তাহসিফের সাথে কী ঘটেছিল সেই রাতে, দীপের বক্তব্যে ধোঁয়াশা
তাহসিফের সাথে কী ঘটেছিল সেই রাতে, দীপের বক্তব্যে ধোঁয়াশা।

নিজস্ব প্রতিবেদক

Advertisement

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ও পাইলট কে এম তাহসিফ সাউরীর (২৮) রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় নতুন নতুন তথ্য সামনে আসছে। তুরাগ নদ থেকে তার লাশ উদ্ধারের স্থান থেকে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে উদ্ধার হয়েছে একটি নম্বর প্লেটবিহীন মোটরসাইকেল। তবে এটি তাহসিফের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল কি না তা নিয়ে চলছে যাচাই-বাছাই। এ দিকে নতুন আলামতের সন্ধানে তাহসিফের ‘জুনিয়র  বন্ধু’ আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
পিবিআইকে দেয়া বক্তব্যে দীপ দাবি করেছেন, পুলিশের পোশাক পরা বা পুলিশের মতো দেখতে কয়েকজনের ধাওয়ার মুখে তাহসিফ তুরাগ নদে ঝাঁপ দেন। আর তিনি নিজে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ২৯ নম্বর সীমানা পিলারের পেছনে লুকিয়ে রক্ষা পান। পরে মোটরসাইকেল নিয়ে সেখান থেকে চলে যান। তবে দীপের এ বক্তব্য সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম। তার দাবি, ছেলেকে ধাওয়া খেয়ে নদে ঝাঁপ দিয়ে ডুবে মরতে হয়েছে- এমন বক্তব্য বিশ্বাসযোগ্য নয়। ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
প্রথমে উত্তরার হাউজ বিল্ডিং এলাকায় তাহসিফের সাথে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কথা বললেও পরে দীপের বক্তব্যে পরিবর্তন এসেছে। দু’জন একসাথে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যাওয়ার পর তাহসিফকে রেখে দীপের একা ফিরে আসার বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
মোটরসাইকেল উদ্ধার, দীপকে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন
তুরাগ নদ থেকে তাহসিফের ভাসমান লাশ উদ্ধারের পর শুক্রবার তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি উদ্ধার হয়েছে বলে পিবিআই দাবি করেছে। টঙ্গী পশ্চিম থানার মাজার বস্তি এলাকায় নদীর তীর থেকে আনুমানিক ৫০ গজ দূরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যায় নম্বর প্লেটবিহীন কালো রঙের সুজুকি জিক্সার ১৫০ সিসির মোটরসাইকেলটি।
এ দিকে পিবিআইয়ের হেফাজতে থাকা তাহসিফের বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে সাথে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এ সময় তারা মাজার বস্তি এলাকা এবং তুরাগ নদের তীরবর্তী বিআইডব্লিউটিএর ২৯ নম্বর সীমানা পিলার ঘুরে দেখেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, তাহসিফের লাশ উদ্ধারের স্থান রাজাবাড়ী ঘাট থেকে মাজার বস্তি এলাকার দূরত্ব প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার। তুরাগ নদের ওই অংশে জোয়ারের সময় প্রবল স্রোত থাকে। ফলে মাজার বস্তি এলাকায় কোনো অঘটন ঘটে থাকলে সেখান থেকে লাশ ভেসে উত্তরখানের দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পিবিআইয়ের ছায়াতদন্তের অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে দীপকে হেফাজতে নেয়া হয়। পরে তাকে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়।
‘ধাওয়ার মুখে নদে ঝাঁপ’, দীপের বক্তব্যে অসঙ্গতি
পিবিআইয়ের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দীপের দেয়া বক্তব্যে একাধিক অসঙ্গতি পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। বৃহস্পতিবার রাতে হেফাজতে নেয়ার পর দীপ প্রথমে দাবি করেন, ঘটনার রাতে উত্তরার হাউজ বিল্ডিং এলাকায় তাহসিফ ও তিনি বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। রাত ১২টার পর তাদের মধ্যে আর কোনো কথা বা যোগাযোগ হয়নি। তবে শুক্রবার দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ এবং মাজার বস্তি এলাকা পরিদর্শনের পর তিনি ভিন্ন বক্তব্য দেন।
পিবিআইয়ের তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে দীপ দাবি করেন, তারা দু’জন মোটরসাইকেলে করে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যান। সেখানে তুরাগ নদের তীরে কথা বলার সময় হঠাৎ পুলিশের পোশাক পরা বা পুলিশের মতো দেখতে দুই ব্যক্তি তাদের দিকে ধেয়ে আসেন। তাদের ধাওয়া খেয়ে দু’জন দৌড় দেন। একপর্যায়ে দীপ বিআইডব্লিউটিএর ২৯ নম্বর সীমানা পিলারের পেছনে লুকিয়ে পড়েন। আর তাহসিফ ভয়ে নদে ঝাঁপ দেন। পরে সুযোগ বুঝে মোটরসাইকেল নিয়ে সেখান থেকে চলে যান তিনি। রাত আড়াইটার দিকে বাসায় পৌঁছান বলেও দাবি করেন দীপ।
পিবিআই কর্মকর্তাদের ভাষ্য, দীপের এই বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে। বিশেষ করে তাহসিফ ও দীপ একসাথে সেখানে যাওয়ার পর কী ঘটেছিল, তাহসিফ নদে পড়ে যাওয়ার পর দীপ কেন তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করেননি কিংবা কাউকে বিষয়টি জানাননি- এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে। 
ওই রাতে সেখানে পুলিশের কোনো টহল দল ছিল কি না, নাকি কোনো সন্ত্রাসী বা মাদক কারবারি চক্র তাদের ধাওয়া করেছিল, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
