মতামত
মতামত। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

খনার বচনে আছে, ‘কলা রুয়ে না কেটো পাত, তাতেই কাপড়, তাতেই ভাত’। দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীকে উপযুক্ত মানসম্পন্ন শিক্ষায় শিক্ষিত করে এবং পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে সুস্থ সবল হিসেবে গড়ে তুলতে না পারলে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হবে না। অধঃপতিত মানসম্পন্ন শিক্ষায় শিক্ষিত জনগোষ্ঠী এবং সুচিকিৎসা-সুষম খাদ্য ও পুষ্টিহীন অসুস্থ জনগোষ্ঠী দ্বারা দেশ, জাতি ও সমাজের সার্বিক উন্নতি সম্ভব নয়। সম্প্রতি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের কয়েকটি উদ্যোগ পরিদর্শনে গিয়ে যা দেখা গেল, রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে যা বোঝা গেল, কলাগাছ রোয়া হচ্ছে ঠিকই; কিন্তু তার পাতা কাটা চলছে অবিরত। ফলে তাতে কাপড় ও ভাত মেলার সম্ভাবনা ও সুযোগ প্রাপ্তি দিন দিন সুদূর পরাহত হচ্ছে।
শিক্ষাদানে শিক্ষক ও শিক্ষা প্রশাসন শিক্ষার মানোন্নয়নে মনোযোগ এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন না করলে শিক্ষা খাতে বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনায় বাড়তি ব্যয়ের কসাইয়ের সামনাসামনি হতে হচ্ছে বা হবে অভিভাবক ও খোদ শিক্ষার্থীদের। যেমন, যোগাযোগব্যবস্থা ভালো করার নামে সড়ক ও সেতু নির্মাণে অর্থের অপচয় এবং দুর্নীতির দায় বেড়েছে ঠিকই; কিন্তু সেই সেতু ও সড়ক ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়েনি সবার। সক্ষমতা বেড়েছে সিন্ডিকেটের, ফড়িয়াদের, যারা সব ক্ষেত্রে কৃষি বা খাদ্যপণ্যের পরিবহনের সহজ সুযোগ নিয়ে মধ্যস্বত্বভোগীরূপে আবির্ভূত হচ্ছে। একদিকে উৎপাদনকারী ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না, অন্যদিকে ভোক্তা সেই পণ্য চড়া দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছে। পাঁচ টাকার ব্যয় ২৫ টাকা দেখিয়ে বড় বড় সড়ক সেতু ও ভবন নির্মাণ করে সেগুলো যারা ব্যবহার করবে, তাদের আর্থিক ক্রয়ক্ষমতা না বাড়ায় সঞ্চয় ও সংসার ভাঙছে তাদের। 
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টির নীতি-সহায়তা না মেলায় অনিবার্যভাবে বিশাল বড় অবকাঠামোর রেট অফ রিটার্ন বাড়ছে না। মাত্র তিন বছর আগে সাতক্ষীরার শ্যামনগরের এলজিইডি নির্মিত একটি গ্রামীণ সড়ক ইতোমধ্যে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। যাদের দুর্নীতির জন্য এটি হয়েছে, তাদের না ধরে বা বিচার বা অর্থ উদ্ধারের ব্যবস্থা না করে আবার সেই ভাঙা সড়ক মেরামতের জন্য মোটা অঙ্কের প্রাক্কলন পাস করা হয়েছে। কাজ বুঝে নেয়ার বা তদারকি করার পদ্ধতি প্রয়োগ এবং ম্যান বিহাইন্ড দ্য প্লাউরা বর্ণচোরাদের মতো ভোল পাল্টাতে শুরু করেছে। দেখা যাচ্ছে, অর্থাৎ একই কায়দায় অর্থ আত্মসাৎ, দুর্নীতির বন্দোবস্ত চলছে। শিক্ষায় বশংবদ পুরনো স্বভাব, খাসলত, দুর্বল ও দলীয় প্রশাসনিক ও অব্যবস্থাপনা বহাল তবিয়তে থাকছে, প্রবলভাবে ভেঙে পড়ছে শিক্ষাব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা। 
