মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার, মালয়েশিয়া কর্মী নিয়োগ, মালয়েশিয়া মেডিক্যাল সেন্টার, মালয়েশিয়া যাওয়ার খরচ, অভিবাসন ব্যয়, মেডিক্যাল পরীক্ষার অনুমোদিত কেন্দ্র, রিক্রুটিং অ্যাজেন্সি, মালয়েশিয়া ভিসা প্রতারণা

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আগেই দিয়েছে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়। এবার ঘোষণা দেয়া হয়েছে, ৩১ অক্টোবর থেকে কোন কোন মেডিক্যাল সেন্টার মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে পারবে। তবে দু’দিন পর হলেও গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে সেই চূড়ান্ত মেডিক্যাল সেন্টারের তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। 
এদিকে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর অভিবাসনব্যয়  ‘নিয়ন্ত্রণে’ রাখতে সরকার তথা প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় নানাভাবে চেষ্টা করলেও আসলে সেটি কতটুকু নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে তা নিয়ে বাংলাদেশ এবং মালয়েশিয়ায় থাকা ব্যবসায়ীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন আর জল্পনা কল্পনা শুরু হয়েছে। অভিবাসন ব্যবসার সাথে জড়িতরা ধারণা করছেন, বিগত সময়ের চেয়েও এবার মালয়েশিয়াতে একজন কর্মী সব প্রসেসিং সম্পন্ন করে পাঠাতে খরচ পড়বে কমপক্ষে আট লাখ টাকার মতো। এই হিসাব কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরো বাড়তে পারে। এর মধ্যে চাহিদাপত্র (ভিসা), সিন্ডিকেট খরচসহ মালয়েশিয়াতেই একজন কর্মীর বিপরীতে খরচ হয়ে যাবে পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা। আর ঢাকার পার্টে বিমান টিকিট, কর্মীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, বিএমইটির খরচ মিলিয়ে লাগবে আরো দেড় লাখ টাকা। এই হিসাবে সাড়ে ছয় লাখ থেকে সাত লাখ টাকা শুধু প্রসেসিং ফি বাবদই ব্যয় হয়ে যাবে। এরপর এফডব্লিওসিএমএস মনোনীত ঢাকার ২৫ এজেন্সির সার্ভিস চার্জ এবং দালালদের খরচ মিলিয়ে কর্মীপ্রতি খরচ হবে আট লাখ টাকার মতো। 
বিগত সময়ে মালয়েশিয়াতে একজন কর্মীর যেতে খরচ হয়েছিল পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকার মধ্যে। এবার অভিবাসন খরচ আরো বেড়ে যাচ্ছে। এই অবস্থায় মালয়েশিয়া সরকার কতগুলো ভিসা (চাহিদাপত্র) বাংলাদেশীদের জন্য বরাদ্দ রাখছে সে বিষয়টি এখনো তারা জানায়নি। তবে তার আগেই ঢাকায় দালাল ও রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকরা পাঁচ-ছয় লাখ টাকায় কর্মীদের বিদেশে পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে পাসপোর্ট ও জামানতের টাকা নিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়াই কোনো কোনো তালিকাভুক্ত (নতুন তালিকা ছাড়া) মেডিক্যাল সেন্টার হাজার হাজার কর্মীকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। ইতোমধ্যে এমন অভিযোগে চিহ্নিত চারটি মেডিক্যাল সেন্টারে ভ্রাম্যমাণ ম্যাজিস্ট্রেট অভিযান চালিয়েছেন। এর মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠান সিলগালা ও মালিকদের জরিমানা করলেও অপর তিনটি প্রতিষ্ঠানে ম্যাজিস্ট্রেট যাওয়ার আগেই সটকে পড়ে মালিক ও তার প্রতিনিধিরা। এতে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী যাওয়ার আগেই অনেক বিদেশগামী কর্মী প্রতারিত হতে পারেন বলে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে আশঙ্কা করা হচ্ছে।  
সর্বশেষ গত বুধবার প্রবাসীকল্যাণ ও  বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো: শরীফুল ইসলামের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, মালয়েশিয়ায় কাজ করতে ইচ্ছুক কর্মীদের মেডিক্যাল পরীক্ষা আগামীকাল (৩১ অক্টোবর) অনুমোদিত মেডিক্যাল সেন্টারগুলোতে শুরু হবে। এর আগে কোনো কর্মীর মেডিক্যাল পরীক্ষা করানো যাবে না। আর অনুমোদিত মেডিক্যাল সেন্টারের তালিকাও খুব শিগগির ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। এই অবস্থায় প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে তালিকাভুক্ত মেডিক্যাল সেন্টারগুলোর বিষয়ে  খোঁজখবর রাখতে কর্মীদের অনুরোধ জানানো হয়। কোনো মেডিক্যাল সেন্টার সরকারি নির্দেশনা পরিপালনে ব্যর্থ হলে তালিকা থেকে বাদ দেয়া হবে।  সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ-ও বলা হয়েছে, ৩১ অক্টোবরের আগে করা কোনো মেডিক্যাল পরীক্ষা গ্রহণযোগ্য হবে না এবং এবং ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্সের জন্য প্রক্রিয়াকরণ করা হবে না। তারপরও কিছু দালাল ও অসাধু এজেন্সি অনুমতি ছাড়া মেডিক্যাল পরীক্ষা করানোর কথা বলে কর্মীদের কাছ থেকে পাসপোর্ট ও টাকা নেয়ার চেষ্টা করছে বলে মন্ত্রণালয়ের নজরে এসেছে। কর্মীদের এ ধরনের প্রস্তাবে সাড়া না দিতে এবং নিশ্চিত না হয়ে কারো কাছে পাসপোর্ট বা টাকা জমা না দেয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে। নির্দেশনা অমান্যকারী মেডিক্যাল সেন্টার ও রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী  যথাসম্ভব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। 
গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার আগে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: মোখতার আহমেদের সাথে নতুন মেডিক্যাল সেন্টারের তালিকা প্রকাশ ও কর্মীপ্রতি অভিবাসনব্যয় নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হয়। পরবর্তীতে তাকে খুদেবার্তা পাঠানো হয়। কিন্তু তিনি কোনটিতেই সাড়া দেননি। এর আগে মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা শরীফুল ইসলামকে ফোন দেয়া হয়। তিনিও কল রিসিভ করেননি। 
গত সপ্তাহে মালয়েশিয়া থেকে একাধিক ব্যবসায়ী নয়া দিগন্তকে বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার ঘোষণা আসার পর থেকেই বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার ব্যবসায়ী পরিচয়ের লোকজন এসে শুধু ভিসা কিনতে দৌড়ঝাঁপ আর মিটিংয়ের পর মিটিং করছে। কেউ কেউ তো ঢাকায় থাকা দুটি ফ্ল্যাট পাঁচ কোটি টাকায় বিক্রি করে সেই টাকা নিয়ে এসেছে ভিসা কিনতে। এক প্রশ্নের উত্তরে তারা বলেন, এবার কিন্তু একটি ভিসার দাম উঠেছে ৯ হাজার রিংগিট পর্যন্ত। মানে বাংলাদেশী টাকায় প্রায় তিন লাখ টাকা। এত টাকা দিয়ে ভিসা কিনতে হলে তাহলে কিভাবে কম টাকায় বাংলাদেশ থেকে লোক আসবে? এর মধ্যে সিন্ডিকেটের ফি পাঁচ হাজার রিংগিট নির্ধারণ রয়েছে। রিংগিটের দাম বাড়তি থাকায় সিন্ডিকেটের ফি এবার দেড় লাখ টাকা থেকে বেড়ে এক লাখ ৬৫ হাজার টাকা হচ্ছে। এছাড়া রয়েছে বিমান টিকিট, মেডিক্যাল ফি, বিএমইটির বহির্গমন ফি, ২৫ এজেন্সির যেটিতে কাজ ঢুকবে সেই এজেন্সির সার্ভিস চার্জ দিয়ে যদি ছয়-সাত লাখ টাকা খরচই হয়ে যায়- তাহলে আমরা ব্যবসা করব কিভাবে? এর মধ্যে কোন ধরনের ডকুমেন্টস ছাড়াই টাকা দিয়ে কত মানুষ যে এবারো ভিসা কিনে প্রতারিত হবেন তার-ও কোনো হিসাব মিলাতে পারছি না। তারা বলেন, ভিসা ট্রেডিং বন্ধে আমাদের সরকার এবং মালয়েশিয়া সরকারের কঠোর মনিটরিং বাড়ানো উচিত। আমরা শুনছি, এবার মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশীদের নামে সর্বোচ্চ ৭০ হাজার থেকে এক লাখ কর্মীর চাহিদাপত্র (কোটা) ইস্যু করতে পারে। কিন্তু আদম ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যে দেশে ১০ লাখ মানুষের কাছ থেকে পাসপোর্ট সংগ্রহ করে তাদের হেফাজতে নিয়ে নিয়েছে। সাথে যার কাছ থেকে যা নগদ টাকা পারছে আদায় করছে।  
সচেতন ব্যবসায়ীরা বলছেন, এবার অনেক হিসাব-নিকাশ করে ভিসা কেনার জন্য মালয়েশিয়াতে টাকা লেনদেন করতে হবে। গতবার অনেক ব্যবসায়ীই ভিসা কিনতে গিয়েই নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, দেশে ভুয়া স্বাস্থ্য পরীক্ষার নামে কয়েক লাখ বিদেশগামীর কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছিলো সুযোগসন্ধানী চক্র।  
গতকাল রাত পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ের ঘোষণা অনুযায়ী এফডব্লিওসিএমএস-এ থাকা মোট ১৭টি মেডিক্যাল সেন্টারের নামই ঝুলছিল। নতুন তালিকা রাত ৮টা পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেও নতুন মেডিক্যাল সেন্টারের তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। 
গত রাতে গুলশানের উদয় টাওয়ারের একজন ব্যবসায়ী নয়া দিগন্তকে নাম না জানিয়ে বলেন, এখন পর্যন্ত নতুন মেডিক্যাল সেন্টারের তালিকা দেখছি না। তবে শুনেছি ৩ নভেম্বরের মধ্যে নতুন মেডিক্যাল সেন্টারের চূড়ান্ত তালিকা সরকার প্রকাশ করবে।

Advertisement