মতামত
মতামত। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

২০২৪-এর জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের মানুষের সামনে রাষ্ট্রকে নতুনভাবে গড়ে তোলার সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। সেই আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রে কেবল সরকার পরিবর্তন ছিল না; ছিল ক্ষমতা প্রয়োগের পদ্ধতি বদলানোর প্রত্যাশা। মানুষ এমন রাষ্ট্র চেয়েছিল, যেখানে নির্বাচনে জয়ী হওয়া মানে সব প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণের অবাধ অধিকার নয়; যেখানে বিরোধিতা অপরাধ হবে না এবং নাগরিকের অধিকার শাসকের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করবে না।
এই পরিবর্তনের আশায় যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের আত্মত্যাগ রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর গভীর দায়িত্ব অর্পণ করেছে। স্মরণসভা, শোকবার্তা কিংবা বক্তৃতায় তাদের নাম উচ্চারণেই সেই দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রকৃত সম্মান দেখাতে হলে এমন প্রতিষ্ঠান ও সাংবিধানিক ব্যবস্থা গড়তে হবে, যা ভবিষ্যতে কারও হাতে অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়া কঠিন করে তুলবে। জুলাইয়ের অঙ্গীকারের সার্থকতা নির্ধারিত হবে সেই কাজের ভিত্তিতে।
অথচ সাংবিধানিক সংস্কার নিয়ে চলমান বিতর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটিই আড়ালে পড়ছে : জনগণ যে পরিবর্তনের পক্ষে মতামত দিয়েছেন, তা কিভাবে কার্যকর, গ্রহণযোগ্য ও দীর্ঘস্থায়ী করা যায়? আলোচনা আটকে আছে কার প্রস্তাবিত প্রক্রিয়া অনুসৃত হবে এবং সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও গণভোটের ফলের মধ্যে কোনটির গুরুত্ব বেশি, সেই বিরোধে। দায়িত্বশীল নেতৃত্বের কাজ এই দুই জন রায়ের সমন্বয় ঘটানো।
সরকার যদি মনে করে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে বিরোধী দল ছাড়াই রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নিয়ম পরিবর্তন করা সম্ভব, আর বিরোধী দল যদি নিজেদের প্রস্তাবের বাইরে আলোচনার সব পথ বন্ধ করে দেয়, তাহলে সংস্কারের সুযোগ অচলাবস্থায় পরিণত হবে। এর মূল্য শুধু কোনো দলকে দিতে হবে না; রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং সাধারণ নাগরিকও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা সংবিধান সংশোধনের সংসদীয় শক্তি দিতে পারে, কিন্তু সংস্কারের স্থায়িত্বের জন্য রাজনৈতিক সমঝোতাও প্রয়োজন। ভবিষ্যতে যে ব্যবস্থার অধীনে সবাই রাজনীতি করবে, তা প্রণয়নের সময় বিরোধীপক্ষকে বাইরে রাখলে গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তি দুর্বল হয়। সমঝোতার দায়িত্ব উভয় পক্ষের হলেও উদ্যোগ গ্রহণ এবং আস্থার পরিবেশ তৈরিতে সরকারের দায়িত্ব অনেক বেশি।
বাংলাদেশের গণভোটের ইতিহাস এখানে প্রাসঙ্গিক। ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমানের আমলের গণভোটে সরকারি হিসাবে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৮৮ দশমিক ০৫ শতাংশ এবং ‘হ্যাঁ’ ভোট ৯৮ দশমিক ৮৮ শতাংশ। ১৯৮৫ সালে এরশাদের আমলে হার দু’টি ছিল যথাক্রমে ৭২ দশমিক ৪৪ ও ৯৪ দশমিক ১১ শতাংশ। সামরিক শাসনামলের এই দুই গণভোটের গ্রহণযোগ্যতা ও পরিসংখ্যান নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রশ্ন রয়েছে।
১৯৯১ সালের প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তনের সাংবিধানিক পরিবর্তন নিয়ে অনুষ্ঠিত গণভোটে উপস্থিতি ছিল প্রায় ৩৫ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং ‘হ্যাঁ’ ভোট ৮৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ। শাসকের প্রতি আস্থা যাচাই এবং সরকারপদ্ধতি পরিবর্তনে জনগণের অনুমোদন নেয়া এক বিষয় নয়। তাই সব গণভোটকে একই রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিচার করা ইতিহাসের প্রতি সুবিচার হবে না।