‘তাহসিফ ভালো সাঁতার জানত’, বাবার ক্ষোভ
দীপের দেয়া ‘ধাওয়ার মুখে নদে ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যু’র বর্ণনা প্রত্যাখ্যান করেছেন তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম। পদ্মা অয়েল কোম্পানির সাবেক এই বোর্ড পরিচালক বলেন, তার ছেলে সাধারণ কেউ ছিলেন না। তিনি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ও প্রশিক্ষিত পাইলট। সামরিক প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে তাকে কঠোর সাঁতার প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছে। এ বিষয়ে তার পেশাগত সনদও রয়েছে।
তাহসিফের বাবা বলেন, ‘আমার ছেলে খুব ভালো সাঁতার জানত। পাইলট হিসেবে সামরিক প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবেই তাকে প্রফেশনাল সাঁতারের কঠিন কোর্স সম্পন্ন করতে হয়েছে। তার প্রফেশনাল সুইমিং সার্টিফিকেটও রয়েছে। যে ছেলে এত ভালো সাঁতার জানে, সে সামান্য ধাওয়া খেয়ে নদে ঝাঁপ দিয়ে ডুবে যাবে- এ কথা বিশ্বাসযোগ্য নয়।’
ছেলের মৃত্যুকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে সন্দেহ প্রকাশ করে তিনি বলেন, কে বা কারা তার ছেলেকে কেন ধাওয়া করবে? প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করতে ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা চলছে বলে তাদের সন্দেহ।
তিনি আরো প্রশ্ন তোলেন, সেখানে যদি কেবল ধাওয়ার ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে দীপ তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ বা পরিবারকে কিছু না জানিয়ে কেন চলে গেলেন? কেন তিনি প্রথমে এক ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন, পরে আরেক ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন?
ময়নাতদন্ত ও নতুন আলামত ঘিরে তদন্ত
তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার হওয়া তাহসিফের লাশ এবং মাজার বস্তি থেকে উদ্ধার করা নম্বর প্লেটবিহীন মোটরসাইকেল এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ আলামত।
নৌপুলিশের টঙ্গী ফাঁড়ি ও উত্তরখান থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, লাশের সুরতহাল প্রতিবেদনে ধারালো অস্ত্রের আঘাত বা দৃশ্যমান বাহ্যিক ক্ষতের উল্লেখ নেই। তবে নাক দিয়ে রক্তক্ষরণ, মুখে লালা এবং পেট ফোলা ছিল বলে জানানো হয়েছে। ময়নাতদন্ত ও ভিসেরা পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। পানিতে ডুবে মৃত্যু, বিষক্রিয়া কিংবা শ্বাসরোধের কোনো ঘটনা ঘটেছিল কি না, তা পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
এ দিকে উদ্ধার করা নম্বর প্লেটবিহীন সুজুকি জিক্সার মোটরসাইকেলটির ইঞ্জিন ও চেসিস নম্বরের মাধ্যমে প্রকৃত মালিকানা যাচাই করা হচ্ছে। এ জন্য বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সহায়তা নেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
পিবিআইয়ের পাশাপাশি নৌপুলিশ ও উত্তরখান থানা পুলিশও ঘটনাটির তদন্ত করছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মাজার বস্তি এলাকার বিভিন্ন তথ্য, সম্ভাব্য প্রত্যক্ষদর্শী এবং প্রযুক্তিগত আলামত বিশ্লেষণ করে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে।
মামলা না হলেও নিরপেক্ষ তদন্ত চান স্বজনেরা
তাহসিফের মৃত্যুর তিন দিন পার হলেও পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো থানায় লিখিত অভিযোগ বা মামলা দায়ের করা হয়নি। এ বিষয়ে তার বাবা কে এম এনায়েতুল করিম বলেন, দাফন-কাফনসহ পারিবারিক নানা ব্যস্ততার কারণে তারা এখনো থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ করতে পারেননি।
তিনি বলেন, ‘আমরা থানায় দুই লাইন লিখিত অভিযোগ দিলাম কি দিলাম না, সেটিকে মুখ্য করা উচিত নয়। রাষ্ট্রের নিজস্ব আইন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ববোধ থেকে এ ঘটনার নিরপেক্ষ ও গভীর তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। আমার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে, নাকি কোনো চক্রান্তের শিকার হয়েছে, তা রাষ্ট্রকে খুঁজে বের করতে হবে।’
উত্তরখান থানা ও নৌপুলিশ জানিয়েছে, পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ বা মামলা দায়ের করা হলে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে। বর্তমানে পিবিআই ও নৌপুলিশের সমন্বিত তদন্তে মাজার বস্তি এলাকার ঘটনাপ্রবাহ, উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেল এবং দীপের বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে। 
বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফ সাউরী গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর উত্তরার বাসা থেকে বের হন। সেদিন দিবাগত রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মাকে মুঠোফোনে বার্তা (ভয়েস মেসেজ) পাঠিয়ে তিনি জানিয়েছিলেন বাসায় ফিরছেন। কিন্তু আর ফেরেননি। পরদিন বুধবার বিকেলে উত্তরখান থানা এলাকার রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে তাহসিফের লাশ উদ্ধার করে নৌপুলিশ। পকেটে থাকা আইফোনের মাধ্যমের তার পরিচয় নিশ্চিত হয় পুলিশ।