
হামিম উল কবির
চীনের ফার্স্ট পিপলস হাসপাতাল ১২৭ বছরের পুরনো একটি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান। ৭০০ শয্যার এই হাসপাতালটি যেমন পরিচ্ছন্ন, তেমনি আধুনিক সুযোগ-সুবিধায় সমৃদ্ধ। মনোরম পরিবেশের পাশাপাশি রয়েছে নিরিবিলি ও পাহাড়ঘেরা নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক আবহ। সর্বাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর চিকিৎসার পাশাপাশি এখানে দেয়া হয় চীনের ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাসেবাও। চীনা নাগরিকদের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশ থেকে আসা রোগীরাও এ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
মূলত চীনের নাগরিকদের চিকিৎসাসেবার কথা বিবেচনায় রেখে হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠিত হলেও বাংলাদেশের সরকারি কিংবা বেসরকারি কোনো হাসপাতালের সাথে এর তুলনা করা কঠিন। বাংলাদেশের যেকোনো হাসপাতালের কথা ভাবলেই একজন রোগী কিংবা তার স্বজনের চোখে প্রথম যে চিত্রটি ভেসে ওঠে, তা হলো চিকিৎসক দেখানোর জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা, পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য দীর্ঘ লাইন এবং বিভিন্ন ধরনের ভোগান্তি। অনেক সময় দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর চিকিৎসকের সাক্ষাৎ মেলে কিংবা প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। কিন্তু চীনের এই সরকারি হাসপাতালে সেই চেনা চিত্রের প্রায় অনুপস্থিতি। এক কথায়, এখানে রোগীর ভিড় নেই বললেই চলে। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা না করেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া কিংবা প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো সম্ভব।
চীনের গুয়াংডং প্রদেশের রাজধানী গুয়াংজৌ শহরের নানশা এলাকায় অবস্থিত ফার্স্ট পিপলস হাসপাতালটি একটি পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান। সাধারণ চিকিৎসা থেকে শুরু করে বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট বা অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের মতো জটিল চিকিৎসাও এখানে তুলনামূলক নির্বিঘেœ করানো যায়।
গত ২৫ অক্টোবর বাংলাদেশের স্বাস্থ্যবিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের (বিএইচআরএফ) সদস্যরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আমন্ত্রণে এটি পরিদর্শন করেন। এ সময় হাসপাতালের বিভিন্ন বিশেষায়িত চিকিৎসা বিভাগ, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং রোগীদের জন্য বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে তাদের ধারণা দেয়া হয়।
পরিদর্শনকালে বিশেষভাবে নজর কাড়ে পুনর্বাসন চিকিৎসা বিভাগ। এ বিভাগের চিকিৎসকরা হাসপাতালের আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রদর্শনের পাশাপাশি অস্ত্রোপচার-পরবর্তী পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগ ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত চিকিৎসাপদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন। তাদের বক্তব্যে উঠে আসে, অস্ত্রোপচারের পর রোগীর স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা ফিরিয়ে আনা এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগের কারণে সৃষ্ট শারীরিক সীমাবদ্ধতা কমিয়ে আনতে সমন্বিত পুনর্বাসন চিকিৎসা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া ঐতিহ্যবাহী চীনা চিকিৎসা (টিসিএম) বিভাগে ব্যথা নিয়ন্ত্রণ এবং স্নায়ু ও রক্তসঞ্চালনজনিত সমস্যার পুনর্বাসনে ব্যবহৃত বিভিন্ন চিকিৎসাপদ্ধতির কার্যকারিতা তুলে ধরা হয়। এসব পদ্ধতির মাধ্যমে কিভাবে রোগীর ব্যথা কমানো এবং শারীরিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধারে সহায়তা করা হয়, সে বিষয়েও ব্যাখ্যা দেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা। গুয়াংজৌর তিনজন খ্যাতনামা চীনা চিকিৎসা বিশেষজ্ঞের নামে পরিচালিত বিশেষজ্ঞ কেন্দ্রও রয়েছে এ বিভাগে। সাংবাদিকদের মধ্যে আগ্রহী কয়েকজনকে তাৎক্ষণিকভাবে আকুপাংচার চিকিৎসার অভিজ্ঞতা নেয়ার সুযোগ দেয়া হয়।
