ইরান যুদ্ধে মার্কিন করদাতাদের ব্যয় ৪৭ বিলিয়ন ডলার

 নয়া দিগন্ত ডেস্ক

Advertisement

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিন কয়েক বাকি থাকতে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই যুদ্ধ ভোটারদের সিদ্ধান্তের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। পেন্টাগন যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের জানিয়েছে যে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এখন পর্যন্ত মার্কিন করদাতাদের অন্তত ৪৭.১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে, আগামী দুই বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে কি না।
পেন্টাগন আরো জানিয়েছে যে,  ট্রাম্পের দেয়া তহবিলের ৯৭.৫ শতাংশ তারা ‘সফলভাবে বরাদ্দ’ করেছে। এর মধ্যে ২৯ বিলিয়ন ডলার ধরা হয়েছে যুদ্ধে ব্যবহৃত গোলাবারুদ-বোমা, গুলি এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম- পুনরায় সংগ্রহের সম্ভাব্য খরচ হিসেবে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মার্কিন বিমানবাহিনী যুদ্ধবিমান ও বোমারু ইউনিটের পেছনে ৭.৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে; মার্কিন নৌবাহিনী দুই ডজন যুদ্ধজাহাজ ও বিমানবাহী রণতরীর পেছনে ১.৫ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে; এবং মার্কিন সেনাবাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের সৈন্যবাহিনী বজায় রাখতে ২.১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে।
ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্যানুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে ৫০ হাজারেরও বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। এর মধ্যে বড় স্থায়ী ঘাঁটিগুলোতে থাকা সেনাসদস্যদের পাশাপাশি পুরো অঞ্চলজুড়ে ছোট ছোট অগ্রবর্তী ঘাঁটিতে নিয়োজিত কর্মীরাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। কর্মকর্তারা ‘দ্য টাইমস’-কে জানিয়েছেন যে, ক্ষতিগ্রস্ত বিমান ও গোলাবারুদ প্রতিস্থাপনের জন্য পেন্টাগন ৬.১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। এ ছাড়া ওই অঞ্চলে কমান্ডোদের পরিবহন ও সহায়তার জন্য ৬৪৫ মিলিয়ন ডলার এবং মার্কিন সামরিক সদস্যদের জন্য ‘অভ্যন্তরীণ চিকিৎসা সহায়তা’ খাতে ২৪.৫ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে।
কংগ্রেসের একজন কর্মকর্তা আরো জানান, মার্কিন ট্রান্সপোর্টেশন কমান্ড সরঞ্জাম স্থানান্তরের জন্য ৯২.২ মিলিয়ন ডলার এবং ইউএস সাইবার কমান্ড ‘সাইবার সহায়তা কার্যক্রম’-এর পেছনে ১৪ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। তবে পেন্টাগনের এই হিসাবের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক ঘাঁটিগুলো মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যয়ের কথা উল্লেখ নেই। এ ছাড়া যুদ্ধে ব্যবহৃত জাহাজ ও বিমান চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানির খরচের বিষয়টিও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
পেন্টাগন আনুষ্ঠানিকভাবে এই যুদ্ধে ১৮ জন মার্কিন সামরিক সদস্যের মৃত্যুর কথা স্বীকার করলেও, ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’ ছয়জন বেনামি মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে যে, প্রকৃত নিহতের সংখ্যা অন্তত ২২ জন। পেন্টাগনের নিজস্ব ‘ডিফেন্স ক্যাজুয়ালটি অ্যানালাইসিস সিস্টেম’ ডাটাবেজ অনুযায়ী, ইরানের সাথে এই যুদ্ধে ৮৬৫ জন সামরিক সদস্য আহত হয়েছেন।
প্রতিক্রিয়া কী?
এ দিকে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির পাঁচজন সিনেটর ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের কাছে চিঠি লিখে পেন্টাগনের কাছে যুদ্ধের প্রকৃত ব্যয় প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন। চিঠিতে বলা হয়েছে, এই যুদ্ধের প্রকৃত ব্যয় গোপন রাখার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের ‘চলমান প্রচেষ্টা অত্যন্ত আপত্তিকর এবং অগ্রহণযোগ্য’। ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের এই যুদ্ধ মার্কিন নাগরিকদের কাছে ক্রমেই অজনপ্রিয় হয়ে উঠছে, কারণ এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বজুড়ে জ্বালানির মূল্য বেড়ে গেছে।