প্রতিটি গণভোটের প্রশ্ন, প্রচারের পরিবেশ, ভোটগ্রহণের প্রক্রিয়া ও ফলাফল পৃথকভাবে পরীক্ষা করতে হয়। অতীতের কোনো আয়োজন বিতর্কিত ছিল বলে পরবর্তী প্রতিটি গণভোটও একইভাবে মূল্যায়িত হতে পারে না। আবার শুধু ফলাফলের অনুপাত দেখেই স্বচ্ছতার সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। প্রশাসনের আচরণ, গণনা, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং মতপ্রকাশের সুযোগও বিবেচনায় নিতে হয়।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটকে এই বিবেচনা থেকেই দেখতে হবে। নির্বাচন কমিশনের সংশোধিত হিসাবে ‘হ্যাঁ’ ভোট চার কোটি ৭২ লাখ ২৫ হাজার ৯৮০টি এবং ‘না’ ভোট দুই কোটি ১৯ লাখ ৬০ হাজার ২৩১টি। অর্থাৎ বৈধ ভোটের প্রায় ৬৮ দশমিক ২৬ শতাংশ পক্ষে এবং ৩১ দশমিক ৭৪ শতাংশ বিপক্ষে। এটি সংস্কারের পক্ষে সুস্পষ্ট সমর্থনের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য ভিন্নমতও নির্দেশ করে।
‘না’ ভোটদাতাদের সবার আপত্তির কারণও এক ছিল, এমন ধরে নেয়া ঠিক নয়। আপত্তি থাকতে পারে নির্দিষ্ট প্রস্তাবে, বাস্তবায়ন-পদ্ধতিতে কিংবা একাধিক বিষয় একই প্রশ্নে অন্তর্ভুক্ত করায়। ফলে গণভোট সংস্কারের পক্ষে নির্দেশনা দিলেও প্রতিটি বিধানের ভাষা ও প্রয়োগ নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন শেষ হয়নি। সেই আলোচনার লক্ষ্য হওয়া উচিত অনুমোদিত অঙ্গীকার যথাযথভাবে কার্যকর করা। এই জায়গাতেই নতুন গণভোটের প্রশ্ন আসে। জনগণ ইতোমধ্যে যে সংস্কার প্রশ্নে মতামত দিয়েছেন, একই রাজনৈতিক অনুমোদনের জন্য আবার তাদের কাছে ফেরার প্রয়োজন কোথায়? নতুন মৌলিক বিষয় কিংবা সুনির্দিষ্ট আইনগত প্রয়োজন দেখানো ছাড়া একই প্রশ্নে আরেকটি গণভোট অপ্রয়োজনীয়। এতে বাস্তবায়ন পিছিয়ে যেতে পারে এবং আগের রায়ের গুরুত্ব সম্পর্কে সংশয় তৈরি হতে পারে।
তবে সংস্কার কর্মসূচির নীতিগত অনুমোদন এবং বিস্তারিত সাংবিধানিক সংশোধনী বিলের অনুমোদন সব ক্ষেত্রে অভিন্ন নয়। পরবর্তী খসড়ায় নতুন মৌলিক পরিবর্তন যুক্ত হলে কিংবা অনুমোদিত প্রস্তাবের অর্থ বদলালে আলাদা প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। তখন সরকারকে ব্যাখ্যা করতে হবে প্রথম গণভোটে কি অনুমোদিত হয়েছিল, নতুন প্রস্তাব কোথায় পৃথক এবং কোন বিধানের অধীনে আবার গণভোট প্রয়োজন।
একইভাবে গণভোটের ফল পাওয়া মানেই সংবিধান সংশোধনের সব আইনগত ধাপ সম্পন্ন হওয়া নয়। জনরায়ের মর্যাদা রক্ষা এবং বৈধ প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়ন, দু’টি দায়িত্ব একসাথেই পালন করতে হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সাম্প্রতিক বক্তব্যে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পরিবর্তনে গণভোট এবং রাষ্ট্রপতির সম্মতির আগে জনরায় গ্রহণের প্রসঙ্গ এসেছে। এখানে সরকারের অবস্থানের আরো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
সরকার কি ভবিষ্যতের সংশোধনীর জন্য গণভোটের স্থায়ী সাংবিধানিক সুরক্ষা প্রতিষ্ঠা করতে চায়, নাকি ইতোমধ্যে অনুমোদিত সংস্কার বাস্তবায়নে আবার গণভোটকে শর্ত করছে? দু’টি বিষয়ের উদ্দেশ্য ও পরিণতি পৃথক। ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা অপসারণ কঠিন করার প্রস্তাব আলোচনাযোগ্য। কিন্তু সেই আলোচনার মধ্যে বর্তমান অঙ্গীকার বাস্তবায়ন অনির্দিষ্ট হয়ে পড়লে রাজনৈতিক আস্থার সঙ্কট আরো বাড়বে।
সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ নিয়ে আলোচনাও পূর্ণাঙ্গ হতে হবে। প্রযোজ্য বিধান, সংশ্লিষ্ট আদালতের রায়, গণভোটের প্রশ্ন এবং অনুমোদিত বাস্তবায়ন-পদ্ধতির সম্পর্ক ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। শুধু একটি অনুচ্ছেদ উল্লেখ কিংবা রাজনৈতিক বক্তব্যের পুনরাবৃত্তিতে বিতর্ক মিটবে না। সরকারের ব্যাখ্যা প্রকাশ্য হতে হবে এবং বিকল্প যুক্তির উত্তরও দিতে হবে, যাতে নাগরিকরা মতপার্থক্যের প্রকৃত জায়গা বুঝতে পারেন।
একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ভোটাররা দু’টি পৃথক প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। একটি নির্ধারণ করেছে কারা সরকার পরিচালনা করবেন; অন্যটি জানিয়েছে নির্দিষ্ট সংস্কার সম্পর্কে তাদের অবস্থান। সংসদীয় বিজয় গণভোটকে অপ্রাসঙ্গিক করে না; গণভোটও নির্বাচিত সংসদের ভূমিকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত করে না। এই দুই জনরায়কে মুখোমুখি দাঁড় করানোর পরিবর্তে সম্মিলিত বাস্তবায়নের পথ  খুঁজতে হবে।
সংসদীয় গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অপরিহার্য। কিন্তু দৈনন্দিন নীতিনির্ধারণ এবং ভবিষ্যতের রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মৌলিক নিয়ম পরিবর্তনের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, ক্ষমতার ভারসাম্য ও বিরোধী দলের অধিকার নিয়ে বিস্তৃত গ্রহণযোগ্যতা প্রয়োজন। সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হওয়া উচিত : প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় বিরোধী দলে থাকলেও সংশ্লিষ্ট দল কি নিজেকে নিরাপদ মনে করবে এবং নিয়মগুলোকে ন্যায্য বলবে?
ইতিহাস এ বিষয়ে সতর্কবার্তা দেয়। ১৯৯৫ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে সৃষ্ট অচলাবস্থায় অধ্যাপক রেহমান সোবহান ও ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমদসহ পাঁচজন বিশিষ্ট নাগরিক সমঝোতার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ‘গ্রুপ অব ফাইভ’ নামে পরিচিত সেই উদ্যোগ সফল হয়নি। কিন্তু এর শিক্ষা শুধু নাগরিক মধ্যস্থতার সীমাবদ্ধতা নয়; সময়মতো সমঝোতা না হলে কত মূল্য দিতে হয়, পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ তা দেখিয়েছে।
বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মধ্যে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সঙ্কট মেটাতে পারেনি। ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে বিএনপি সরকারকে সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হয়; জুনের নির্বাচনে দলটি ক্ষমতা হারায়। কোনো পদক্ষেপের সাংবিধানিক ব্যাখ্যা থাকলেই রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত হয় না। আগে আলোচনায় সম্ভব সমঝোতা পরে এসেছে সঙ্ঘাত ও বড় রাজনৈতিক ক্ষতির মধ্য দিয়ে।
২০০৬ সালের সঙ্কট আরো গুরুতর সতর্কতা দেয়। নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে সঙ্ঘাত, অবিশ্বাস ও সমঝোতার ব্যর্থতা ২০০৭ সালের জরুরি অবস্থা এবং সেনাসমর্থিত প্রশাসনের পটভূমি তৈরি করেছিল। ইতিহাস হুবহু ফেরে না। কিন্তু বিরোধ নিষ্পত্তির অভিন্ন প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক পক্ষগুলোর আস্থা না থাকলে একটি নির্দিষ্ট প্রশ্নের বিতর্ক পুরো ব্যবস্থার সঙ্কটে পরিণত হতে পারে।
২০২৬ সালে বাংলাদেশের আবার সেই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রক্রিয়া দেখিয়েছিল, তীব্র মতবিরোধ নিয়েও দলগুলো আলোচনায় অংশ নিতে পারে। কিছু বিষয়ে একমত হয়ে অন্য বিষয়ে ভিন্নমত রেখেও সংলাপ সম্ভব। এখন প্রতিটি বর্জন, একতরফা সিদ্ধান্ত ও মুখোমুখি অবস্থান সেই অর্জনকে দুর্বল করছে এবং পরবর্তী সমঝোতা কঠিন করে তুলছে।
বর্তমান সংস্কার ভবিষ্যৎ সরকারের কাছে পূর্ববর্তী দলের চাপিয়ে দেয়া ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হলে তার স্থায়িত্ব অনিশ্চিত থাকবে। তাই বিরোধী দলের অংশগ্রহণ কোনো দলকে সুবিধা দেয়ার বিষয় নয়। তাদের আসন কম হলেও তারা বিপুল সংখ্যক নাগরিকের প্রতিনিধি। রাষ্ট্রীয় কাঠামো নির্ধারণে তাদের উদ্বেগ অগ্রাহ্য করলে সেই নাগরিকদের মধ্যেও বঞ্চনার অনুভূতি তৈরি হবে।
অংশগ্রহণ মানে শুধু বৈঠকে আমন্ত্রণ নয়। বিরোধী দলের প্রস্তাবে খসড়া পরিবর্তনের সুযোগ থাকতে হবে; আপত্তি নথিভুক্ত করতে হবে এবং গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের কারণ জানাতে হবে। সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে মতামত চাইলে আস্থা তৈরি হয় না। সময়সূচি, খসড়া ও সংসদীয় কার্যক্রমের অধিকাংশ নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে বলেই আস্থা তৈরিতে তার দায়িত্ব বেশি।
বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতার সাথে রাজনৈতিক উদারতাও প্রত্যাশিত। গ্রহণযোগ্য প্রস্তাব মেনে নেয়া কিংবা আলোচনায় খসড়া সংশোধন নেতৃত্বের সক্ষমতা প্রকাশ করে। বিরোধী দলও প্রতিটি উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করে দায়িত্ব এড়াতে পারে না। কোন ফোরামে আলোচনা সম্ভব, কি নিশ্চয়তা প্রয়োজন এবং কোথায় সমঝোতার সুযোগ রয়েছে, তা স্পষ্ট করতে হবে। দাবির পাশাপাশি বাস্তবায়নযোগ্য বিকল্পও দিতে হবে।
সবাইকে নিয়ে সংস্কারের অর্থ প্রত্যেককে সীমাহীন ভেটো দেয়া নয়। প্রতিটি বিষয়ে সর্বসম্মতি সম্ভব না হলেও মৌলিক নীতি, আলোচনার প্রক্রিয়া এবং বিরোধ নিষ্পত্তির পদ্ধতিতে বিস্তৃত সমঝোতা সম্ভব। এখন প্রয়োজন সময়সীমাবদ্ধ সংলাপ। গণভোটে অনুমোদিত অঙ্গীকার এবং বাস্তবায়নের মতবিরোধ চিহ্নিত করে সম্মত ও বিতর্কিত বিষয়গুলো প্রকাশ করলে জনগণও অচলাবস্থার কারণ বুঝতে পারবেন।
আইনগত প্রশ্নে স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের লিখিত মতামত এবং ভিন্ন ব্যাখ্যা প্রকাশ করা প্রয়োজন। তবে রাজনৈতিক সমঝোতার দায় বিশেষজ্ঞ বা আদালতের ওপর চাপানো যাবে না। খসড়া নিয়ে নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী, নারী, সংখ্যালঘু ও সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর বক্তব্যও শুনতে হবে। প্রধান দলগুলোর সমঝোতা নাগরিকের সব স্বার্থ ধারণ করে না; কোনো সমঝোতাই অধিকার সঙ্কোচনের গ্রহণযোগ্যতা দিতে পারে না।
খসড়া প্রকাশ, মতামত গ্রহণ, সংশোধন ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বাস্তবসম্মত সময়সীমা থাকতে হবে। অনির্দিষ্ট আলোচনা যেমন বিলম্ব ঘটায়, তাড়াহুড়োও নতুন সঙ্কট তৈরি করে। সংশোধনী পাসেই কাজ শেষ নয়। প্রয়োজনীয় আইন, অর্থায়ন, প্রশাসনিক পরিবর্তন, স্বচ্ছ নিয়োগ ও জবাবদিহি ছাড়া অঙ্গীকার কাগজে থাকবে। স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গড়ার পাশাপাশি তাকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়ার সদিচ্ছাও প্রয়োজন।
জুলাইয়ের সংস্কার-প্রত্যাশাকে প্রক্রিয়াগত সঙ্ঘাতে আটকে রাখা যায় না। সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কাজ এগিয়ে নেয়ার শক্তি দিয়েছে; এখন প্রয়োজন বিরোধী দলকে সাথে নেয়ার উদ্যোগ। এমন সাংবিধানিক সমঝোতা চাই, যা বর্তমান সংখ্যাগরিষ্ঠতার মেয়াদ অতিক্রম করেও আস্থা ধরে রাখবে। বাংলাদেশ আরেকটি সংস্কার-অচলাবস্থার মূল্য দিতে পারে না। বিরোধ সমাধানে যৌথ দায়িত্ব গ্রহণই এখন রাজনৈতিক নেতৃত্বের সবচেয়ে জরুরি কাজ। 
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
mwtanvir@gmail.com

Advertisement