ওয়াশিংটনকে ৭ দফা দাবিসহ পারমাণবিক প্রস্তাব ইরানের

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

Advertisement

ট্রাম্পের হামলার হুমকি সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পারমাণবিক বিষয়ে একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে তেহরান। তবে এ নিয়ে আলোচনায় বসার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের দেয়া সাতটি শর্ত পূরণ করতে হবে। কাতারের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের কাছে প্রস্তাবটি পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে জানান, যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন তিনি। এর আগে চলতি সপ্তাহে ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজায়ি বলেন, কূটনীতির বিষয়ে আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে সাতটি শর্ত জানিয়েছি। তারা আমাদের সাতটি শর্ত বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত আমরা হরমুজ প্রণালী খুলব না কিংবা কোনো আলোচনায় বসব না।
ইরানের সাত শর্ত 
ইরানের পক্ষ থেকে শর্তগুলোর আনুষ্ঠানিক তালিকা এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে খালিজ টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরানের দাবিগুলোর মধ্যে থাকতে পারে-
১. লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ ও সংঘাত সম্পূর্ণ বন্ধ করা। ২. ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার। ৩. ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া। ৪. বিদেশে আটকে থাকা ইরানের জব্দ করা সম্পদ মুক্ত করা।
৫. মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি কমানো। ৬. যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ দেয়া। ৭. ইরানের ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা বন্ধ করা।  অন্য দিকে ওয়াশিংটন জানিয়েছে, যেকোনো প্রাথমিক আলোচনায় পারমাণবিক ইস্যু অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।
ট্রাম্পের হুমকি ও ইরানের জবাব
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতাকারীরা যখন কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছেন, তখনই নতুন করে উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর সংঘাত আবারো শুরু হতে পারে বলে উদ্বেগ রয়েছে।
নির্বাচনের পর সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু করার সম্ভাবনা নাকচ করেননি ট্রাম্প। অন্য দিকে যুদ্ধ আবার শুরু হলে আরো ব্যাপক পাল্টা হামলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে ইরান। নতুন করে ইরানে হামলা চালালে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির একজন এমপি। গতকাল শুক্রবার আলজাজিরা জানিয়েছে, ইরানের সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সির বরাতে এ তথ্য জানা গেছে। সংসদ সদস্য হোসেইনালি হাজি দেলিগানি তাসনিমকে বলেন, পাল্টা হামলায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। এর ফলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যাবে। তিনি বলেন, ইরানের জবাব কোনো হামলার ব্যাপ্তি বা অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনা না করেই এই জবাব হবে ‘ব্যাপক, বহুগুণ শক্তিশালী ও কৌশলগত’। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘উপযুক্ত সময়ে’ ইরানি বাহিনী এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। 
কাগুজে প্রতিশ্রুতিতে আলোচনায় ফিরবে না ইরান
যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া কেবল কাগুজে প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে ওয়াশিংটনের সাথে কূটনৈতিক আলোচনায় ফিরবে না ইরান। দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের উপসচিব আলী বাঘেরি কানি এ কথা জানিয়েছেন। খবর : আলজাজিরা। 
ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বাঘেরি কানি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর না করে দেশটির বাস্তব পদক্ষেপ দেখতে চায় তেহরান। ইরানকে নিজের চোখে যুক্তরাষ্ট্রের বাস্তব পদক্ষেপ দেখতে হবে। যখন এমন পদক্ষেপ দেখা যাবে, তখনই নতুন অধ্যায় শুরুর পরিবেশ তৈরি হতে পারে। গত দেড় বছরে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে চার দফা আলোচনাই ভণ্ডুল করেছে বলে অভিযোগ করেন বাঘেরি কানি। তার ভাষ্য, ওয়াশিংটনের এমন আচরণের কারণে কেবল লিখিত আশ্বাসের ভিত্তিতে নতুন করে আলোচনায় বসার সুযোগ নেই।
ইরানে হামলার দায় নিতে নারাজ ইসরাইল
ইরানকে সহজেই নতিস্বীকারে বাধ্য করা যাবে, এমন ধারণা থেকেই সামরিক অভিযান শুরু করেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। কিন্তু যুদ্ধ যত গড়িয়েছে, ততই বেড়েছে দুই মিত্রের ওপর চাপ। যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মাশুল নিয়ে এখন একে অপরের দিকে আঙুল তুলছে তারা। এর মধ্যেই ইরানে হামলার সিদ্ধান্তের দায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপিয়েছেন জাতিসঙ্ঘে ইসরাইলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন। গত বুধবার ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম আই২৪নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন ড্যানি ড্যানন। এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ইসরাইলবিরোধী মনোভাব বাড়ছে বলে উদ্বেগ জানান তিনি। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন অব্যাহত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন ড্যানন।
