মতামত
মতামত। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

‘বিদ্যালয়’ এর আগে ‘বিশ্ব’ যোগ করে হয় ‘বিশ্ববিদ্যালয়’। এর মানে হলো— এই বিদ্যালয়ে যেসব উদ্ভাবন হয়, চর্চা হয়, গবেষণা হয় সেগুলো বিশ্বমানের। বিশ্ববিদ্যালয় মানে বিশ্ববিদ্যার মিলনমেলা। কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থা কী? এগুলো পরিণত হয়েছে একরকম সনদ দেয়ার কারখানায়। সনদ নেয়ার পর সেই সনদ শিক্ষার্থীদের কী কাজে লাগবে— সেগুলো নিয়ে খুব একটা মাথাব্যথা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কার্যকর গবেষণা নেই বললেই চলে। অথচ সমাজকে কিছু দেয়ার দায় থাকে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের। কেবল বিশ্ববিদ্যালয় নয়, ছোট-খাটো বিদ্যালয়গুলোও জনগণের বিনিয়োগের জায়গা। এখান থেকে কিছু না কিছু আউটপুট আসতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের আউটপুট হলো— সৃষ্টিশীল জ্ঞান, বিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের গভীর গবেষণা এবং সমস্যা সমাধানের বাস্তব উদ্ভাবন। এসব আউটপুট দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও দর্শনের সঙ্কট সমাধান করার কথা। বাংলাদেশে কি সেটি হচ্ছে? শিক্ষার্থীদের কি আউটপুট দেয়ার মতো করে গড়ে তুলতে পারছেন শিক্ষকরা? 
যারা শিক্ষক হচ্ছেন, তারাও তো এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেছেন। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আনুগত্যে যারা এগিয়ে থাকেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তারা উন্নতি করেন, কয়েকটি প্রথাগত কাগজের বাধ্যবাধকতা শেষে অধ্যাপক হন। বিশ্ববিদ্যালয়-গুলোতে কার্যকর গবেষণা দেখা যায় খুব কম।
কার্যকর গবেষণা করতে হলে চাই গবেষণার সুযোগ ও যথাযথ পরিবেশ। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের তথ্য বলছে, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বার্ষিক বাজেটের মাত্র দেড় থেকে ২ শতাংশ বরাদ্দ থাকে গবেষণায়। বিশ্বমানের কোনো গবেষণা করতে গেলে এই বাজেট অতিশয় নগণ্য।
উন্নত বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার অর্থের বড় অংশ আসে বেসরকরি খাত থেকে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের পণ্যের মান বাড়াতে বা সমস্যার সমাধানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার জন্য অর্থায়ন করে। বাংলাদেশে শিল্প খাতের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্র্যাক্টিকেলের চাইতে থিউরির গুরুত্ব বাড়াবাড়িরকম বেশি। সম্ভবত এসব কারণে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আউটপুট আসে না। গবেষণাহীন বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান তৈরি করতে না পারলে শূন্যতা তৈরি হয়।
আমাদের এ শূন্যতায় জায়গা করে নিচ্ছে অপরাধ। পুলিশ ও অপরাধ তদন্ত বিভাগগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে কিশোর গ্যাং কালচার, সংঘবদ্ধ সাইবার ক্রাইম, আর্থিক প্রতারণা এবং মাদক বাণিজ্যের সাথে যুক্ত অপরাধীদের বিশাল অংশ তরুণ। এদের বেশির ভাগ কোনো না কোনো কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্রপআউট। অথবা নিয়মিত শিক্ষার্থী; কিন্তু শিক্ষাজীবন নিয়ে হতাশ।
