
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
কানাডার টরেন্টোতে সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা আর থাকতে চাচ্ছেন না। ক্যান্সারে আক্রান্ত সাবেক এ বিচারপতির কাছে পাসপোর্ট না থাকায় সিঙ্গাপুরে ৯ বছর ধরে চিকিৎসার জন্যে যেতে পারছেন না তিনি। দেশে ফিরে আইনের কাছে আত্মসমর্পণের ইচ্ছা জানিয়ে তিনি কানাডার বিভিন্ন মিডিয়া ও ইউটিউব চ্যানেলের কাছে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন বর্তমান আইনমন্ত্রীসহ একাধিক মন্ত্রীর সাথে কথা বলেছেন তিনি। পাসপোর্ট ফেরত চেয়েছেন। অবিলম্বে দেশে ফিরতে চান তিনি। তার কথা হয়েছে সরকারি দল বিএনপির একাধিক নেতার সাথেও। তাদের তিনি বলেছেন দেশে ফিরেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে চান। পেনশনটা ফেরত চান। কোনো অন্যায় করিনি, অবশ্যই আইনের কাছে আত্মসমর্পণ করব, আমি কোনো ভয় পাই না। আমি প্রতিহিংসার শিকার।
২০১৭ সালের ১৩ অক্টোবর চিকিৎসার নামে দেশত্যাগে সাবেক এ প্রধান বিচারপতিকে বাধ্য করা হয় বলে দাবি করেছেন তিনি। বলেছেন দেশত্যাগের আগে পনের দিন গৃহবন্দী ছিলেন। টরেন্টোতে বিভিন্ন মিডিয়াকে তিনি বলছেন, রিফিউজি হিসেবে ভাসমান হয়ে আছেন তিনি। পাসপোর্ট চেয়ে আবেদন করলেও এখনও কোনো সাড়া পাননি। শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে তার বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের মামলা করা হয়। একটি মামলায় তাকে ১১ বছরের কারাদ- দেওয়া হয়েছে, যেটিকে তিনি সম্পূর্ণ সাজানো ও মিথ্যা বলে দাবি করেছেন। এস কে সিনহা জানিয়েছেন যে তিনি দেশে ফিরে সংশ্লিষ্ট আদালতে আত্মসমর্পণ করতে এবং আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো মিথ্যা প্রমাণ করতে প্রস্তুত।
যেভাবে বিরোধ শুরু
মাজদার হোসেন মামলায় নি¤œ আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলা বিধি সুপ্রিম কোর্টের অধীনে ন্যস্ত করার কথা ছিল। কোনো সরকার বা কোনো প্রধানবিচারপতি এ নির্দেশনা বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেয়নি। প্রধানবিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পেয়ে এ নির্দেশনা দিলে সরকারের সঙ্গে এস কে সিনহার বিরোধ শুরু হয়। মাজদার হোসেন মামলার রায়ের আলোকে একটা রুলস ফ্রেম করে বিষয়টি প্রকাশ করে সরকারকে বাস্তবায়নের তাগিদ দেন তিনি। কিন্তু অন্যান্য বিচারপতিরা বিষয়টি আমলে নেননি। একই সাথে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের পার্লামেন্টের অধীনে নিয়ন্ত্রণ করার পরামর্শ দেয়া হয় শেখ হাসিনাকে। এটা হলে বিচারকরা সাংবিধানিক অধিকার হারানোর পাশাপাশি বিচারবিভাগ থাকা না থাকা সমান হয়ে যায় বলে মনে করেন এস কে সিনহা। নিম্ন আদালতের সৎ ও যোগ্য বিচারকদের ঢাকা ও চট্টগ্রামে নিয়োগ দেয়ার উদ্যোগ নেন তিনি। ঢাকার মতো জায়গায় মেট্রোপলিটন সেশন জাজের পদ ছয় মাসের বেশি শূন্য ছিল। চট্টগ্রাম ও সিলেটেও এ পদ খালি ছিল। এস কে সিনহা অভিযোগ করে বলেন সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক দুর্নীতিগ্রস্ত বিচারকদের নিয়োগ ও পদায়ন করতেন। শেখ হাসিনাকে পাবলিক মিটিংয়ে সরাসরি বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে সাংঘর্ষিক অবস্থা নিরসনের জন্যে আহবান জানান এস কে সিনহা। শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে এস কে সিনহা বলেন, লাখ লাখ মামলা জট, গণতান্ত্রিক সরকার হিসেবে উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে এ অবস্থা নিরসনে আইনমন্ত্রী ও আইন সচিবের বিষয়টির সুরাহা প্রয়োজন। বিচারবিভাগকে দমিয়ে পারবেন না, স্বাধীন করতে হবে।