হাসপাতালের চিকিৎসকেরা জানান, তাদের রক্তরোগ বিভাগ দক্ষিণ চীনের অন্যতম বৃহৎ হেমাটোপয়েটিক স্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্টেশন (এইচএসসিটি) কেন্দ্র। গুরুতর অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া (এসএএ), লিউকেমিয়া এবং অন্যান্য জটিল রক্তরোগের চিকিৎসায় বিভাগটি চীনের শীর্ষস্থানীয় কেন্দ্রগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত। বছরে প্রায় ৩০০টি স্টেম সেল প্রতিস্থাপনের অভিজ্ঞতা রয়েছে এ হাসপাতালের। জটিল রক্তরোগের চিকিৎসায় এ সক্ষমতা হাসপাতালটির অন্যতম বিশেষত্ব।
বাংলাদেশের রোগীর চীনে চিকিৎসা নেয়ার অভিজ্ঞতা
এ হাসপাতালে স্টেম সেল থেরাপিসহ জটিল চিকিৎসা নিয়েছেন ঢাকার ধানমন্ডির বাসিন্দা আবদুল্লাহ হাসান নাফিস (রবি)। তার স্ত্রীর চিকিৎসার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি জানান, ২০২৫ সালের অক্টোবরে স্ত্রীর মাল্টিপল মায়েলোমা শনাক্ত হওয়ার পর প্রথমে ভারতে চিকিৎসা নেয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু ভিসা জটিলতার কারণে শেষ পর্যন্ত সেখানে যাওয়া সম্ভব হয়নি।
পরে বাংলাদেশের কাছাকাছি এবং তুলনামূলক সাশ্রয়ী খরচে উন্নত চিকিৎসা পাওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনায় চীনকে বেছে নেন তিনি। তার বিবেচনায়, সিঙ্গাপুরের তুলনায় কম ব্যয়ে ভালো মানের চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে চীনে। প্রথমে চীনের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা শুরু করলেও পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, গুয়াংজৌর ফার্স্ট পিপলস সরকারি হাসপাতালে একই ধরনের চিকিৎসা তুলনামূলক কম খরচে করানো সম্ভব। এরপর স্ত্রীকে এ হাসপাতালে নিয়ে আসেন তিনি।
বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টসহ সামগ্রিক চিকিৎসার জন্য প্রায় ৪৫ লাখ টাকার একটি প্যাকেজের আওতায় চিকিৎসা শুরু করেন আবদুল্লাহ হাসান নাফিস। দীর্ঘ চিকিৎসাপ্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলো সম্পন্ন হলেও ২৫ অক্টোবর তার সাথে কথা বলার সময়ও পুরোপুরি নিশ্চয়তা আসেনি। পরবর্তী দুই সপ্তাহের মধ্যে চিকিৎসকরা তার স্ত্রীর শারীরিক অবস্থা মূল্যায়ন করবেন বলে আশা করছেন তিনি। ওই মূল্যায়নের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে পরবর্তী চিকিৎসার পরিকল্পনা।
নিজের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে নাফিস বলেন, হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা তার ভালো লেগেছে। চিকিৎসা নিতে গিয়ে বাংলাদেশ কিংবা ভারতের হাসপাতালগুলোতে যে ধরনের জটিলতা ও ভোগান্তির মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা ছিল- এখানে তেমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়নি।
চীনের এ সরকারি হাসপাতালের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ তুলনামূলক দৃষ্টান্ত। বিশেষ করে রোগীর অপেক্ষার সময় কমানো, চিকিৎসাসেবার সমন্বয়, বিশেষায়িত চিকিৎসার সক্ষমতা এবং আধুনিক ও ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাপদ্ধতির সমন্বয়ের ক্ষেত্রে এ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পর্যালোচনার দাবি রাখে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








