
রফিকুল হায়দার ফরহাদ
জাতীয় স্টেডিয়ামে বেশ পরিপাটি বাংলাদেশ উশু ফেডারেশন কার্যালয়। জুতা বাইরে ফেডারেশন অফিসে প্রবেশ করতে হয়। ভেতরের গোছানো পরিবেশ যে কাউকেই মুগ্ধ করবে। পরশু বিকেলে এই উশু ফেডারেশন আরো উজ্জ্বলতা ছড়াচ্ছিল একজনের উপস্থিতিতে। আর তিনি জিন্নাত আক্তার। এবারের আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমসে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের একমাতত্র পদক জয়ী তিনি। ভাগ্য এবার দুই হাত ভরে দিয়েছে জিন্নাত আক্তারকে। লটারিতে বাই পাওয়া- যা তাকে সরাসরি নিয়ে যায় কোয়ার্টার ফাইনালে। এরপর কোয়ার্টারে বেশি ওজনের জন্য খেলার অযোগ্য ঘোষণা ইন্দোনেশিয়য়ান প্রতিপক্ষকে। ব্যাস এতেই কপাল খুলে যায় জিন্নাতের। রেকর্ড বুকে চলে গেলেন নেত্রোকোনা জেলার এই মেয়ে। বাংলাদেশের প্রথম নারী ক্রীড়াবিদ হিসেবে একক ইভেন্টে এশিয়ান গেমসে পদক জিতলেন তিনি। ফেডারেশন কার্যালয়ে প্রথম প্রতিক্রিয়াতেই তিনি জানান, মহান আল্লাহ তায়ালা নিজ হাতেই আমাদেরকে এই পদকটি দিয়েছেন।
জিন্নাতের এই অর্জন একই সাথে ৪০ বছর আগে বক্সার মোশাররফ হোসেনের পর ব্যক্তিগততে এশিয়াডে পদক জয়। ফুটবলার হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করা সেনাবাহিনীর এই ক্রীড়াবিদের আইচি নাগোয়া এশিয়ান গেমসই ছিল প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক আসর। এতে পদক জিতে ইতিহাসের অংশ হয়ে গেলেন তিনি। এশিয়ান গেমসে পদক জয়ের পর জিন্নাতের লক্ষ্য এখন এসএ গেমস ও ইসলামী সলিডারিটি গেমসে স্বর্ণ জয়। বিদেশী কোচের অধীনে উন্নত প্রশিক্ষণ পেলে তা সম্ভব বলে দৃঢ়তার সাথে জানান তিনি।
পারিবারিক ও পারিপার্শ্বিক বাধা ডিঙ্গিয়ে ২০১৪-১৫ সিজনে বঙ্গমাতা ফুটবল দিয়ে খেলাধুলায় আসা। প্রথমে খেলতেন গোলরক্ষক পজিশনে। একজন গোলরক্ষকের যে উচ্চতা থাকা দরকার তা আছে। তবে গোলরক্ষক পজিশন ছেড়ে মিডফিল্ডে চলে আসেন। জিন্নাত জানান, গোলরক্ষক হিসেবে খেলে দেখলাম বল আসে না আমার কাছে। তাই কোচকে বলে আমি মিডফিল্ডে চলে আসি।’ এরপর নিজ এলাকার মুক্তারপাড়া মাঠে মিডফিল্ডে খেলেই সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জেতেন। ২০১৮ সালে বাফুফের ক্যাম্পে ডাকও পান। কিন্তু পাসপোর্টের সমস্যায় বাদ পড়া। সে বছরই বাংলাদেশ আনসারে উশুর প্রতিভা অন্বেষনের ট্রায়ালে অংশ নিয়েই টিকে যান। তাকে বাছাই করেন দিলদার হাসান দিলু, মাহমুদ ও রায়হান ফকির। তখন ওজন কম থাকায় জিন্নাতকে উশুর নিচের ওজন শ্রেণীতে খেলার জন্য মনোনীত করা হয়। ২০২৩ সালে চাকরি নেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে। এই চাকরি নেয়ার পরই ভালো ট্রেনিং ও উন্নত সুযোগ-সুবিধা পাল্টে দেয় জিন্নাতের ক্যারিয়ার।
উশুতে দু’টি বিভাগ। একটি ফাইট। অপরটি ডিসপ্লে। জিন্নাতকে এই ফাইটেই বাছাই করা হয়। প্রথম তিনি ৪৫ কেজি ওজন শ্রেণীতে লড়াই করতেন। পরে ৫২ কেজিতে। এবারের এশিয়ান গেসমে অংশ নেয়ার আগে জাতীয় উশু প্রতিযোগিতায় সাতটি স্বর্ণ গলায় তুলেছেন। পাঁচটি ৪৫ কেজিতে। অপর দু’টি ৫২ কেজিতে। এবার তার এশিয়ান গেমসে ব্রোঞ্জ জেতাটাও এই ৫২ কেজিতে।
