নেহা বোরা
পুলিশের বাধা ও আটকের মুখেও বিক্ষোভ চালিয়ে যেতে অটল নেহা বোরা। সংগৃহীত

আটক, মুক্তি, আবারো বিক্ষোভে ফেরা—দিল্লিতে কথিত নির্বাচনী অনিয়মের প্রতিবাদে আন্দোলনকারীদের এই ধারাবাহিক উপস্থিতির মধ্যে আলোচনায় উঠে এসেছেন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) সভাপতি নেহা বোরা। পুলিশের বাধা ও আটকের মুখেও বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি আন্দোলনকারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্দীপনা তৈরি করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বিক্ষোভে অংশ নেওয়া, পুলিশের বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়া এবং আটক অবস্থায় বক্তব্য দেয়ার ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে।

Advertisement

রোববার দিল্লির কেন্দ্রীয় এলাকায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে অংশ নিতে গিয়ে নেহা বোরা আবারো আটক হন। যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের ওপর বিধিনিষেধ থাকায় আন্দোলনকারীরা রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে জড়ো হন। শত শত মানুষ বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে প্রতিবাদে অংশ নেন। পরে কনট প্লেস এলাকায় পৌঁছালে পুলিশ নেহাসহ কয়েকজনকে আটক করে।

আটক হওয়ার পর পুলিশ বাসের ভেতর থেকেই ইনস্টাগ্রামে সরাসরি বক্তব্য দেন নেহা। সেখানে আটক ব্যক্তিদের গাদাগাদি করে রাখার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, বাসের ভেতরে শ্বাস নেয়ারও পর্যাপ্ত জায়গা নেই। আটক রাখার বাসগুলোকে কার্যত কারাগারে পরিণত করা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি পুনর্ব্যক্ত করে নেহা প্রশ্ন করেন, একজন নির্বাচন কমিশনারকে রক্ষা করতে এত বলপ্রয়োগ কেন? নির্বাচন কমিশন অবশ্য পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ধারাবাহিকভাবে অস্বীকার করে আসছে।

বাধা পেরিয়ে প্রতিবাদে ফেরার প্রত্যয়

শনিবার যন্তর মন্তরে প্রবেশে বাধা পেয়ে নেহা বিক্ষোভকারীদের প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে দিল্লি হাট এলাকায় পুনরায় একত্র হওয়ার আহ্বান জানান। পরে সেখানে আটক হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, ‘আমি আটক। আন্দোলন নয়।’

রোববারও তাকে পুলিশের বাধা এড়িয়ে কনট প্লেস এলাকায় পৌঁছানোর চেষ্টা করতে দেখা যায়। তার এই তৎপরতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে। অনেক তরুণ অনুসারী আটকের পরও বারবার প্রতিবাদে ফিরে আসার দৃঢ়তার প্রশংসা করেছেন। তাদের কেউ কেউ লিখেছেন, বাধা যতই আসুক, নেহাকে আবারো আন্দোলনের মাঠে দেখা যাচ্ছে।

তবে নেহা নিজে এই ধারাবাহিকতার ব্যাখ্যায় শুধু ব্যক্তিগত সাহসের কথা বলেননি; বরং মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া আশা ও প্রতিবাদী মনোভাবের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। সম্প্রতি রয়টার্সকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘ভয় অবশ্যই সংক্রামক। কিন্তু আশাও সংক্রামক।’

২৯ বছর বয়সী নেহা জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড অ্যাস্থেটিকসে গবেষণার পাশাপাশি নাট্যচর্চার সঙ্গেও যুক্ত। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় নাট্যদলে যোগ দেয়ার অভিজ্ঞতা তার চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রভাব ফেলেছে বলে জানিয়েছেন তিনি। গত কয়েক মাসে বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেয়ার কারণে তাকে একাধিকবার আটক করা হয়েছে। জুলাইয়ের আন্দোলনেও তিনি অংশ নিয়েছিলেন।

আন্দোলন ছড়িয়ে দেয়ার আহ্বান

বিরোধী দলগুলোর সমর্থনপুষ্ট ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) আয়োজিত বিক্ষোভ দমনে শনিবার দিল্লিতে ব্যাপক আটক অভিযান চালায় পুলিশ। দলটির দাবি, চারজন সাবেক মুখ্যমন্ত্রীসহ অন্তত তিন হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছিল। পুলিশের বক্তব্য, অনুমতি ছাড়া বিক্ষোভ আয়োজন ঠেকাতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়।

রোববার সকালে মুক্তি পাওয়া সিজেপি নেতারা আন্দোলন দেশজুড়ে ছড়িয়ে দেয়ার ঘোষণা দেন। দলের সহ-আহ্বায়ক আশুতোষ রাঙ্কা বলেন, ‘লড়াই সবে শুরু হয়েছে।’ রোববার মুম্বাইসহ ভারতের আরো কয়েকটি শহরেও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়।

সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে, রাঙ্কা ও সৌরভ দাস মুক্তির পর স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ার (এসএফআই) নেতাদের সাথে সংবাদ সম্মেলন করেন। আন্দোলনকারীরা জানান, আটকের মধ্য দিয়ে তাদের প্রতিবাদ থামানো যাবে না।

নেহার বিক্ষোভে অংশ নেয়া এবং বারবার আন্দোলনে ফিরে আসার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তরুণদের মধ্যে প্রতিবাদী সংস্কৃতি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। তার অনুসারীদের অনেকে মনে করছেন, আন্দোলনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত উপস্থিতির পাশাপাশি সম্মিলিত উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ।

নেহার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান বিক্ষোভ এক দিনের ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভ, হতাশা ও আস্থার সংকটের বহিঃপ্রকাশ। তার কথায়, ‘মানুষ মনে রাখে। মানুষ সেই অসন্তোষ, সেই বিশ্বাসঘাতকতা বয়ে বেড়ায়। মানুষ সেই হতাশা বয়ে বেড়ায়।’

বিক্ষোভের ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে আটক ও বিধিনিষেধের মধ্যেও আন্দোলনকারীদের বারবার রাজপথে ফিরে আসা এবং প্রতিবাদের বার্তা ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা দিল্লির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
সূত্র: এনডিটিভি