তিনি বলেন, ইসরাইলবিরোধী রাজনীতিকদের একটি সোচ্চার সংখ্যালঘু গোষ্ঠী কংগ্রেসের আলোচনায় ক্রমেই প্রভাব বিস্তার করছে। এতে ইসরাইলের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হবে। তবে, যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যেই ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখার পক্ষে সমর্থন রয়েছে। তাই রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা সত্ত্বেও মিত্রদের সাথে কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথা জানান তিনি। এ দিকে ইসরাইলকে দেয়া বার্ষিক সামরিক সহায়তা বন্ধের বিষয়ে ট্রাম্পের ঘোষণার প্রসঙ্গেও কথা বলেন ড্যানন। তার মতে, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় যৌথ বিনিয়োগের বিষয়টি আরো গুরুত্ব পেতে পারে। এ ক্ষেত্রে দুই দেশের যৌথ উদ্যোগে তৈরি আয়রন ডোমের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, এ ধরনের সামরিক প্রযুক্তি উভয় দেশেরই উপকারে আসে। অন্য দিকে ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার দায় নিতে নারাজ ড্যানন। এ যুদ্ধের জন্য ইসরাইলকে দায়ী করা ঠিক নয় বলে দাবি করেন তিনি। কারণ ইরানে সামরিক হামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ওয়াশিংটন নিজেই। এ সময় ড্যানন বলেন, ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের ছিল, ইসরাইলের নয়। ইসরাইল শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে সমর্থন জানিয়েছিল। সবকিছুর জন্য ইসরাইলকে দায়ী করার প্রবণতাও নাকচ করেন তিনি। এ দিকে ট্রাম্প তেহরানের সাথে ইসরাইলের নিরাপত্তার জন্য অনুকূল নয়, এমন কোনো চুক্তি করলেও নিজেদের সুরক্ষায় ইসরাইল প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলে জানান ড্যানন। একই সাথে জাতিসঙ্ঘে ইসরাইলের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ অব্যাহত থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। অন্য দিকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরান যুদ্ধকে মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের খারাপ ফলের অন্যতম কারণ বলেছেন। এক্সে দেয়া পোস্টে তিনি জানান, যুদ্ধের কারণে অনেক ভোটার সমর্থন সরিয়ে নিয়েছেন। ভোটাররা যুদ্ধের অবসান, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং ইসরাইলের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের পরিবর্তন চান বলে জানান তিনি।
হরমুজে দুই তেলের ট্যাংকারে আগুন
হরমুজ প্রণালীতে ‘অননুমোদিত’ পথে চলাচলের চেষ্টার সময় পানিতে পেতে রাখা বোমার (মাইন) বিস্ফোরণে দু’টি তেলের ট্যাংকারে আগুন ধরেছে। ইরানের ইসলামিক রেভুলিশউনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। ইরানের আধাসরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইআরজিসি জানিয়েছে, একটি ট্যাংকার হরমুজ প্রণালীর পূর্ব অংশে এবং অন্যটি প্রণালীর ভেতরেই আটকা পড়েছে। আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই দুটি ট্যাংকার তাদের সব নেভিগেশন ও শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বন্ধ করে দিয়েছিল এবং আক্রমণাত্মক ও সন্ত্রাসী মার্কিন সামরিক বাহিনীর সহায়তায় ওই এলাকা থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করছিল। এ সময় মাইনের আঘাতে ট্যাংকার দু’টিতে আগুন ধরে যায় এবং সেখানেই সেগুলো আটকে পড়ে। আইআরজিসি আরো জানিয়েছে, এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথটি এখনো বন্ধ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে উত্থাপন করা সাতটি শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এই অবস্থার কোনো পরিবর্তন হবে না। বিবৃতিতে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়, অননুমোদিত ও মাইনযুক্ত এলাকা দিয়ে তেলের ট্যাংকার পার করার জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনীর যেকোনো জোরজবরদস্তিমূলক চেষ্টা শুধু বারবার লজ্জাজনক ব্যর্থতা বয়ে আনবে।
ইরান ‘উদীয়মান’ মহাশূন্য শক্তি : মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদন
ইরানের মহাশূন্য বা মহাকাশসংক্রান্ত মূল স্থাপনাগুলোতে মার্কিন হামলা সত্ত্বেও ইরান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক কার্যক্রমকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতা সম্পন্ন একটি ‘উদীয়মান’ মহাশূন্য শক্তিতে পরিণত হচ্ছে বলে পেন্টাগনের একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। আনাদোলু অ্যাজেন্সির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।  ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (ডিআইএ) তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’-এর সময় ইরান মার্কিন মহাকাশ ক্ষমতার বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নিয়েছিল এবং স্যাটেলাইটভিত্তিক জিপিএস সঙ্কেত ব্যাহত করতে সক্ষম এমন ভূভিত্তিক জ্যামিং সিস্টেম ব্যবহার করেছিল। এতে বলা হয়, সামরিক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং জাতীয় মর্যাদা জোরদার করার জন্য তেহরান তাদের সামরিক ও বেসামরিক মহাকাশ কর্মসূচিগুলো প্রসারিত করছে। আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের মহাকাশ সংক্রান্ত ডেটা অনুযায়ী, ইরানের প্রায় এক ডজন কার্যকর স্যাটেলাইট রয়েছে, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এর তুলনায় এক হাজারেরও বেশি গুণ বেশি স্যাটেলাইট পরিচালনা করে। গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণের সক্ষমতা উন্নত করতে তেহরান চীন ও রাশিয়ার কাছ থেকে স্যাটেলাইট সহায়তাও পেয়েছে বলে খবর রয়েছে।