জিন্নাতের মতে, এবারের এশিয়ান গেমসে আমার মাধ্যমে বাংলাদেশ যে পদকটি পেয়েছে তা মহান আল্লাহ তায়ালা নিজ হাতেই আমাদেরকে এই পদকটি দিয়েছেন। জানান, ‘১৬ বাউটের খেলা ছিল। সেখানে আমরা ১৫ জন প্রতিযোগী ছিলাম। এতে আমিই একমাত্র বাই পেয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠি। ভালো করেই জানতাম কোয়ার্টারে ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে জিতলেই পদক নিশ্চিত। তাই আগের রাতে ইন্দোনেশিয়ান প্রতিপক্ষের ম্যাচের ভিডিও নিয়ে বিশ্লেষণ করি। পুরোপুরি প্রস্তুত ছিলাম তাকে হারাতে। কিন্তু পরের তিন মাঠে গিয়ে শুনি ওই প্রতিযোগী বেশি ওজনের জন্য ডিসকোয়ালিফাই হয়ে গেছেন। এতে আমার পদক নিশ্চিত হয়ে যায়। বাংলাদেশও পদকের দেখা পায়।’ জিন্নাত বলেন, এতে আমি, দিলদার হাসান দিলু স্যার দু’জনই কাঁদতে থাকি খুশিতে। এরপর যখন আমার স্বামীকে ফোন দেই তখন দেখি আমার চেয়ে উনিই বেশি কাঁদছেন। আর মা-বোন, জা শাশুড়িরা তো আমার সাথে কথা বলার চেয়ে তসবিহ নিয়েই দোয়াতে ব্যস্ত ছিলেন।
এরপরই বাস্তবতায় এলেন জিন্নাত। বলেন, অবশ্যই খেলে জিতে পদক পেলে খুব ভালো লাগত। আমি কিন্তু ইন্দোনেশিয়ার খেলোয়াড়টিকে হারিয়েই পদক জয়ের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত ছিলাম। তবে প্রতিপক্ষ যদি ওজনই ঠিক না রাখতে পারে তাহলে সেটা তারই ব্যর্থতা। ওজন ঠিক রাখার জন্য আমাদের এক ঢোক পানিও হিসাব করে পান করতে হয়।’ সেমিতে জিন্নাতের প্রতিপক্ষ ছিলেন চীনের খেলোয়াড়। ওই ম্যাচে জিতলেই ফাইনালে। সেই ম্যাচে অবশ্য তেমন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেনি। জিন্নাত জানান, ‘উশুতে চীন হলো বিশ্বে এক নম্বর র্যাংকিংধারী দল। এবার তারা উশুতে সাত ইভেন্টের ছয়টিতেই স্বর্ণ জিতেছে। চীনের প্রতিপক্ষের সাথে ম্যাচটি ছিল আমার প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ। সেই ম্যাচের অভিজ্ঞতাই আমি পরের আন্তর্জাতিক আসরে কাজে লাগাব।’
এশিয়ান গেমসে পদক জয়ের মিশন শেষ। এখন আগামী বছর পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত হবে এসএ গেমস। ২০১০ এসএ গেমসে বাংলাদেশ এই উশুতে দু’টি স্বর্ণ ও দু’টি ব্রোঞ্জ জিতেছিল। জিন্নাত জানালেন, আমাদের ফেডারেশন সেক্রেটারি দিলু স্যার বলেছেন এসএ গেমসে চার-পাঁচটি স্বর্ণ জয়ের টার্গেটের কথা। এখন আমাদেরকে যদি বিদেশী কোচের অধীনে লম্বা সময় ধরে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হয় তাহলে এসএ গেমস স্বর্ণ জেতা সম্ভব। দিলু স্যার এসএ গেমসে যে স্বর্ণগুলোর কথা বলেছেন আমিও সেই পদক জয়ের একজন হতে চাই।
এসএ গেমস এবং এশিয়ান গেমসের মতো ইসলামী সলিডারিটি গেমসেও পদক আছে বাংলাদেশের। গত বছর সৌদি আরবের রিয়াদে অনুষ্ঠিত ইসলামী সলিডারিটি গেমসে ব্রোঞ্জ পদক জয় করেন শিখা। সেই গেমসে খেলার কথা ছিল জিন্নাতের। প্রথমে শুনেছিলেন তার ৫২ কেজিতে খেলা আছে। পরে জানলাম আমার ওজন শ্রেণীর খেলা নেই। তাই যাওয়া হয়নি। তবে যেহেতু শিখা এই গেমসে পদক জিতেছেন তাই এখন জিন্নাতও এই তালিকায় নিজের নাম উঠাতে চান।