এসব তথ্য আমরা নিয়মিত পাই। কিন্তু এগুলোর মনস্তত্ত্ব খোঁজ করতে যাই না। হয় না স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা। একজন শিক্ষার্থী কিভাবে সাধারণ শিক্ষার্থী থেকে গ্যাংস্টার হয়ে যাচ্ছে? ক্যাম্পাসগুলোতে কোন ধরনের শূন্যতায় ক্রিমিনাল সিন্ডিকেট জায়গা করে দিচ্ছে— এগুলো নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বা অপরাধবিজ্ঞান বিভাগ থেকে উচ্চমানের গবেষণা হতে পারত। 
হতাশাবাদী কেউ হয়তো বলতে পারেন, উন্নত বিশ্বের উদাহরণ দেখিয়ে লাভ নেই! আমাদের দেশে এসব সম্ভব নয়! কেন সম্ভব হবে না? আমাদের অনেক শিক্ষার্থী তো উন্নত বিশ্বে গিয়ে পড়ালেখা করছেন, ভালো গবেষণা করছেন। কেবল দেশের বাইরে কেন, ভেতরেও আছে ভালো উদাহরণ। বাংলাদেশের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা হচ্ছে উল্লেখ করার মতো। তারাও কাজ করছেন সীমিত বাজেটে। কিন্তু পুরো জাতির জন্য আউটপুট দিয়ে যাচ্ছেন।
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আউটপুট দেয়ার মতো পরিবেশ আছে। ওগুলোতে নিয়মিত গবেষণা হচ্ছে, নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন হচ্ছে। কিন্তু ওইসব উদ্ভাবনের খোঁজ আমরা কম রাখি। যে কৃষক নতুন উদ্ভাবন হওয়া কোন বীজ রোপণ করছেন, তিনি জানেন না এ বীজের পেছনে কাজ করা বিজ্ঞানীর নাম, গবেষকদের নাম। অথচ এই বিজ্ঞানী ও গবেষকরা মানুষের ‘দানাপানি’র জোগান দিতে কাজ করছেন।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা উদ্ভাবন করেছেন শিং মাছের সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স। এতে স্ত্রী শিং মাছ ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ বাড়ে। তারা নিয়ে এসেছেন ক্যান্সার প্রতিরোধী উপাদানে সমৃদ্ধ ‘বাউ মিষ্টি আলু-৫’। এই আলু ডায়াবেটিস রোগীর জন্যও নিরাপদ। কীটতত্ত্বের গবেষকরা ফসলের ক্ষতিকারক সাদা মাছি শনাক্ত করেছেন। অ্যানিম্যাল সায়েন্সের এক বিজ্ঞানী ছাগলের খাবারের প্রোটিন ডায়েট বের করেছেন। এতে উচ্চ প্রোটিনে বাচ্চার মৃত্যুহার কমেছে। তৈরি হয়েছে বোয়ার ও ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের সংকরায়নে দ্বিগুণ গোশত উৎপাদনী নতুন জাত।
কৃষি প্রকৌশলীরা তৈরি করেছেন ‘ই-নোজ’ আম না কেটে না খেয়ে ইলেকট্রনিক প্রযুক্তিতে এর মিষ্টি ও পচনের সময় পরিমাপের যন্ত্র! আবার আমের আঁটি থেকে উদ্ভাবন হয়েছে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল, যা অ্যান্টিবায়োটিকের বিকল্প হিসেবে পোলট্রি শিল্পে বিপ্লব নিয়ে আসতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে ফসল তৈরির জন্য উদ্ভাবন হয়েছে উন্নত ‘পলি হাউজ’। গবাদিপশুর গর্ভপাত রোধে উদ্ভাবন হয়েছে কার্যকরী ‘ব্রুসেলোসিস ভ্যাকসিন’।
সারা বছর এখন রঙিন সবজি খেতে পাচ্ছি। গ্রীষ্মেও উৎপাদন হচ্ছে পেঁয়াজ। দক্ষিণের নোনা পানিতে দুলছে সহনশীল ধানের শীষ। এসবের পেছনে আছে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা, বিজ্ঞানীদের ঘাম। তারা পর্দার আড়ালে থেকে কাজ করেন। তাদের অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগিয়ে ঘাম ঝরিয়ে সজীব করে তুলেন কৃষক। তারাও নিভৃত— মাঠে কাজ করেন, রোদে পুড়েন। বাংলাদেশের মানুষের জন্য ফসল ফলান।
কৃষক ও কৃষি এখন হুমকিতে। নগরায়ন হচ্ছে, বাড়ছে আবাসনব্যবস্থা। প্রতি বছর হারিয়ে যাচ্ছে ০.৫ থেকে ১ শতাংশ কৃষিজমি। ইট তৈরি করতে আবাদি জমি থেকে তুলে নেয়া হচ্ছে উর্বর মাটি। আমরা কি তাহলে কৃষি ছেড়ে শিল্পের দিকে রওনা করেছি? 
শিল্পের দিকে এগিয়ে যাওয়া মন্দ কিছু নয়। কিন্তু কতটা যেতে হবে, তা বিবেচনায় রাখতে পারলে আরো ভালো। কাপড়ের ব্যবসায় আমাদের সাফল্য আছে। কিন্তু কাপড় উৎপাদনে কি আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ? টেক্সটাইলের সুতা ও তুলার বড় অংশ আমদানি করতে হয়। বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতিতে খনিজসম্পদ তেমন কী আছে? লোহা নেই, তেলের খনি নেই। গ্যাস আছে, তবে মজুদ কতটা আছে? ভারী শিল্পের কাঁচামালের অভাব আছে আমাদের। এত এত নেই, আর অভাব যেখানে, সেখানে কৃষিকে কি ‘বাদ’ দিয়ে দেয়া যাবে? আসলে কৃষি ছাড়া আমাদের জন্য বিকল্প পথ খোলা নেই। সেটি আমরা জানি এবং বুঝি। তারপরও কার্যকর নীতি ঠিক করতে পারছি না।
অবহেলা, অনাদরের পরও কৃষকরা এক দিনের জন্যও বসে থাকেন না। তারা কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ঠিকমতো সাড়া পাচ্ছেন না। সাড়া পাওয়া তো দূরের কথা, মানসম্পন্ন বীজের সরবরাহও পাচ্ছেন না কৃষক। বিএডিসির বীজের মান নিয়ে কৃষকের অভিযোগের শেষ নেই; প্রাইভেট কোম্পানির নিম্নমানের বীজ চড়া দামে কিনে প্রতারিত হচ্ছেন। সারের মৌসুমে হাহাকার করতে হয় তাদের।
ঝড়-বাদল, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি— সব দুর্যোগ মোকাবেলা করতে হয় কৃষকদের। ফসলের ঠিকঠাক দাম না পেয়ে রাস্তায় ধান ঢেলে প্রতিবাদও জানাতে হয়। তাদের চাহিদা খুব বেশি নয়— সময়মতো ভালো বীজ, ন্যায্যমূল্যে সার আর উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য। এ সামান্য সুবিধা পেলে পুরো জাতির খাবারের ভার তুলে নিতে প্রস্তুত তারা।
আমাদের জাতীয় অবহেলার ইতিহাস দীর্ঘ। একসময় পাট ছিল ‘সোনালি আঁশ’, সেই পাট এখন ধ্বংসের মুখে। রেশম চাষ উন্নত ও আধুনিকায়ন করার গরজ নেই! অথচ একটু নজর দিলে পাট ও রেশম থেকে বিলিয়ন ডলারের রফতানি সম্ভব। আম, কাঁঠালের মতো মৌসুমি ফল রফতানি করতে পারলে বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্কট অনেকটা কেটে যেত।
আসলে আমাদের সঙ্কট শুধু অর্থের না। মূল সঙ্কট দৃষ্টিভঙ্গিতে, নীতি ও পরিকল্পনায়। আমরা সম্ভাবনা কাজে লাগাতে জানি না। সম্ভাবনাকে কদর করতে না জানলে, টেকসই উন্নয়নও সম্ভব নয়।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত
smmoshahid@gmail.com