
শাহেদ মতিউর রহমান
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, যুগোপযোগী শিক্ষাক্রম ও বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে নতুন শিক্ষা কমিশন গঠনের দাবি জোরালো হলেও এই দাবিকে নাকচ করে দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী নিজেই। শিক্ষা কমিশন গঠনের বিষয়ে আপাতত কোনো পরিকল্পনা নেই বলে গতকাল সোমবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। যদিও চলতি বছরের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে চরম বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে অনেকেই শিক্ষা ব্যবস্থায় সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং বারবার শিক্ষাক্রম পরিবর্তন ও প্রশ্নপত্র প্রণয়নে অভিজ্ঞতার ঘাটতির কথা উল্লেখ করেছেন। পরপর দু’টি পাবলিক পরীক্ষায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ফেল করায় এ বিষয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা সমালোচনাও শুরু হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামে ও শহরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এবারের এইচএসসির ফলাফলে চরমভাবে বৈষম্যের চিহ্ন ফুটে উঠেছে। এরই মধ্যে শিক্ষা কমিশন গঠনের বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রীর নেতিবাচক মন্তব্য শিক্ষাবিদদের মধ্যে হতাশাও তৈরি করেছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় নানা সঙ্কট ও অসঙ্গতি দীর্ঘদিনের। শিক্ষাক্রমের ঘন ঘন পরিবর্তন, শিক্ষার মানের অবনতি, শিক্ষক সঙ্কট, নিয়োগে অনিয়ম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বৈষম্য, ঝরে পড়া এবং কারিগরি ও উচ্চশিক্ষায় দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার অভাব- সব মিলিয়ে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। এসব সমস্যা সমাধানে একটি স্বাধীন, শক্তিশালী ও কার্যকর শিক্ষা কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে এসেছে। শিক্ষাবিদদের অনেকেই মনে করেন, সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে শিক্ষানীতি ও শিক্ষাক্রমে পরিবর্তন আনার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। শিক্ষা কোনো স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রধান হাতিয়ার। অথচ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে শিক্ষা ক্ষেত্রে নেয়া অনেক উদ্যোগই ধারাবাহিকতা হারাচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি শিক্ষা কমিশনের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত দেশের প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বাস্তবভিত্তিক সুপারিশ প্রণয়ন করা। একই সাথে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা, শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা আনা, শিক্ষকসঙ্কট নিরসন, শিক্ষা বাজেট বৃদ্ধি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত বৈষম্য দূর করার বিষয়ে সুস্পষ্ট রূপরেখা তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে শহর ও গ্রামের শিক্ষার মানের পার্থক্য, সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধার বৈষম্য এবং দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার কারণ চিহ্নিত করা জরুরি। পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, গবেষণা এবং কর্মবাজারের চাহিদার সাথে শিক্ষার সমন্বয় ঘটানোর বিষয়টিও কমিশনের বিবেচনায় থাকতে হবে।
তবে শুধু কমিশন গঠন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কমিশনে অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদ, গবেষক, শিক্ষক, অর্থনীতিবিদ, প্রযুক্তিবিদ, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। কমিশনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন প্রকাশ এবং সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে। শিক্ষাবিদদের অভিমত, অতীতের শিক্ষা কমিশনগুলোর সুপারিশ পর্যালোচনা করে বাস্তবায়িত না হওয়া প্রস্তাবগুলোও বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। একই সাথে শিক্ষা সংস্কারে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা জরুরি।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, একটি গ্রহণযোগ্য শিক্ষা কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় শিক্ষাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা গেলে শিক্ষাক্ষেত্রে বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ হবে। শিক্ষার মানোন্নয়ন, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথও সুগম হবে। তাই সময়ের দাবি- শুধু নতুন শিক্ষানীতি নয়, তার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে দ্রুত একটি শক্তিশালী ও সর্বজনগ্রাহ্য শিক্ষা কমিশন গঠন। শিক্ষা সেক্টরে দেশে এই যখন অবস্থা ঠিক সেই মুহূর্তে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন ও সংস্কারে শিক্ষা কমিশন গঠনের পরিকল্পনা থাকলেও তা করতে চান না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেছেন, যারা শিক্ষা কমিশনের সদস্য হবেন, তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অতীতের ওপর নির্ভরশীল। অথচ শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে শিক্ষা কোন দিকে যাবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। গতকাল সোমবার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী এ কথা বলেন তিনি।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শিক্ষা কমিশন করার কথা ছিল, কিন্তু আমি তা করিনি। আমি করতে চাচ্ছি না। আমি একটি এডুকেশন কমিশন গঠন করলাম। কিন্তু যাদের দিয়ে কমিশন গঠন করব, তারা আজকের অবস্থানে জ্ঞানী ব্যক্তি। আজকের অবস্থানে যিনি জ্ঞানী, তিনি অতীতের অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে জ্ঞানী হয়েছেন। কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থা যেভাবে রূপান্তরিত হচ্ছে, ভবিষ্যতে এটি কোন দিকে যাবে, তা তো আমরা জানি না। শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের প্রসঙ্গেও কথা বলেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের দাবি উঠেছে। তবে অন্যান্য দেশের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা নেয়া প্রয়োজন। প্রযুক্তির মাধ্যমে বিদেশের শিক্ষাব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








