সরকারি সেবা
মো: আনোয়ারুল ইসলাম শামীম লেখক

সরকারি সেবা কি নাগরিকের অধিকার, নাকি কর্মকর্তার অনুগ্রহ? প্রশ্নটি কোনো একজন ব্যবসায়ীর নয়। এটি সেই অবসরপ্রাপ্ত মানুষের, যিনি পেনশনের কাগজ নিয়ে অফিসে ঘোরেন। সেই কৃষকের, যার জমির কাগজ প্রয়োজন। সেই তরুণের, যিনি ছোট একটি ব্যবসা শুরু করতে লাইসেন্স চান। সেই উদ্যোক্তার, যিনি জীবনের সঞ্চয় বিনিয়োগ করে একটি অনুমোদনের অপেক্ষায় আছেন।

মানুষগুলো আলাদা। প্রয়োজনও আলাদা। কিন্তু তাদের অনেকের অভিজ্ঞতার ভাষা আশ্চর্য রকম এক— ‘পরে আসেন’, ‘ফাইল উপরে গেছে’, ‘স্যার এখনো দেখেননি’, ‘প্রক্রিয়াধীন আছে’।

প্রশাসনের ভাষায় এগুলো হয়তো সাধারণ কয়েকটি বাক্য। কিন্তু একজন সাধারণ মানুষের জীবনে প্রতিটি ‘পরে আসেন’-এর একটি মূল্য আছে। কারণ ফাইল থেমে থাকতে পারে, জীবন থেমে থাকে না।

বৃদ্ধ মানুষের বয়স থেমে থাকে না। রোগীর ওষুধের প্রয়োজন থেমে থাকে না। কৃষকের মৌসুম অপেক্ষা করে না। ব্যাংকের সুদ থামে না। ব্যবসার সুযোগও অপেক্ষা করে না। এই জায়গাতেই একটি প্রশাসনিক ফাইল আর নিছক কাগজ থাকে না, সেটি মানুষের জীবনের অংশ হয়ে যায়।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে আইন অনুযায়ী আচরণ পাওয়াকে নাগরিকের অবিচ্ছেদ্য অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। উচ্চ আদালতও সরকারি দায়িত্ব পালনে আইন ও বিধি অক্ষরে ও মর্মে অনুসরণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। অর্থাৎ নাগরিক যখন বৈধ সেবার জন্য সরকারি দফতরে যান, তিনি কারো ব্যক্তিগত অনুগ্রহ চাইতে যান না। তিনি নিজের রাষ্ট্রের কাছে নিজের আইনসম্মত অধিকার চাইতে যান। রাষ্ট্র নিজেও সময়ের মূল্য বোঝে। তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ অনুযায়ী সাধারণ ক্ষেত্রে তথ্যের আবেদন ২০ কার্যদিবসের মধ্যে এবং একাধিক তথ্য ইউনিট বা কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট থাকলে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে। তথ্য দিতে অপারগ হলে কারণ জানাতেও সময়সীমা আছে।

তাহলে প্রশ্নটি খুব সাধারণ—তথ্য দেয়ার সময় যদি নির্ধারণ করা যায়, নাগরিকের প্রয়োজনীয় সেবা দেয়ার সময় কেন অনিশ্চিত থাকবে? আমার মতে, বাংলাদেশের প্রশাসনিক সংস্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখানেই।

আমাদের নতুন কোনো জটিল তত্ত্ব প্রয়োজন নেই। একজন নাগরিক সরকারি দফতরে যাওয়ার আগেই মাত্র চারটি প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর জানতে চান— কী কাগজ লাগবে? কত টাকা লাগবে? কত দিন লাগবে? আর সময়মতো না হলে জবাব দেবেন কে?

প্রথম তিনটির উত্তর অনেক দফতরের সিটিজেন চার্টারে পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু চতুর্থ প্রশ্নটিই আসল— জবাব দেবেন কে?