চূড়ান্ত বিরোধ বঙ্গভবনে
সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে রায়ের আগের দিন রাতে এস কে সিনহাকে ডেকে নেয়া হয় বঙ্গভবনে। ২০১৭ সালে দোসরা অক্টোবর বিকেলে সাবেক প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদের কফি খাওয়ার নিমন্ত্রণ রক্ষায় বঙ্গভবনে যান এস কে সিনহা। কুশল বিনিময়ের পর শেখ হাসিনা ষোড়শ সংশোধনীর রায় সরকারের পক্ষে দেয়ার কথা বলেন। বিব্রতবোধ ও অপরাগতা জানিয়ে এস কে সিনহা পদত্যাগের প্রস্তাব দিয়ে বলেন, সুপ্রিম কোর্টকে সরকারের পদদলিত হতে দেবো না, সরকারের পক্ষে রায় দিলে সারা জীবন কলঙ্কিত হয়ে যাবো। আমার ডেডবডি মাড়িয়ে আপনারা চলে গেলেও আমি তা পারব না। তা ছাড়া আরো ছয়জন বিচারপতি রায় দেবেন জানালে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয় প্রধান বিচারপতিকেই ষোড়শ সংশোধনীর রায় সরকারের পক্ষে দিতে হবে। এ পর্যায়ে চরম বিতর্ক শুরু হয়। পদত্যাগ করলে ষোড়শ সংশোধনীর রায়ও হবে না। তারা তখন বললেন পদত্যাগ করবেন না। পদত্যাগ করলে সবার কাছে খারাপ একটা ম্যাসেজ চলে যাবে। বঙ্গভবনে আর কফি খাওয়া হলো না সাবেক প্রধান বিচারপতির। রাত সাড়ে ১২টার পর তিনি বঙ্গভবন ত্যাগ করলেন। এবং পরের দিন ষোড়শ সংশোধনীর রায় দিলেন এস কে সিনহা। বিচারপতি খায়রুল হক প্রেস কনফারেন্স করে প্রধান বিচারপতির সমালোচনা করলেন। মন্ত্রী থেকে শুরু করে সংসদে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা এস কে সিনহাকে নিয়ে চরম সমালোচনা হয়।
বিচারবিভাগকে স্বাধীন রাখা কি সম্ভব
সাবেক এ বিচারপতি বলেন, দুনিয়ার কোথাও বিচার বিভাগকে স্বাধীন রাখা সম্ভব হয়নি। কিন্তু সহনীয় পর্যায়ে বিচার বিভাগকে যদি কাজ করতে দেয়া না হয় তাহলে দেশে গণতন্ত্র আসবে না, উন্নতি হবে না। রাজনৈতিক কারণেই তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা হয়েছে বলে দাবি করেন এস কে সিনহা। তিনি বলেন, রাজউকের অনুমতি নিয়ে বাড়ি বিক্রি করেছি। আমার বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার আগেই ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে। সিনহা মনে করেন জনগণের ভোট ছাড়া যে কোনো সরকার শেষ পর্যন্ত একনায়কতন্ত্রে পরিণত হয়। তবে কয়েকটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে সরকার পরিবর্তন হলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে। স্থানীয় সরকার উন্নয়নে গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন এই ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করলে দেশে সত্যিকার উন্নতি সম্ভব।
দেশে ফিরতে বাধা নেই তবু
এস কে সিনহা বলেন, আমার দেশে ফিরতে বাধা নেই কিন্তু পাসপোর্ট ফেরত পাচ্ছি না। খুব খারাপ দিন যাচ্ছে। আমি থাকব বলে তো দেশ ছেড়ে আসিনি। বিচারকদের প্রতি বিবেকের বাইরে রায় না দিয়ে স্বাধীনভাবে বিচার পরিচালনার আবেদন জানিয়ে এস কে সিনহা বলেন, রাজনৈতিক কারণে কোনো বিচারপ্রার্থী যেনো হয়রানির শিকার না হয়। বিশেষ করে রিমান্ডের নামে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে যেন কাউকে হয়রানি করা না হয়। বিচার বিভাগের প্রতি আস্থা ফিরে পেলেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পাবে ও মানুষের অধিকার নিশ্চিত হবে। একই সাথে তিনি বলেন, দেশে খুন খারাপি বেড়ে যাচ্ছে এবং দুর্ঘটনায় প্রতিনিয়ত মানুষ মারা যাচ্ছে এসব নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। দেশে ফিরতে পারলে বাকি জীবন তিলকপুরে গ্রামের বাড়িতে সামাজিক কাজের জড়িত থেকেই কাটিয়ে দিতে চান তিনি।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








