
মিশিগানের ডেট্রয়েটে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার অংশগ্রহণে একটি নির্বাচনী সমাবেশ চলছে। সমাবেশস্থলের বাইরে বুলেটপ্রুফ পোশাক পরা উগ্র ডানপন্থী উসকানিদাতা জেক ল্যাং মাইকে চিৎকার করে মুসলিমবিদ্বেষী গালাগাল দিচ্ছেন। তাঁর সহযোগীদের কারো কারো পরনে ক্রুসেডের আদলে তৈরি পোশাক ও সাজসজ্জা। একজনের হাতে কালো ক্রুশ আঁকা ধাতব ঢাল। তাঁদের হাতে রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থী মাইক রজার্সের নির্বাচনী প্রচারের প্ল্যাকার্ড। মিশিগানে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদের সাথে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হচ্ছে রজার্সের।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) আল জাজিরাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এল-সাইয়েদ এবং তাঁর সমর্থকেরা জানান, সিনেট নির্বাচনে ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে বিদ্বেষ ছড়ানোর ঘটনা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে এসব হামলায় মুসলিম সম্প্রদায় ভীত হয়ে পড়েনি। বরং নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও রাজনৈতিক ভাবে সংগঠিত হওয়ার মধ্য দিয়ে এর জবাব দিতে চাইছেন তারা।
প্রচার সমাবেশে আসা মানুষের ভিড় আর উগ্রপন্থীদের বিদ্বেষপূর্ণ স্লোগান না থাকলে আশপাশের লোকজন তাঁদের হ্যালোইনের পোশাক পরা মানুষ ভেবে ভুল করতে পারতেন।
ল্যাং চিৎকার করে বলছিলেন, ‘মুসলিমরা, এখান থেকে বেরিয়ে যাও। ক্রুসেড আসছে। নিজেরাই দেশ ছেড়ে চলে যাও।’
ল্যাংকে বিচ্ছিন্ন কোনো উসকানিদাতা মনে হতে পারে। কিন্তু মুসলিম-আমেরিকান অধিকারকর্মীদের মতে, তিনি যে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছেন, তা এখন মূলধারার রাজনীতিতেও জায়গা করে নিচ্ছে। বিশেষ করে মিশিগানের সিনেট নির্বাচনকে ঘিরে পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
আবদুল এল-সাইয়েদের বিরুদ্ধে মুসলিমবিদ্বেষী আক্রমণ শুধু উগ্র ডানপন্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যরাও সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এসব আক্রমণে অংশ নিচ্ছেন।
ডেট্রয়েট এলাকার পরিচিত আরব ও মুসলিম অধিকারকর্মী সুহাইলা আমেনের ভাষায়, তাঁর সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘আমাদের জন্য ৯/১১-এর পরের পরিস্থিতিও এখনকার তুলনায় যেন খুব সহজ সময় ছিল। এসব দেখা ও শোনা সত্যিই একেবারেই জঘন্য অভিজ্ঞতা।’
ল্যাংয়ের সহযোগী যাজক লরেঞ্জো সেওয়েল রজার্সের নির্বাচনী প্রচার শিবিরের একজন ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা। গত আগস্টে ডেট্রয়েটের উপশহর ডিয়ারবর্নে মুসলিমবিদ্বেষী পদযাত্রা আয়োজনেও তিনি ল্যাংকে সহায়তা করেন। ডিয়ারবর্নে বিপুলসংখ্যক আরব ও মুসলিম মানুষের বসবাস।
শহরটির মেয়র আবদুল্লাহ হামুদ জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরেই মুসলিমবিদ্বেষী উসকানিদাতাদের লক্ষ্যবস্তু ডিয়ারবর্ন। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে শহরটির বিরুদ্ধে হুমকির সংখ্যা বেড়েছে।
তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, ৯১১ নম্বরে ফোন করে কিংবা আমাদের কল সেন্টারে যোগাযোগ করে শহরটির বিরুদ্ধে অনেক হুমকি দেয়া হচ্ছে, সাধারণ মানুষ তার কিছুই জানেন না। প্রতিদিনই শহরের বাসিন্দাদের লক্ষ্য করে এসব হুমকি দেয়া হচ্ছে। বিষয়টি আমাকে উদ্বিগ্ন করে।’
বিদ্বেষের জবাব নির্বাচনে
রজার্সের নির্বাচনী প্রচার শিবিরের সাথে যাজক সেওয়েলের সম্পর্কের বিষয় আল জাজিরা জানতে চাইলেও কোনো জবাব দেয়নি তারা। তবে এল-সাইয়েদের ধর্মীয় ও পারিবারিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলার পক্ষে সাফাই গেয়েছেন রজার্স। তাঁর দাবি, বিষয়টি মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার সাথে জড়িত।
চলতি মাসের শুরুতে এল-সাইয়েদের সাথে বিতর্কের পর সাংবাদিকদের রজার্স বলেন, ‘এটি আপনি কীভাবে প্রার্থনা করেন, সেই প্রশ্ন নয়; বরং আপনি কীভাবে চিন্তা করেন, সেটিই আসল বিষয়।’
তবে স্থানীয় নেতারা বলছেন, এসব হুমকি কিংবা ট্রাম্পের প্রায় প্রতিদিনকার আক্রমণে তাঁদের সম্প্রদায় ভীত হয়ে ঘরে বসে থাকছে না। নাগরিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়া এবং এল-সাইয়েদের নির্বাচনী প্রচারে সমর্থন দেয়ার মধ্য দিয়ে তারা পাল্টা অবস্থান নিচ্ছে।
মেয়র হামুদ বলেন, ‘ট্রাম্প একজন ফ্যাসিবাদী। আমার মনে হয়, এর সবচেয়ে ভালো জবাব হবে আবদুলকে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে পাঠানো। তিনি দুটি বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রিধারী, এই দেশেরই সন্তান, এই অঙ্গরাজ্যের সন্তান। তিনি তাঁর হাইস্কুল দলের অধিনায়কও ছিলেন। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আমাদের সবচেয়ে ভালো জবাব এটাই হতে পারে।’
ট্রাম্প বারবার এল-সাইয়েদের নাম নিয়ে বিদ্রূপ করেছেন। তাঁর নাম ভুলভাবে ‘মোহাম্মদ’ বলে উল্লেখ করেছেন এবং ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে ‘জিহাদি’ আখ্যা দিয়েছেন।
আমেন বলেন, আরব ও মুসলিম-আমেরিকানরা নিজেদের নামের কারণে বিদ্বেষের শিকার হতে অভ্যস্ত। কিন্তু প্রেসিডেন্ট যখন এমন আচরণ করেন, তখন তা বর্ণবাদ ও বিদ্বেষকে বৈধতা দেয়।
তিনি বলেন, ‘এটা শুধু আশপাশের কোনো বখাটে লোকের বিষয় নয়, যে আপনাকে বর্ণবাদী গালি দেবে। এবার সেই বখাটে লোকটি হোয়াইট হাউসে বসে আছে।’
আমেন আরো বলেন, আক্রমণ বাড়লেও আরব ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন এবং রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হচ্ছেন। তাঁদের বিদেশি বা বহিরাগত হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টাও তাঁরা প্রত্যাখ্যান করছেন।
আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘মানুষ পছন্দ করুক বা না করুক, এই দেশের সামাজিক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ আমরা।’
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








