গুম-নির্যাতন বন্ধে আইনি সুরক্ষা জোরদারের আহ্বান
ঢাকায় ফেজ ইন্টারন্যাশনালের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সম্মেলনে অতিথিরা।

নিজস্ব প্রতিবেদক

Advertisement

রাজনৈতিক পরিচয়, ধর্মীয় বিশ^াস কিংবা মতাদর্শের ভিন্নতা যা-ই থাকুক, আইনের চোখে প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন ঢাকায় আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সম্মেলনের বক্তারা। একই সাথে গুম, নির্যাতন, নির্বিচার আটক এবং নিরাপত্তা সংস্থার জবাবদিহিহীনতার বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি সুরক্ষা প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
গতকাল রাজধানীর বনানীর হোটেল সারিনায় যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা কেজ ইন্টারন্যাশনালের আয়োজনে ‘আউট অব দ্য শ্যাডো : বাংলাদেশে আইনের চোখে সমতা ও ন্যায়বিচার’ শীর্ষক সম্মেলনে এসব দাবি উঠে আসে। বাংলাদেশে সংস্থাটির এটিই প্রথম সম্মেলন।
এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের আইনজীবী, আলেম, মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক এবং অতীতে দীর্ঘদিন গোপনে আটক থাকার অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন ব্যক্তিরা অংশ নেন। সম্মেলনে দু’টি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম  অধিবেশনে গুম ও গোপন বন্দিত্বের শিকার ব্যক্তিরা তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। দ্বিতীয় অধিবেশনে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিয়ে আলোচনা হয়।
সম্মেলনে বক্তব্য দেন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আজমী, মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন, মুফতি হারুন ইজহার, মুফতি জসীমউদ্দীন রাহমানী, দৈনিক আমার দেশের সাংবাদিক আবু সুফিয়ান, শের মুহাম্মদ ও মাওলানা মীর ইদরীস। দু’টি অধিবেশনই পরিচালনা করেন কেজ ইন্টারন্যাশনালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ রব্বানী।
অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আজমী বলেন, কয়েক প্রজন্মকে বোঝাতে হবে যে মানুষের জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য শুধু পার্থিব অর্জন নয়, বরং আখিরাতের জবাবদিহিও। মানুষের মধ্যে এই উপলব্ধি তৈরি হলে অন্যায় করার আগে তারা বারবার চিন্তা করবে।
মুফতি হারুন ইজহার ভুক্তভোগীদের আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, অন্যায়ের শিকার ব্যক্তিদের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ তৈরি করা সবার দায়িত্ব।
দৈনিক আমার দেশের সাংবাদিক আবু সুফিয়ান বলেন, সব ধরনের অন্যায় ও গুমের বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের সবসময় সোচ্চার থাকতে হবে। রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা মতাদর্শের ভিন্নতার কারণে কারো ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার ক্ষুণœ হতে পারে না। প্রত্যেকের জন্য সমান বিচার নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত সাংবাদিকতার অন্যতম অঙ্গীকার।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন আগের সরকারের আমলে মুসলিমদের ওপর নির্যাতন, হয়রানি ও মিথ্যা মামলার বিষয়গুলো তুলে ধরেন। তিনি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোকে রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে বিবেচনা করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন।
সম্মেলনে কেজ ইন্টারন্যাশনালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ রব্বানী বলেন, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যক্রম যখন জবাবদিহির বাইরে চলে যায়, তখন নাগরিকের মৌলিক অধিকার মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ে। অতীতে নিরাপত্তা সংস্থার কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে এমন পরিস্থিতির ভয়াবহতা প্রকাশ পেয়েছে।
তিনি বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতি প্রতিরোধে কয়েকটি মৌলিক আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে হেবিয়াস কর্পাস বা আটক ব্যক্তিকে আদালতে হাজির করার অধিকার, নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা স্বীকারোক্তি গ্রহণ না করা, কী অভিযোগে কাউকে আটক করা হয়েছে তা জানার অধিকার এবং ন্যায্য বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তা।
রব্বানী বলেন, এসব নীতি রাজনৈতিক বিশ^াস কিংবা ধর্মীয় অবস্থান নির্বিশেষে সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে কার্যকর হতে হবে। স্বচ্ছ ও ন্যায্যবিচার প্রক্রিয়ায় যারা অপরাধী প্রমাণিত হবেন, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। কিন্তু যে ন্যায়বিচার কেবল একটি পক্ষকে সুরক্ষা দেয়, সেটি প্রকৃত অর্থে ন্যায়বিচার নয়।
তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে অতীতে কারাবরণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। নির্যাতনের ঘটনায় তিনি তার ভাইকে হারিয়েছেন। তার মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী, দীর্ঘদিন গৃহবন্দী ছিলেন। এসব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সব ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে এবং সবার ন্যায়বিচারের পক্ষে অবস্থান নেয়া জরুরি।
রব্বানীর ভাষায়, ‘এ কারণেই আমরা সবার জন্য, সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলি এবং বলব। আমরা বিশ^াস করি, ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার সবার সমান।’
কেজের প্রতিবেদন ও পরবর্তী কর্মসূচি
সম্মেলনটি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে কেজ ইন্টারন্যাশনালের প্রকাশিত ‘আউট অব দ্য শ্যাডো অব হাসিনা’ শীর্ষক প্রতিবেদনের ধারাবাহিকতায় আয়োজন করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার শাসনামলে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে কীভাবে ভিন্নমত দমনের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে, তা বিশ্লেষণ করা হয়।
সংস্থাটি জানিয়েছে, ঢাকার সম্মেলনে উত্থাপিত অভিজ্ঞতা ও বক্তব্য আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরতে তারা কয়েকটি উদ্যোগ নেবে। প্রথমত, সম্মেলনে দেয়া সাক্ষ্য ও বক্তব্য প্রকাশ করা হবে, যাতে বাংলাদেশের বাইরেও এসব অভিজ্ঞতা পৌঁছানো যায়। দ্বিতীয়ত, আলোচনায় উঠে আসা ঘটনা ও উদ্বেগ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, আইনজীবী এবং শিক্ষাবিদদের কাছে তুলে ধরা হবে।
এ ছাড়া আটক ব্যক্তিদের আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশের পরিবার ও আইনজীবীদের আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের সাথে যুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হবে। একই সাথে গুম ও নির্বিচার আটকের শিকার ব্যক্তি, তাদের পরিবার, অধিকারকর্মী এবং সাংবাদিকদের পাশে থেকে এসব ঘটনার বিরুদ্ধে সমন্বিত অবস্থান গড়ে তোলার চেষ্টা করবে সংস্থাটি।
কেজ ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, তারা বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দল বা আন্দোলনের পক্ষ নেয় না। নির্বিচার আটক, গুম, নির্যাতন এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপব্যবহারের তথ্য নথিভুক্ত ও ভুক্তভোগীদের পরিবারের সাথে কাজ করাই তাদের কার্যক্রমের অংশ। দুই দশকের বেশি সময় ধরে সংস্থাটি এসব বিষয়ে কাজ করছে।
সম্মেলনের আয়োজকদের মতে, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার প্রতিরোধে কার্যকর আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠা এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ ক্ষেত্রে শুধু অতীতের অপরাধের বিচার নয়, ভবিষ্যতে যাতে কোনো নাগরিক গুম, নির্যাতন বা বেআইনি আটকের শিকার না হন, সে জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।