গাজীপুর-আশুলিয়ায় বিক্ষোভ অব্যাহত অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও অবরোধ
বেতন বাড়ানোর দাবিতে গাজীপুরে গতকালও বিক্ষোভ করেন পোশাকশ্রমিকরা। এ সময় পুলিশকে সতর্ক অবস্থানে দেখা যায় : নয়া দিগন্ত।

নয়া দিগন্ত ডেস্ক 

Advertisement

ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে গাজীপুর ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন তৃতীয় দিনের মতো অব্যাহত রয়েছে। গতকাল সোমবার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গাজীপুরের কালিয়াকৈর, কোনাবাড়ী, নাওজোর ও আশুলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের সাথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষ, সড়ক অবরোধ, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় পুলিশের একটি ভ্যানে আগুন  দেয়া হয় এবং শতাধিক যানবাহন ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে। আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে অন্তত পাঁচ সাংবাদিক ও ক্যামেরাম্যান হামলার শিকার হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গাজীপুরে ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েনের পাশাপাশি ২১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছেন। রোববার ও সোমবার পর্যন্ত আন্দোলনসংশ্লিষ্ট ৩০ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। 
সোমবার সকাল ৭টার দিকে কালিয়াকৈরের পল্লী বিদ্যুৎ ও সফিপুর এলাকায় প্রায় এক হাজার থেকে দেড় হাজার শ্রমিক ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। এতে মহাসড়কের প্রায় ১০ কিলোমিটার অংশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় ছয় ঘণ্টা অবরোধের পর পুলিশ ও বিজিবির যৌথ তৎপরতায় বেলা ১টার দিকে শ্রমিকরা মহাসড়ক ছেড়ে যান। এ সময়  সংঘর্ষে বিজিবি সদস্যসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্তত ২০ সদস্য আহত হন। নাওজোর এলাকায় পুলিশের একটি ভ্যানে এবং কালিয়াকৈরে একটি কাভার্ডভ্যানে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটে।  
এ দিকে আশুলিয়ায় সোমবার সকাল থেকে নরসিংহপুর, নিশ্চিন্তপুর ও জিরানী বাজার এলাকায় শ্রমিকদের সাথে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। বেলা সোয়া ১১টার দিকে নরসিংহপুরের নদী ফিলিং স্টেশনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি কারখানার কাভার্ডভ্যানে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। এ ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। 
অন্য দিকে আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে দীপ্ত টেলিভিশনের সাংবাদিক জাহাঙ্গীর আলম, সময় টেলিভিশনের সাংবাদিক মেহেদী হাসান ও ক্যামেরাম্যান রুবেল এবং এসএ টিভির ক্যামেরাম্যান রেজাউল ইসলামসহ অন্তত পাঁচজন হামলার শিকার হন। দীপ্ত টেলিভিশনের সাংবাদিক জাহাঙ্গীর আলম অভিযোগ করেন, একদল বিক্ষোভকারী তাকে মারধর করে ক্যামেরা, মোবাইল ফোন, ট্রাইপড ও ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। 
ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-২-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন জানান, বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের জড়ো হওয়ার খবর পেয়ে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে। এ সময় অগ্নিসংযোগ ও যানবাহন ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। নাওজোরে পুলিশের ভ্যানে আগুন দেয়ার ঘটনায় একজনকে আটক করা হয়েছে। গ্রেফতার ৩০ জনের আন্দোলনে সম্পৃক্ততা ও রাজনৈতিক পরিচয় যাচাই করা হচ্ছে। 
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো: নূরুল করিম ভূঁইয়া জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। ২১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে। 
গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান বলেন, এটি প্রকৃত শ্রমিক আন্দোলন নয়; পরাজিত শক্তির একটি অংশ শ্রমিকদের আবেগকে ব্যবহার করে ফায়দা নেয়ার চেষ্টা করছে। অন্য দিকে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো: শওকত হোসেন সরকার জানান, শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির বিষয়ে সরকার, বিজিএমইএ, মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের মধ্যে ঐকমত্য হয়েছে। নতুন মজুরি কমিশন গঠন করা হয়েছে এবং আগামী জানুয়ারি থেকে বর্ধিত বেতন কার্যকরের আশা রয়েছে। 
আন্দোলনের প্রভাবে গাজীপুর ও আশুলিয়ার বহু পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। শিল্প পুলিশের হিসাবে, রোববার গাজীপুরে ১০০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। বিজিএমইএর হিসাবে ঢাকা, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও ময়মনসিংহের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ছুটির আওতায় আসে ৫২৯টি কারখানা। 
এ দিকে শ্রমিক অসন্তোষের প্রভাব পড়েছে ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কেও। যমুনা সেতু কর্তৃপক্ষের হিসাবে গত এক মাসের তুলনায় যানবাহন পারাপার ও টোল আদায় কমেছে। চালক ও যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা  দেয়ায় অনেকে ট্রেন ও বিকল্প সড়কপথ ব্যবহার করছেন। শ্রমিকদের দাবি, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও অতিরিক্ত কাজের সুযোগ কমে যাওয়ায় বর্তমান মজুরিতে সংসার চালানো কঠিন। তাই ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা, চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের পুনর্বহাল এবং কালো তালিকাভুক্তি বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছেন তারা।
 প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন গাজীপুর মহানগর প্রতিনিধি, কালিয়াকৈর (গাজীপুর), আশুলিয়া (ঢাকা) ও ভূঞাপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা