মতামত
মতামত। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

চীনের গুয়াংশি অঞ্চলে নবনির্মিত পিংলু খাল (Pinglu Canal) চালু করা হয়েছে। এর ফলে দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ভূখণ্ড সমুদ্রের সাথে সরাসরি যুক্ত হয়েছে। চীনে নদী থেকে সমুদ্র সংযোগকারী আধুনিক নৌপথ প্রকল্প এটিই প্রথম। সুপরিচিত বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ এবং নিউ ইন্টারন্যাশনাল ল্যান্ড-সি ট্রেড করিডোরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে পিংলু খালকে। দীর্ঘ চার বছরের নিপুণ প্রকৌশল ও কঠোর পরিশ্রমের পর গত ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ আনুষ্ঠানিকভাবে খালটি নৌচলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। 
প্রায় ১৩৪.২ কিলোমিটার (৮৩.৪ মাইল) দীর্ঘ এই মানবনির্মিত জলপথটি গুয়াংশির রাজধানী নাননিং শহরের সিচাং নদীকে সরাসরি দক্ষিণের বেইবু উপসাগরের (টনকিন উপসাগর) সাথে সংযুক্ত করেছে। এ খালের প্রধান লক্ষ্য চীনের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের ইউনান, গুইঝৌ, সিচুয়ান এবং চংকিংয়ের মতো ল্যান্ডলকড বা ভূমিবেষ্টিত প্রদেশগুলোর পণ্য সমুদ্রবন্দরে পৌঁছানো। আগে এই অঞ্চলের পণ্য শত শত কিলোমিটার পথ ঘুরে চীনের পূর্ব উপকূলের গুয়াংজু বা সাংহাই সমুদ্রবন্দরে পৌঁছাতে হতো। পিংলু খাল চালুর ফলে সেই দূরত্ব প্রায় ৫৬০ কিলোমিটার (৩৫০ মাইল) কমে গেছে। ফলে চীনের পণ্য এখন স্বল্প সময়ে এবং সাশ্রয়ী উপায়ে সরাসরি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার (ASEAN) বাজারে পৌঁছানো সম্ভব হবে। 
প্রকৌশল এবং অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে পিংলু খালকে ‘শতাব্দীর সেরা প্রকল্প’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। প্রায় ৭২.৭ বিলিয়ন ইউয়ান (১০.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) ব্যয়ে নির্মিত এই নৌপথে পাঁচ হাজার টন ধারণক্ষমতার মালবাহী জাহাজ চলাচল করতে পারবে। খালটিতে বিশ্বের বৃহত্তম পানি-সাশ্রয়ী আধুনিক লক সিস্টেম (Ship Lock) ব্যবহার করা হয়েছে, যা ৬৫ মিটারের পানির স্তরের তারতম্য নিয়ন্ত্রণ করে জাহাজ পারাপার করতে পারে। এই খালের মাধ্যমে লজিস্টিকস ও পরিবহন ব্যয় ১৮ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমবে, যা চীনের বাণিজ্য খাতে প্রতি বছর আনুমানিক ৫.২ বিলিয়ন ইউয়ান (৭২০ মিলিয়ন ডলার) সাশ্রয় করবে। 
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এই প্রকল্পে বন্যপ্রাণীদের পারাপারের জন্য বিশেষ সেতু এবং মাছের যাতায়াতের জন্য আলাদা পথ তৈরি করা হয়েছে। সব মিলিয়ে, পিংলু খাল কেবল চীনের অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহন ব্যবস্থাপনাই বদলে দিচ্ছে না; বরং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সামগ্রিক বাণিজ্য ও বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে নতুন অর্থনৈতিক দুয়ার খুলে দিয়েছে।


ভিয়েতনামের সাথে বাণিজ্য
পিংলু খাল চালুর ফলে ভিয়েতনামের সাথে চীনের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে এক নতুন গতি সঞ্চার হয়েছে। ভিয়েতনামের ঠিক পাশেই অবস্থিত চীনের গুয়াংশি অঞ্চল। এই খালের প্রভাবে দুই দেশের সীমান্ত বাণিজ্যে পরিবর্তন আসছে।  