কারণ দায়িত্ব যখন সবার, বাস্তবে দায়িত্ব অনেক সময় কারো থাকে না। এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ফাইল যায়। একজন মতামত দেন, আরেকজন স্বাক্ষর করেন, তৃতীয়জন অনুমোদন দেন। শেষ পর্যন্ত কাজ না হলে নাগরিক বুঝতে পারেন না—কোথায় প্রশ্ন করবেন। এই অদৃশ্যতাই বদলাতে হবে।

প্রতিটি আবেদনের ডিজিটাল সময়চিহ্ন থাকা উচিত। নাগরিক যেন মোবাইল থেকেই দেখতে পারেন—কবে আবেদন করেছেন, কোন কর্মকর্তার কাছে ফাইল আছে, কত দিন ধরে আছে এবং নির্ধারিত সময় অতিক্রম করলে কেন সিদ্ধান্ত হয়নি।

সময়সীমা পার হলে ফাইল স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরবর্তী জবাবদিহির স্তরে যাক। বিলম্বের কারণ লিখতে হোক। ফাইলের গতিপথ যত দৃশ্যমান হবে, অদৃশ্য ক্ষমতার জায়গা তত ছোট হবে।

এটি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নয়। বরং সৎ কর্মকর্তার জন্যও সুরক্ষা। কারণ নিয়ম স্পষ্ট হলে কর্মকর্তাকে তদবিরের ফোন কম ধরতে হবে। নাগরিককেও পরিচিত মানুষ খুঁজতে হবে না। সিদ্ধান্ত ব্যক্তির ওপর নয়, প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে।

আমাদের সবচেয়ে বড় সংস্কার তাই শুধু সরকারি অফিসকে ডিজিটাল করা নয়।

রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কটিকেও ডিজিটাল যুগের উপযোগী করতে হবে—অনুগ্রহের সম্পর্ক থেকে অধিকারের সম্পর্কে। একটি দেশের সুশাসন শুধু সচিবালয়ের নীতিপত্রে মাপা যায় না। সুশাসন দেখা যায় উপজেলা অফিসের বারান্দায় অপেক্ষা করা বৃদ্ধের চোখে। ভূমি অফিস থেকে ফিরে যাওয়া কৃষকের অভিজ্ঞতায়। প্রথম ব্যবসার লাইসেন্স নিতে যাওয়া তরুণের মনে। হাসপাতালে একটি কাগজের জন্য অপেক্ষা করা পরিবারের অসহায়তায়।

কারণ সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রকে সবচেয়ে বেশি অনুভব করেন রাষ্ট্রের সবচেয়ে ছোট দরজাগুলোতে। সেই দরজায় যদি তিনি সম্মান পান, রাষ্ট্রের প্রতি তার বিশ্বাস বাড়ে।

আর যদি নিজের বৈধ কাজের জন্যও তাকে বারবার বলতে হয়—‘স্যার, একটু দেখবেন’—তাহলে সমস্যাটি শুধু একটি ফাইলের নয়। সমস্যাটি নাগরিকের মর্যাদার। 

সরকারি কর্মকর্তা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তার পদ ও দায়িত্বের মর্যাদা অবশ্যই থাকতে হবে। কিন্তু সেই মর্যাদার সবচেয়ে বড় উৎস ক্ষমতা নয়—সেবা।

কারণ সরকারি চেয়ার ব্যক্তির নয়, রাষ্ট্রের। আর রাষ্ট্রের মালিকানার মূল উৎস জনগণ। তাই বৈধ সেবা দেয়া কোনো অনুগ্রহ নয়। এটি দায়িত্ব।

আমি এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চাই, যেখানে একজন বৃদ্ধ পেনশন পেতে পরিচিত কর্মকর্তা খুঁজবেন না। একজন কৃষক জমির কাগজের জন্য তদবির করবেন না। একজন তরুণ প্রথম ব্যবসা শুরু করার আগেই ‘লোক ধরার’ শিক্ষা নেবেন না। একজন উদ্যোক্তা বিনিয়োগ করার পর তার ফাইল কোন টেবিলে পড়ে আছে, সেটি জানতে মানুষের দ্বারে দ্বারে যাবেন না। সেদিন প্রশাসনিক সংস্কারের সবচেয়ে বড় সাফল্য কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝাতে হবে না।

একজন সাধারণ মানুষের একটি বাক্যই যথেষ্ট হবে—‘আমি কাউকে চিনতাম না। কাউকে ফোন করতে হয়নি। নিয়ম মেনেই আমার কাজ হয়েছে।’ আমার কাছে এটিই সুশাসনের সবচেয়ে শক্তিশালী সংজ্ঞা।

লেখক : প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ রেফ্রিজারেশন অ্যান্ড এয়ারকন্ডিশনিং মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (ব্রামা)