যুদ্ধ শুরুর পর, হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়ায় বিশ্বব্যাপী তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সঙ্কট দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে, যার ওপর কৃষক এবং ছোট ব্যবসায়ীরা ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। নিউ ইয়র্কের সিনেট মাইনরিটি লিডার চাক শুমার এক্সে লিখেছেন : ‘আট মাস ধরে আমেরিকান পরিবারগুলো ইরানে ট্রাম্পের বিপর্যয়কর যুদ্ধের বিপুল ব্যয়ের ভারে পিষ্ট হচ্ছে। ট্রাম্প এবং তার অহমিকা আমাদের এমন এক যুদ্ধে ঠেলে দিয়েছে, যার কোনো পরিকল্পনা ছিল না, কোনো আইনি অনুমোদন ছিল না এবং যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার কোনো কৌশলও ছিল না।’
পেন্টাগনের ইন্সপেক্টর জেনারেল গত মাসে জানিয়েছেন যে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার ফলে মার্কিন বাহিনী ‘কৌশলগত মজুদ ঘাটতির’ সম্মুখীন হচ্ছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন অস্ত্রের মজুদ কমে যাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই যুদ্ধ মার্কিন অর্থনীতিতে সরাসরি সরকারি ব্যয়ের পাশাপাশি জ্বালানি ও তেলের মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন ডিজেলের গড় দাম দাঁড়িয়েছে ৬.৩৫ ডলারে, যা গত বছর ছিল ৩.৭৫ ডলার। জ্বালানির উচ্চমূল্য খাদ্যপণ্যের দামও বাড়িয়ে দিচ্ছে; তেল ও গ্যাসের ঘাটতি খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলার প্রায় প্রতিটি পর্যায়ে প্রভাব ফেলছে। ইতোমধ্যে দেশটির জাতীয় ঋণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে; যা প্রত্যাশিত সময়ের দুই বছর আগেই ঘটেছে।
এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে এই যুদ্ধ অত্যন্ত অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এবং ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা বা ‘অ্যাপ্রুভাল রেটিং’ কমে ৩৩ শতাংশে নেমে এসেছে; যা তার দুই মেয়াদে প্রেসিডেন্ট থাকাকালের মধ্যে সর্বনিম্ন। ‘রিয়েলক্লিয়ারপোলিং’ জাতীয় জনমত জরিপের গড় অনুযায়ী, বর্তমানে রিপাবলিকানদের ৪৩.২ শতাংশের বিপরীতে ডেমোক্র্যাটরা ৫১.৪ শতাংশ সমর্থন নিয়ে এগিয়ে আছেন; অর্থাৎ তাদের মধ্যে ব্যবধান ৮.২ শতাংশ পয়েন্টের।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অফ ইয়র্কের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ক্রিস ফেদারস্টোন বলেন, এই বিষয়টি ট্রাম্পের রাজনৈতিক বক্তব্যের দু’টি মূল স্তম্ভের ওপর আঘাত হানে : ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণায় তিনি যে ‘নতুন কোনো যুদ্ধ শুরু না করার’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং মার্কিন অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের ওপর তিনি যে জোর দিয়েছিলেন- এই দু’টিই এখন প্রশ্নের মুখে। এই সঙ্ঘাতের কারণে করদাতাদের ওপর যে ক্রমবর্ধমান আর্থিক বোঝা পড়ছে এবং যুদ্ধের কোনো সুনির্দিষ্ট সমাপ্তি দেখা যাচ্ছে না- তা অনেকটা ট্রাম্পের প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারণার সময় আফগানিস্তান যুদ্ধ নিয়ে করা সমালোচনার মতোই।
ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ‘কস্টস অব ওয়ার প্রজেক্ট’-এর তথ্যানুযায়ী, ২০০১ সালে শুরু হওয়া আফগানিস্তান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ২.২৬ থেকে ২.৩ ট্রিলিয়ন ডলার। জর্জ ডব্লিউ বুশ, বারাক ওবামা ও ডোনাল্ড ট্রাম্প- এই তিন প্রেসিডেন্টের শাসনামল মিলিয়েই এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে। ডেমোক্র্যাটরা রিপাবলিকানদের ১৪ বার সুযোগ দিয়েছেন যেন তারা ট্রাম্পকে জবাবদিহিতার আওতায় আনেন এবং এই বেপরোয়া যুদ্ধের অবসান ঘটান। কিন্তু রিপাবলিকানরা বারবার তা প্রত্যাখ্যান করছেন এবং এই নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে চলেছেন। ট্রাম্প ও তার অহমিকা আমাদের এমন এক যুদ্ধে ঠেলে দিয়েছে, যার কোনো পরিকল্পনা নেই, কোনো আইনি অনুমোদন নেই, এমনকি যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার কোনো কৌশলও নেই। একজন মার্কিন ভোটার এর আগে ইউক্রেন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ২৫০ বিলিয়ন ডলার খরচের সমালোচনা করে বলেছেন, ট্রাম্প আমাদের অন্যতম প্রকৃত শত্রু ইরানকে ধ্বংস করতে খরচ করেছেন প্রায় ৬০-৭০ বিলিয়ন ডলার- আর আপনারা কোনো কারণ ছাড়াই খরচ করেছেন ২৫০ থেকে ৩০০ বিলিয়ন ডলার! এর জবাবে মার্কিন সিনেটর চাক শুমার এক্সে বলেন, আপনাদের আর বাইডেনের শাসনামলে চার বছর ধরে আমরা উচ্চমূল্যের চাপে পিষ্ট হয়েছি। এতে প্রতিটি আমেরিকান পরিবারের (যাচাইকৃত তথ্যানুযায়ী) ৬০ হাজার করে ডলার ক্ষতি হয়েছে।