খালের উদ্বোধনের পর চীনের নাননিং বন্দর থেকে ভিয়েতনামের দক্ষিণ অঞ্চলের কান থো বন্দর পর্যন্ত সরাসরি আন্তর্জাতিক নৌপথ চালু করা হয়েছে। এর ফলে ভিয়েতনামের পণ্যবাহী জাহাজগুলো বেইবু উপসাগর হয়ে সরাসরি চীনের অভ্যন্তরীণ নদী অববাহিকায় এবং চীনের জাহাজগুলো ভিয়েতনামে  যেতে পারছে। ভিয়েতনাম ও চীনের মধ্যকার অধিকাংশ সীমান্ত বাণিজ্য স্থলপথে (যেমন লাং সন-গুয়াংশি সীমান্ত গেট দিয়ে) ট্রাকে করে সম্পন্ন হয়। ফলে স্থল সীমান্তগুলোতে মাইলের পর মাইল যানজটের সৃষ্টি হয়ে ফলমূল বা শাকসবজির মতো পচনশীল পণ্যের ক্ষতি হতো। 
ভিয়েতনাম ও চীনের শিল্প খাত পরস্পর গভীরভাবে জড়িত। ভিয়েতনাম চীন থেকে ভারী যন্ত্রপাতি ও ইন্টারমিডিয়েট টেকনিক্যাল পার্টস আমদানি করে, আর ভিয়েতনামের খনিজ ও কাঁচামাল চীনে যায় প্রসেসিংয়ের জন্য। নতুন খালের মাধ্যমে দুই দেশের শিল্প সরবরাহ চেন অনেক বেশি গতি পেয়েছে। অর্থনৈতিক চিত্র বদলে দিচ্ছে।   
চীন ও আসিয়ান 
পিংলু খাল চালুর ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার (ASEAN)) দেশগুলোর সাথে চীনের বাণিজ্যিক সম্পর্কে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। আসিয়ান চীনের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। 
ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া এবং সিঙ্গাপুরের মতো আসিয়ান দেশগুলো থেকে খনিজ পদার্থ, কাঁচামাল এবং তাজা কৃষিপণ্য খুব দ্রুত ও কম খরচে চীনে পৌঁছতে পারবে। ফলে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর রফতানিকারকরা চীনের ভেতরের অঞ্চলের কোটি কোটি নতুন ভোক্তার এক বিশাল বাজার লুফে নেয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। বিপরীতভাবে চীনের যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তিগত উপাদান এবং কনজিউমার পণ্য সরাসরি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে সরবরাহ করা যাবে। 
বর্তমানে অনেক চীনা প্রতিষ্ঠান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তাদের উৎপাদন কারখানা স্থানান্তর করছে। পিংলু খাল চীনের মূল উৎপাদন খাতের সাথে আসিয়ানের উৎপাদন নেটওয়ার্কের সংযোগ উন্নত করবে। এটি আসিয়ান অঞ্চলকে একটি সাশ্রয়ী ও বৈশ্বিক ম্যানুফ্যাকচারিং হাব হিসেবে আরো শক্তিশালী করে তুলবে।
বাংলাদেশের বৈশ্বিক বাণিজ্য
পিংলু খাল প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বেশ উপকারে আসতে পারে। চীনের অভ্যন্তরীণ জলপথ হলেও চীনের সাথে বাংলাদেশের বিশাল আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে এটি ভৌগোলিক কারণেই বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। 
আমদানিকারকদের জন্য খরচ ও সময় সাশ্রয় : বাংলাদেশ প্রতি বছর চীন থেকে প্রচুর ওভেন ও নিট ফেব্রিকস, তুলা, সুতা, ইলেকট্রনিক্স এবং শিল্পকারখানার ভারী যন্ত্রপাতি আমদানি করে। চীনের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের (যেমন সিচুয়ান বা চংকিং) শিল্পাঞ্চল থেকে এই পণ্যগুলো প্রথমে হাজার কিলোমিটার পথ ঘুরে পূর্ব উপকূলের সাংহাই বা গুয়াংজু বন্দরে নেয়া হতো, তারপর জাহাজে করে বাংলাদেশে আসত। এখন পিংলু খালের কারণে পণ্যগুলো সরাসরি দক্ষিণের বেইবু উপসাগর হয়ে খুব দ্রুত ও কম খরচে চট্টগ্রাম কিংবা মংলা বন্দরে পৌঁছাতে পারবে। এতে পণ্যের লজিস্টিকস খরচ কমবে, যার সুফল বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা পাবেন। 
