
এস এম রহমান পটিয়া-চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম)
ঘনঘন লোডশেডিং, গ্যাস ও জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলায় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চল হতে পারে বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। অনুকূল বাতাসের গতিবেগ ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এ অঞ্চলে স্থলভাগের পাশাপাশি সমুদ্র উপকূলে বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। যথাযথ পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের পাশাপাশি শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে।
বিভিন্ন সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার উপকূলে ভূপৃষ্ঠ থেকে ১২০ মিটার উচ্চতায় বাতাসের গড় গতিবেগ ৫.৭৫ থেকে ৭.৭৫ মিটার/সেকেন্ড। বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এ গতিবেগ বেশ সম্ভাবনাময়। এসব এলাকায় বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্রের গড় প্ল্যান্ট ক্যাপাসিটি ফ্যাক্টর ৬১ শতাংশের বেশি বলে খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে। মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত তা ৮৫ শতাংশে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
সম্ভাবনাময় কয়েকটি এলাকা : কক্সবাজারের খুরুশকুলে বাঁকখালী নদীর তীরে দেশের প্রথম ও বৃহত্তম ৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বাণিজ্যিক বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রয়েছে। চীনা বিনিয়োগে নির্মিত এ কেন্দ্রে ২২টি টারবাইন রয়েছে। এ ছাড়া মহেশখালী ও মাতারবাড়ীতে ১০০ মেগাওয়াট এবং চকরিয়ায় ২২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনার কথা রয়েছে।
চট্টগ্রামের আনোয়ারার পারকী সৈকত এলাকায় ১০০ মেগাওয়াটের একটি কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগের কথাও রয়েছে। সন্দ্বীপের চারপাশের অগভীর সমুদ্র, বাঁশখালীর বেড়িবাঁধ এবং সীতাকুণ্ড ও মিরসরাইয়ের উপকূলীয় এলাকায় বায়ু টারবাইন স্থাপনের সম্ভাবনা প্রচুর। এসব কেন্দ্রে উৎপাদিত বিদ্যুৎ স্থানীয় শিল্পকারখানায় সরবরাহ করা সম্ভব। সন্দ্বীপের আশপাশে অফশোর উইন্ড ফার্ম স্থাপন করা গেলে দ্বীপের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি মূল ভূখণ্ডেও বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাবে।
সুপার ডাইক হতে পারে বড় সুযোগ : বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) প্রস্তাবিত সুপার ডাইক প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি মোকাবেলায় ২০১৯ সালে কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামের মিরসরাই এবং ফেনী ও নোয়াখালীর বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকা হয়ে হাতিয়াসহ প্রায় ৬৪২ কিলোমিটার উপকূল সুরক্ষা বাঁধ রয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ মিটার উঁচু সুপার ডাইকের ওপর দুই লেনের সড়ক নির্মাণ এবং দুই পাশের ঢাল সুরক্ষার ব্যবস্থা রাখার কথা রয়েছে। প্রকল্পটির প্রাথমিক পর্যায়ে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮০ হাজার ১৩২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে কক্সবাজার থেকে মিরসরাই পর্যন্ত ৪৩০ কিলোমিটার অংশে ব্যয় ধরা হয় ৪৪ হাজার ৩৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। অন্যদিকে, রহমতখালী রেগুলেটর থেকে ফেনী রেগুলেটর পর্যন্ত ১২৬ কিলোমিটার এবং হাতিয়ার ৮৬ কিলোমিটার উপকূলসহ ২১২ কিলোমিটার অংশে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছিল ৩৫ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা। পরবর্তীতে প্রথম অংশের ব্যয় সংশোধন করে ৪৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়।
প্রকল্পের পরিকল্পনায় সন্দ্বীপ, কুতুবদিয়া, ধলঘাটা ও মহেশখালীসহ বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকায় বাঁধ নির্মাণ, রেগুলেটর, সংযোগ সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামোও অন্তর্ভুক্ত ছিল। পাউবোর নিজস্ব প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ কিলোমিটার বাঁধ ব্যবহার করে বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা গেলে জমি অধিগ্রহণের ব্যয় কমানো সম্ভব হতে পারে।
বিনিয়োগ ও ব্যয় সাশ্রয়ের সম্ভাবনা : খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, কক্সবাজারের ৬০ মেগাওয়াটের বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে প্রায় সাড়ে সাত একর জমি ব্যবহার হবে যা সমপরিমাণ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় জমির তুলনায় অনেক কম। তবে অফশোর বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে টারবাইনের ভিত্তি ও সমুদ্রের তলদেশে বিদ্যুতের তার বসানোর কারণে প্রাথমিক ব্যয় বেশি হবে। খসড়ার হিসাব অনুযায়ী, এ ক্ষেত্রে প্রতি মেগাওয়াটে ব্যয় হতে পারে ২০/২৫ লাখ মার্কিন ডলার।
বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা, তেল বা এলএনজি আমদানির প্রয়োজন না হওয়ায় দীর্ঘ মেয়াদে জ্বালানি ব্যয় কমানোর সুযোগ রয়েছে। একটি কেন্দ্র ২৫ বছর পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে বলে খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা : বলা হয়েছে, বঙ্গোপসাগর উপকূলে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং শীতকালে বাতাসের গতিবেগ কমে যাওয়া বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের চ্যালেঞ্জ হতে পারে। এসব মোকাবেলায় দুর্যোগসহনশীল টারবাইন এবং বায়ু ও সৌরবিদ্যুতের সমন্বিত ব্যবস্থা ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
খসড়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল রিনিউয়েবল এনার্জি ল্যাবরেটরি (এনআরইএল) এবং টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) সমীক্ষার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, দেশের উপকূলীয় অঞ্চল, বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে বায়ুবিদ্যুতের সম্ভাবনা রয়েছে প্রচুর। এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সমুদ্রভিত্তিক বায়ুবিদ্যুৎ নীতিমালা প্রণয়ন, সম্ভাব্যতা যাচাই, পরিবেশগত মূল্যায়ন এবং দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, উপকূলীয় সুরক্ষা অবকাঠামো ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি পরিকল্পনার মধ্যে সমন্বয় করা গেলে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার অঞ্চল দেশের সবুজ জ্বালানি উৎপাদন, শিল্পায়ন ও টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








