
রফিকুল হায়দার ফরহাদ
বিশ^ ক্রীড়াঙ্গনে চীনের দাপট। অলিম্পিক গেমসে তারা থাকে পদক জয়ে সেরাদের লড়াইয়ে। এশিয়ান গেসসেও তাই। এই দেশটি সারা বিশ্বে তাদের কোচ সরবরাহ করে। অথচ সেই চীনের টেনিসে চলছে বাংলাদেশী কোচদের দাপট। এ পর্যন্ত ৩০-৪০ জন বাংলাদেশী কোচ কাজ করেছেন চীনে। আর তা দেশটির টেনিসের উন্নয়নে। তথ্য দেন বাংলাদেশী কোচ আখতার হোসেন। চীনের টেনিসে বিশাল অবদান এই আখতারের। ২০২৪ প্যারিস অলিম্পিকে টেনিসের নারী এককে স্বর্ণ জিতেছিলেন ঝ্যাং কিনওয়েন। তাকে টেনিসে হাতে খড়ি দিয়েছেন এই আখতার। আখতারেরই ভাগ্নে এম ডি রোমান হোসেন। তিনি চীনে হাইনানে টেনিস অ্যাকাডেমিতে কোচিং করাচ্ছেন। তার অধীনে ২০ জন খেলোয়াড় প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। তাদের বয়সসীমা অনূর্ধ্ব-৮ থেকে সিনিয়র পর্যন্ত।
আখতার জানান, ‘আমি ২০০৫ সালে চীনে আসি। বাংলাদেশে থাকাকালীন আমি ২০০৩ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ডেভিস কাপে অংশ নিয়েছিলাম। জাতীয় পর্যায়ে অনূর্ধ্ব-১৪ এবং অনূর্ধ্ব-১৬ বিভাগে শিরোপা জিতেছিলাম। এ ছাড়া আমি পাকিস্তানে আইটিএফ টুর্নামেন্ট এবং দেশে আয়োজিত বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় খেলেছি। ছিলাম বিকেএসপির ছাত্র। সেখান থেকে ‘সেরা খেলোয়াড়’-এর পুরস্কারও পেয়েছি।’
চীনে ইউরোপ, দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা অনেক বিদেশী কোচদের সাথে পাল্লা দিয়ে টেনিসে কোচিং করাচ্ছেন বাংলাদেশীরা। আখতার তথ্য দেন, ‘পুরো চীনজুড়ে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ জন বাংলাদেশী কোচ কর্মরত আছেন।’ এরপর গর্বের সাথেই উল্লেখ্য করেন, আমি ঝ্যাং কিনওয়েনকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি, যিনি প্যারিস অলিম্পিকে স্বর্ণপদক জিতেছেন এবং অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের ফাইনালে পৌঁছেছেন।’ যোগ করেন, আমি এমন আরো কয়েকজন চীনা খেলোয়াড়কেও প্রশিক্ষণ দিয়েছি যারা এখন দারুণ খেলছে এবং ডব্লিউটিএ র্যাংকিংয়ের শীর্ষ ২০০-এর মধ্যে অবস্থান করছে।
বর্তমানে চীনে আরটিজি টেনিস ক্লাব গড়েছেন আখতার। তা অন্যদের নিয়ে। বাংলাদেশেরই অপর কোচ সুকুমার রায় এই অ্যাকাডেমিতে কাজ করছেন তার সাথে। আখতার অবশ্য এখন এখন আর ঝ্যাং কিনওয়েনের সাথে কাজ করছেন না। জানান, ‘আমি এখন আমার নিজের ব্যবসা নিয়েই পুরোপুরি ব্যস্ত। তাই ঝ্যাং কিনওয়েনের সাথে আর নেই।’
বাংলাদেশ থেকে বিশেষ বৃত্তি নিয়ে চীনে যান আখতার। এরপর ২০১০ সালে বেইজিংয়ের পোর্টল হুইলস অ্যাকাডেমিতে চাকরি নেন। সেখানেই ঝ্যাং কিনওয়েন ভর্তি হন ২০১৩ সালে। এই অ্যাকাডেমিতে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ছিলেন ঝ্যাং কিনওয়েন। এই অ্যাকাডেমিকে বিখ্যাত কার্লোস রদ্রিগেজের মতো সাবেক টেনিস তারকা সিনিয়রদের কোচিং করাতেন। আর জুনিয়রদের কোচিং করানোর দায়িত্ব ছিল আখতারের। ফলে ঝ্যাং কিনওয়েন ছিলেন আখতারের অধীনেই। যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত অরেঞ্জ বল রেডি হার্ড টুর্নামেন্টে ২০১৪, ২০১৫ ও ২০১৬ সালে ঝ্যাং কিনওয়েনকে নিয়ে যান আখতার। কিন ওয়েন প্রথমবার সেমিফাইনালে, পরের বার কোয়ার্টার ফাইনালে এবং শেষবার ফাইনালে উঠেন। এর পরপরই বড় আসরে নিজের সরব উপস্থিতি জানান দেন ঝ্যাং কিনওয়েন। ২০১৯ সালে ফ্রেঞ্চ ওপেন ও ইউএস ওপেনের সেমিতে উঠেন। এরপর প্যারিস অলিম্পিকে স্বর্ণ জয়।
এই আখতারের হাত ধরেই চীনে কোচিং করাতে গেছেন জামালপুরের ছেলে রোমান। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা বিকেএসপিতে ভর্তি রোমান। এরপর বাংলাদেশে সাফল্যের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক আসরে একের পর এক সাফল্য। ২০১৭-১৮ সালে অনূর্ধ্ব-১৩ বিভাগে এশিয়ার ১৩ নম্বর খেলোয়াড় ছিলেন। সে বছরই অনূর্ধ্ব-১৪ এটিএফএ নেপালে অনুষ্ঠিত একক ও ডাবলসে চ্যাম্পিয়ন হন রোমান। দ্বৈতে তার সাথী ছিলেন জুবায়ের উৎস ও ফরহাদ ইসলাম। এ ছাড়া অনূর্ধ্ব-১২ বিভাগে ডেভিস কাপ খেলেছেন। চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন একক ও ডাবলসে। উল্লেখ্য, ডেভিস কাপ হলো টেনিসের বিশ্বকাপ। আর রোমান খেলেছেন ডেভিস কাপের জুনিয়র বিভাগে। অর্থাৎ জুনিয়র বিশ্বকাপে। এরপর তিনি টেনিস কোচিংয়ের আইটিএফ লেভেল ওয়ান কোর্স করেন। পরবর্তীতে চাকরি নেন চীনের হাইনানে টেনিস অ্যাকাডেমিতে। রোমানের দেয়া তথ্য, চীনে আমার বেতন দেড় লাখ টাকার মতো।
চীনে কোচিং করালেও ক’দিন আগে বাংলাদেশে আসেন রোমান। তা মরহুম শোভন জামালী টেনিস খেলতে। এরপর আবার ফিরে যাবেন কর্মস্থলে। রোমান জানান, আমার পক্ষে এখন আর সিরিয়াসলি খেলা সম্ভব নয়। কারন আমি কোচিং করাচ্ছি। কোচিং আর খেলা তো এক সাথে চালানো যায় না।