তৈরী পোশাক খাতের কাঁচামাল দ্রুত সরবরাহ : বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্পের প্রধান চালিকাশক্তি হলো চীন থেকে আসা টেক্সটাইল কাঁচামাল ও রাসায়নিক। আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর কড়া ডেডলাইনের কারণে কাঁচামাল সময়মতো পাওয়া বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত জরুরি। পিংলু খাল চালুর ফলে চীনের অভ্যন্তরীণ অঞ্চলের সাপ্লাই চেইন আরো দ্রুত হওয়ায়, বাংলাদেশী গার্মেন্টস মালিকরা অনেক কম সময়ে বুকিং করা কাঁচামাল হাতে পাবেন। 
বাংলাদেশী পণ্যের নতুন বাজার (রফতানি সুবিধা) : বাংলাদেশ বর্তমানে চীনে চামড়াজাত পণ্য, পাট, কাঁকড়া, কুচে এবং কিছু প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রফতানি করে। পিংলু খাল চীনের বেইবু উপসাগরীয় বন্দরের সক্ষমতা ব্যাপক বাড়িয়ে দিয়েছে। এই রুটের মাধ্যমে বাংলাদেশের রফতানি পণ্য এখন চীনের মূল ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে নতুন ভোক্তার বাজারে আরো সহজে ও সাশ্রয়ী খরচে ঢুকতে পারবে।
আঞ্চলিক লজিস্টিকস হাবের সুবিধা : পিংলু খাল চীনের ‘নিউ ইন্টারন্যাশনাল ল্যান্ড-সি ট্রেড করিডোর’-এর অংশ। বাংলাদেশ যদি ভবিষ্যতে আসিয়ানের কোনো দেশের সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করে বা আঞ্চলিক বাণিজ্যে যুক্ত হয়, তবে টনকিন উপসাগরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই নতুন নৌ-নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও চীনের সাথে সরাসরি ও সস্তা সমুদ্র-বাণিজ্যের সুবিধা নিতে পারবে।  
চীন থেকে বাংলাদেশে সমুদ্রপথে পণ্য আসতে সাধারণত ১৫ থেকে ৪৫ দিন সময় লাগে (রুট ও কাস্টমস ভেদে)। পিংলু খালের কারণে চীনের অভ্যন্তরীণ অঞ্চলের পণ্য দ্রুত শিপমেন্ট হওয়ায় বাংলাদেশের আমদানিকারকদের জন্য চংকিং বা নাননিং অঞ্চলের পণ্য পৌঁছানোর সময় পাঁচ দিন পর্যন্ত কমতে পারে।
চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের ওপর প্রভাব  
বাংলাদেশ সরকার মংলা বন্দরের আধুনিকীকরণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির যে মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, তার সাথে এই রুটটি চমৎকার সামঞ্জস্যপূর্ণ। যেহেতু মংলা বন্দর দিয়ে মূলত দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের (যেমন পোশাক ও পাট শিল্প হাব) কাঁচামাল হ্যান্ডলিং বাড়ে, সেহেতু চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে পিংলু খাল হয়ে আসা সাশ্রয়ী কাঁচামাল সরাসরি মংলা বন্দরে খালাস করা যাবে। এটি মংলা বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেবে। যখন কোনো রুটে জাহাজের চলাচল এবং পণ্যের প্রবাহ বাড়ে, তখন স্বাভাবিকভাবেই শিপিং কোম্পানিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ে। এর ফলে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরমুখী কনটেইনারগুলোর ফ্রেট চার্জ বা জাহাজের ভাড়া আগের চেয়ে বেশ খানিকটা কমে আসতে পারে, যা বাংলাদেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যে বড় সাশ্রয়।  
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব ও গ্রন্থকার