতে না পারে কিংবা মামলা-হামলার আশঙ্কায় প্রতিবাদ থেকে বিরত থাকে, তাহলে তা ভালো রাজনীতির পরিচয় হতে পারে না।’ 

ভবিষ্যতে কেউ যেন ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করতে না পারে, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।

শহীদ পরিবারের সদস্য সীমা বলেন, প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। রায়ে তাঁরা খুশি হলেও দেশের ভেতরে ও বাইরে পলাতক আসামিদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি কার্যকর করার দাবি জানান তিনি।

আরেক শহীদ পরিবারের সদস্য সুজন বলেন, ‘এই রায়ে আমরা সন্তুষ্ট। তবে দ্রুত বাস্তবায়ন দেখতে চাই।’

কুষ্টিয়ার রাজনীতিতে দীর্ঘদিন প্রভাবশালী অবস্থানে থাকা হানিফের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তবে শহীদ পরিবার ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রত্যাশা এখন রায় কার্যকরের দিকে। একই সঙ্গে হানিফ ও তার ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অন্যান্য অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগগুলোর আইনসম্মত তদন্তও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।