একসময় ঘটা করে প্রচার করা হতো কমিউনিটি ক্লিনিকের কথা। কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো এখন যথাস্থানে যথাযথভাবে ভূমিকা পালন করছে না, অথচ সেখানে দলীয় বিবেচনায় বিপুল সংখ্যক কর্মী নিয়োগ করে এখনো তাদের বেতন-ভাতা দিতে হচ্ছে। সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালগুলো থেকে এবারের বাজেটে বেশি বরাদ্দ মিললেও স্বাস্থ্য খাতে বেশি বরাদ্দের বিপরীতে চিকিৎসকের কাছ থেকে সুচিকিৎসা, হাসপাতালে ল্যাব ফেসিলিটিজের ব্যবহার, এমনকি ওষুধপত্র পাওয়া যাচ্ছে না। ফেরার পথে ফুড পয়জনিংয়ের সুবাদে প্রচণ্ড ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে আমাকে বিভাগীয় শহর খুলনার একটি বেসরকারি হাসপাতালে দুই দিন দুই রাত স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে দ্বারস্থ হতে হয়েছিল। প্রতি সোমবার আমার এই কলাম লেখায় বহুদিন পর এই প্রথম ছেদ পড়ে। দুঃখ সেখানে তো ছিলই, বেশি দুঃখের কারণ ছিল  সরকারি হাসপাতালে তাৎক্ষণিকভাবে সিট পাওয়া যায়নি এবং চিকিৎসকদের পাওয়া অসম্ভব ছিল। বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসাসেবা পেয়ে সুস্থ হয়ে উঠি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সুব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয়দের বহনযোগ্য খরচে চিকিৎসাসেবা দেয়ার আয়োজন দেখে ভালো লাগল। বিপুল স্বাস্থ্যসেবা প্রার্থীর মতো আমিও বেসরকারি খাতের স্বাস্থ্যসেবা পেয়ে সন্তোষবোধ করলাম। কিন্তু প্রশ্ন থেকে গেল, ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই হাসপাতালকে যদি সরকারি হাসপাতালের মতো নীতি-সহায়তা দেয়া যেত, তাহলে আরো অধিক স্বাস্থ্যসেবা প্রার্থী উপকৃত হতে পারত কি না, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা অর্থবহ হতে পারত কি না। 
শুধু সবল সক্ষম সর্বভুক ভোক্তা ভজনের দ্বারা নয়, তৃণমূল পর্যায়ে সঞ্চয়ের অভ্যাস বাড়িয়ে, বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করে দেশের অর্থনীতিকে স্বয়ম্ভর করার মন্ত্র মানতে ও মানাতে মধ্যস্বত্বভোগীর উপদ্রব এড়িয়ে, প্রতারণা-প্রবঞ্চনার পথ মাড়িয়ে, অপব্যয়-অপচয় রোধে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়ার বিকল্প নেই।
মানবসম্পদ সৃষ্টি, গণসুস্থতা আর আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠার সরোবরে উন্নয়ন অর্থনীতির ফুল বিকশিত হয়। যে সমাজে শিক্ষকতা, চিকিৎসা আর আইন ব্যবসায় মহৎ পেশা হিসেবে বিবেচনার সুযোগ দিনে দিনে তিরোহিত হয়, সে সমাজে বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ ও সমাজসেবার আদর্শ প্রতিষ্ঠা অসম্ভব হয়ে ওঠে, সেখানে সামাজিক সুবিচার ও গণকল্যাণ আকাঙ্ক্ষায় চির ধরতে বাধ্য। সুশাসন ও জবাবদিহির পরিবেশ পয়মাল হতে হতে সমূহ সর্বনাশও সহনশীল হয়ে ওঠে। পরীক্ষায় উত্তরণনির্ভর বিদ্যাচর্চায় বাস্তব শিক্ষার লেশমাত্র যে থাকে না, সে উপলব্ধি করতে রূঢ় বাস্তবের মোকাবেলা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় না। সার্টিফিকেটধারী শিক্ষিতের সংখ্যা বাড়লেই দেশে শিক্ষার উন্নতিসহ জনসম্পদ বৃদ্ধি ঘটে না; বরং তাতে স্বল্পশিক্ষিত বেকারের বিকারজনিত সমস্যারই উদ্ভব ঘটে। অসম্পন্ন শিক্ষা সমাধান আনে না; বরং সমস্যা বাড়ায়। শিক্ষা খাতে জিডিপির সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ মিললেও শিক্ষা জনসাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে কি না, দেশের অধিকাংশ অধিবাস যে পল্লীতে সেই পল্লীর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে শহরের হাইব্রিড বিদ্যাচর্চার ব্যবধান বাড়ছে কি না, সে বিচার-বিবেচনা আবশ্যক। প্রাথমিক জুনিয়র মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফলে শহর আর গ্রামের