গাজার পক্ষে বিশ্বজুড়ে বন্দরশ্রমিকদের ধর্মঘট

আলজাজিরা
যুদ্ধের বিরুদ্ধে ও অস্ত্র রফতানিতে বন্দর ব্যবহার বন্ধের দাবিতে বিশ্বের পাঁচ মহাদেশের ২২টি দেশের ১১০টি বন্দরে ধর্মঘট পালন করেছেন বন্দরশ্রমিকেরা। গতকাল শুক্রবারের এ কর্মসূচিতে ২৫টি শ্রমিক ইউনিয়ন অংশ নিয়েছে। আয়োজকদের দাবি, একযোগে এই কর্মসূচির মাধ্যমে ইসরাইলের সাথে অস্ত্রবাণিজ্য ও সামরিক সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘœ ঘটানো সম্ভব।
‘ডকওয়ার্কার্স ডু নট ওয়ার্ক ফর ওয়ার’ (বন্দরশ্রমিকেরা যুদ্ধের জন্য কাজ করেন না) স্লোগানে এ আন্তর্জাতিক কর্মসূচি পালিত হয়েছে। শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর প্রধান দাবি, ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর গণহত্যা এবং সব সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ অবিলম্বে বন্ধ করা। ইউনিয়নগুলোর ঘোষণায় ১৯৬৭ সালের সীমানার ভিত্তিতে পূর্ব জেরুসালেমকে রাজধানী করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বীকৃতি দেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য ও ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ বন্ধেরও দাবি তোলা হয়েছে।
ভূমধ্যসাগর থেকে পাঁচ মহাদেশে বিস্তার
বন্দরশ্রমিকদের এই আন্তর্জাতিক উদ্যোগের সূচনা ২০২৫ সালের শুরুতে। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশের শ্রমিক ইউনিয়ন বেসরকারিকরণ এবং ফিলিস্তিনে ইসরাইলি সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে কী করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা শুরু করে। প্রথম পর্যায়ে পাঁচটি দেশের ২০টি বন্দরে কাজ করা পাঁচটি ইউনিয়ন এতে যুক্ত ছিল। পরে এথেন্স, জেনোয়া ও ইস্তাম্বুলে ধারাবাহিক বৈঠকের মধ্য দিয়ে আন্দোলনের পরিসর বাড়ে। গ্রিসে বন্দরশ্রমিকদের পাশাপাশি অন্য খাতের শ্রমিকদেরও যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। ইতালিতে ইউনিয়ন ইউএসবি সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে।
অস্ত্র পরিবহনে বাধা দেয়াই লক্ষ্য
এই আন্দোলনের অন্যতম লক্ষ্য ইসরাইলের কাছে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম পৌঁছানোর প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করা। অস্ত্র সরবরাহের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক নিয়ে কাজ করা প্রচারগোষ্ঠী ‘নো হারবার ফর জেনোসাইড’ (এনএইচজি) বলছে, ইউরোপের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দরের সাথে ইসরাইলের অস্ত্র পরিবহনের যোগসূত্র রয়েছে। এর মধ্যে ইতালির জেনোয়া, লিভোর্নো ও জিওয়া তাউরো, ফ্রান্সের মার্সেই, গ্রিসের পিরেয়ুস এবং মরক্কোর তাঞ্জিয়ার বন্দর উল্লেখযোগ্য।
এনএইচজির দাবি, ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তারা ২৯টি দেশের ৫৬টি বাণিজ্যিক বন্দরের মধ্য দিয়ে ইসরাইলের বৃহত্তম অস্ত্র প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এলবিট সিস্টেমসের জন্য বিভিন্ন যন্ত্রাংশের ৩১৫টি চালান পরিবহনের তথ্য সংগ্রহ করেছে। এসব ৫৬টি বন্দরও ৩০ অক্টোবরের কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছে। সংগঠনটির হিসেবে, ধর্মঘটের দিন দুই বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের পণ্য পরিবহন কার্যক্রম স্থবির হয়ে থাকতে পারে। এনএইচজির এক মুখপাত্রের দাবি, ইসরাইলের আমদানি-রফতানির প্রায় ৯৫ শতাংশ সমুদ্রপথে সম্পন্ন হয়। ফলে ভূমধ্যসাগরের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলোতে কর্মবিরতি হলে ইসরাইলের সাথে সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক ও সামরিক সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে। 
শ্রমিকদের সংহতি, রাজনৈতিক চাপের বার্তা
বন্দরশ্রমিকদের আন্দোলন শুধু পণ্য পরিবহন বন্ধ রাখার কর্মসূচি নয়; এটি যুদ্ধের সাথে যুক্ত বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর বিরুদ্ধে শ্রমজীবী মানুষের অবস্থানেরও প্রকাশ। ইতালির শ্রমিক ইউনিয়ন ইউএসবির পরিবহন ও বন্দরবিষয়ক জাতীয় সম্পাদক ফ্রানচেস্কো স্তাচ্চিওলি বলেছেন, প্রতিটি ইউনিয়ন নিজস্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কর্মসূচি পালন করবে, তবে সবার অবস্থান ও দাবি একই নীতির সাথে যুক্ত থাকবে। গাজা থেকে ২০১৫ সালে জার্মানিতে চলে যাওয়া বন্দরশ্রমিক মোহাম্মদ আল-আত্তার মনে করেন, শ্রমিকেরাই পরিবর্তন আনার ক্ষমতা রাখেন। তার মতে, মাত্র দুই দিন কাজ বন্ধ রাখলেও হাজারো মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব হতে পারে। ফিলিস্তিনের শ্রমিক আন্দোলনও এই ধর্মঘটের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। তারা বয়কট, বিনিয়োগ প্রত্যাহার ও নিষেধাজ্ঞা (বিডিএস) আন্দোলন জোরদার করে ইসরাইলের দখলদারত্ব, বর্ণবাদী ব্যবস্থা ও সামরিক অভিযানের সাথে যুক্ত রাষ্ট্রীয়, করপোরেট ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে ইরাক যুদ্ধ- বিভিন্ন সময় সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বন্দরশ্রমিকদের প্রতিবাদের নজির রয়েছে। এবার ২২টি দেশের বন্দরশ্রমিকদের একযোগে কর্মসূচি সেই ঐতিহ্যকেই নতুন মাত্রা দিচ্ছে।
ধর্মঘট কতটা পরির্বতন আনতে পারবে?
গাজার জন্য এই ধর্মঘটের তাৎপর্য মূলত দু’টি জায়গায়। প্রথমত, অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনের সাথে যুক্ত বন্দরগুলোতে কর্মবিরতি হলে সরবরাহব্যবস্থায় সাময়িক বিঘœ ঘটতে পারে। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন দেশের শ্রমিক ইউনিয়নের সম্মিলিত অবস্থান সরকার ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর রাজনৈতিক ও নৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যেসব বন্দরের মাধ্যমে ইসরাইলের অস্ত্র ও সামরিক উপকরণ পরিবহনের তথ্য পাওয়া গেছে, সেগুলোতে শ্রমিকদের অস্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। 
সব মিলিয়ে, বন্দরশ্রমিকদের এই উদ্যোগ গাজার যুদ্ধক্ষেত্রে সরাসরি কোনো সামরিক পরিবর্তন আনবে না। কিন্তু যুদ্ধের পেছনে থাকা সরবরাহব্যবস্থায় শ্রমিকদের ভূমিকা এবং তাদের সম্মিলিত অস্বীকৃতির শক্তি সামনে আনবে।

Advertisement