পাসের হারের ব্যাপক ব্যবধান আসন্ন সমাজে ব্যাপক বিচ্যুতির ফাটল স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। যে শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে পড়ানোর জন্য রাষ্ট্র কর্তৃক জনগণের করের টাকায় বেতন পান, তার বিনিময়ে তার যে দায়িত্ব পালনের কথা, তা পালন না করে বরং তার শিক্ষকতার পরিচয়কে পুঁজি করে অত্যধিক পারিশ্রমিকে গৃহশিক্ষকতা তথা কোচিংয়ের মাধ্যমে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহারই শুধু করেন না, তার দায়িত্বহীনতায় গণশিক্ষার ব্যক্তি ব্যয় বেড়েই চলছে। সমাজের কাছে যে সম্মান ও সমীহ তার প্রাপ্য, তা তার এই ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গির সাথে দ্রবীভূত হয়ে যায়। অথচ এই একই সমাজে এই কিছু দিন আগেও এমনকি ঔপনিবেশিক পরাধীন পরিবেশেও স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে (তখন সরকারি অনুদান ছিল যৎসামান্য) শিক্ষাদান ছিল নিঃস্বার্থ জ্ঞানদানের বিষয় এবং আত্মত্যাগের আদর্শে ভাস্বর। আর সে সুবাদে শিক্ষক পেতেন সমাজের সর্বোচ্চ সমীহ ও সম্মান। শিক্ষক দায়িত্ববোধের আদর্শ হতেন শিক্ষার্থীদের। শিক্ষার্থীদের মনে জ্ঞানের আলো জ্বালানোকে ব্রত মনে করতেন শিক্ষকরা। আর আজ শিক্ষকের মনের দৈন্য অধিক অর্থ উপার্জনের অভীপ্সায় অন্তর্লীন। চিকিৎসাবিদ্যার প্রধান লক্ষ্যই যেখানে হওয়ার কথা দুস্থ-পীড়িতজনকে রোগমুক্তির সন্ধান দেয়া, সেখানে স্রেফ ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি কেন মুখ্য হয়ে দাঁড়াবে এ মহৎ পেশায়। অসুস্থ ব্যক্তির উপযুক্ত চিকিৎসা পাওয়া যেখানে মৌলিক অধিকার, সেখানে রাষ্ট্রীয় চিকিৎসাব্যবস্থা এতই নাজুক ও অবহেলায় ন্যুব্জ যে, ক্লিনিকের কসাইয়ের সামনে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে অগণিত অসহায় অসুস্থ মানুষকে। এনজিও দ্বারা কমিউনিটি চিকিৎসাব্যবস্থা চালু করা হয়েছে— সেখানে হাসিমুখে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে নবীন-প্রবীণ স্বাস্থ্যকর্মী। কিন্তু সরকার পরিচালিত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে কেন সেবার মান আদৌ উন্নত হবে না; যদিও সেখানে বাজেটের বিপুল বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় দেখানো হয়ে থাকে। জনগণের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য বাজেটে বিপুল ব্যয় বরাদ্দ দেখানো হবে, আর সেই সেবা পাওয়ার জন্য আবার বাড়তি ব্যয়ের বোঝা কেন বহন করতে হবে রাষ্ট্রের নাগরিককে। অন্যায়-অবিচারের প্রতিকার প্রার্থীর পক্ষাবলম্বনের জন্য আইনজীবী হবেন আসামি-বাদি-বিবাদির বন্ধু। আইনের মারপ্যাঁচে নিজের ন্যায্য দাবি যাতে হারিয়ে না যায়, সে সহায়তা চেয়েই তো অসহায় অশিক্ষিত মক্কেল আসে আইনজীবীর দ্বারে। নিজের পেশাগত দায়িত্ব ও মূল্যবোধকে জলাঞ্জলি দিয়ে স্রেফ ব্যবসায়িক দৃষ্টিতে বাদি-বিবাদি উভয় পক্ষের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অনুযোগ বিচারপ্রার্থীর বোবাকান্নার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। 
দেশ ও সমাজের স্বার্থকে থোড়াই কেয়ার করে অনেকে বিদেশী বহুমুখী কোম্পানির অনেক অন্যায্য দাবির সপক্ষে লবিং করেন স্রেফ পেশাগত ও ব্যবসায়িক স্বার্থে। ‘সেবা পরম ধর্ম’ কিংবা ‘সততা সর্বোত্তম পন্থা’- এসব মহাজনবাক্য কি শুধু নীতি-কাহিনীতে ঠাঁই পাবে, বাস্তবে তাদের সাক্ষাৎ মিলবে না? 
লেখক : সাবেক সচিব, উন্নয়ন অর্থনীতির বিশ্লেষক