এলপিজির দাম, ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডার, বিইআরসি গণশুনানি, এলপিজি ব্যবসায়ীদের কমিশন, এলপিজি বাজারে অতিরিক্ত দাম, ৬৩০ কোটি টাকা অতিরিক্ত আদায়, এলপিজি সরবরাহ সঙ্কট
এলপিজি গ্যাস।

 

Advertisement

বাজারে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দামে মিলছে না তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)। ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের সরকার নির্ধারিত দাম এক হাজার ৮৩৭ টাকা হলেও কোথাও কোথাও তা বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার ৩০০ থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকায়। অর্থাৎ, একটি সিলিন্ডার কিনতে ভোক্তাদের নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪৬৩ থেকে ৬৬৩ টাকা পর্যন্ত বেশি গুনতে হচ্ছে। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, এক মাসে ভোক্তাদের কাছ থেকে ৬৩০ কোটি টাকা অতিরিক্ত আদায় করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই এলপিজির বোতলজাতকরণ, বিতরণ ও খুচরা বিক্রির চার্জ এবং ব্যবসায়ীদের কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা। এসব প্রস্তাব পর্যালোচনায় গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ইস্কাটনে বিয়াম মিলনায়তনে গণশুনানি শুরু করেছে বিইআরসি। শুনানিতে এলপিজি আমদানিকারকেরা বর্তমান কমিশন দুই থেকে আড়াই গুণ এবং পরিবেশকেরা তিন গুণ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে এসব প্রস্তাব অনুমোদন করা হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
গতকাল রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে বেসরকারি এলপিজির আমদানি, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতা পর্যায়ে কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে এ গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ, সদস্য আব্দুর রজ্জাক, মো: মিজানুর রহমান এবং ব্রিগেডিয়ার (অব:) শাহিদ সারওয়ার উপস্থিত ছিলেন। শুনানিতে এলপিজি আমদানিকারকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তোলেন পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতারা। ভোক্তাদের প্রতিনিধি এবং কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) প থেকেও নানা প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়। তবে এসব প্রশ্নের অনেকগুলোরই সন্তোষজনক জবাব পাওয়া যায়নি। ফলে শুনানিতে আমদানিকারক ও বিইআরসিকে কঠোর প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়।
৬৩০ কোটি টাকা বাড়তি আদায়ের অভিযোগ
গণশুনানিতে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির প থেকে অধ্যাপক সৈয়দ মিজানুর রহমান অভিযোগ করেন, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পাঁচটি কোম্পানির বিরুদ্ধে বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরির অভিযোগ তুলেছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে বিইআরসি কারণ দর্শানোর নোটিশও দিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেগুলোর অগ্রগতি সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তিনি দাবি করেন, দাম বাড়িয়ে গত এক মাসে ভোক্তাদের কাছ থেকে প্রায় ৬৩০ কোটি টাকা অতিরিক্ত আদায় করা হয়েছে। অন্য দিকে এ ঘটনায় খুচরা বিক্রেতাদের মাত্র ১১ লাখ টাকা জরিমানা করেছে ভোক্তা অধিকার সংরণ অধিদফতর। অধ্যাপক মিজানুর রহমান প্রশ্ন তোলেন, এত বিপুল পরিমাণ অর্থ অতিরিক্ত আদায়ের অভিযোগের বিপরীতে সামান্য জরিমানা করার মাধ্যমে কি ওই অর্থ আদায় বৈধ হয়ে যায়? শুনানিতে এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর না পাওয়ায় বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির প থেকে গণশুনানি বর্জনের ঘোষণা দেন তিনি।
কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব
বিইআরসিতে জমা দেয়া আবেদন অনুযায়ী, এলপিজি কোম্পানিগুলো ১২ কেজির সিলিন্ডারপ্রতি কমিশন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়াতে চায়। প্রস্তাবে ওমেরা পেট্রোলিয়াম ১৯১ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৭৮ টাকা, পেট্রোম্যাক্স ৩৪৯ টাকা, ডেল্টা ৩৬০ টাকা এবং মেঘনা গ্রুপ ৩০০ টাকা করার আবেদন জানিয়েছে। অন্য দিকে পরিবেশকেরা প্রতি ১২ কেজির সিলিন্ডারে কমিশন ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছেন। খুচরা বিক্রেতারা তাদের কমিশন ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন। এ ছাড়া বোতলজাতকরণ, বিতরণ ও খুচরা বিক্রির চার্জ বাড়ানোর পৃথক প্রস্তাবও রয়েছে। কোম্পানিগুলো বোতলজাতকরণ চার্জ প্রতি কেজিতে ১৫ থেকে ১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ থেকে ৩০ টাকা করতে চায়। পরিবেশকদের চার্জ প্রতি কেজিতে ৪ টাকা ১৭ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা ৩৩ পয়সা এবং খুচরা বিক্রেতাদের চার্জ ৩ টাকা ৭৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১০ টাকা করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। ব্যবসায়ীদের যুক্তি, পরিবহন ব্যয়, শ্রমিকের মজুরি, গুদামভাড়া ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। বর্তমান কমিশনে ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে তাদের দাবি। তবে এসব ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব ভোক্তাদের ওপর কতটা পড়বে এবং প্রস্তাবিত কমিশন যৌক্তিক কি না, তা গণশুনানিতে পর্যালোচনার বিষয়।
আগেই বেড়েছে সিলিন্ডারের দাম
সর্বশেষ গত ৪ অক্টোবর ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে এক হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে বিইআরসি। ওই সিদ্ধান্তে প্রতি কেজি এলপিজির দাম নির্ধারণ করা হয় ১৫৩ টাকা ৬ পয়সা। একই সাথে অন্যান্য ওজনের সিলিন্ডার এবং অটোগ্যাসের দামও বাড়ানো হয়।
বিইআরসির নির্ধারিত দাম অনুযায়ী, সাড়ে পাঁচ কেজির সিলিন্ডারের মূল্য ৮৪২ টাকা, সাড়ে ১২ কেজির এক হাজার ৯১৩ টাকা, ১৫ কেজির দুই হাজার ২৯৬ টাকা এবং ২০ কেজির সিলিন্ডারের দাম তিন হাজার ৬১ টাকা। এ ছাড়া ২৫ কেজির সিলিন্ডার তিন হাজার ৮২৭ টাকা, ৩০ কেজির চার হাজার ৫৯২ টাকা এবং ৪৫ কেজির সিলিন্ডার ছয় হাজার ৮৮৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়। অটোগ্যাসের দাম প্রতি লিটার ৭৩ টাকা ৯ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৮৪ টাকা ৬২ পয়সা করা হয়। কিন্তু দাম বাড়ানোর পরও বাজারে নির্ধারিত মূল্যে এলপিজি না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ভোক্তাদের অভিযোগ, দোকানভেদে দামের পার্থক্য রয়েছে এবং অনেক েেত্র নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কয়েক শ’ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। ফলে নতুন করে কমিশন ও চার্জ বাড়ানোর প্রস্তাব তাদের উদ্বেগ আরো বাড়িয়েছে।
ধর্মঘটের হুমকি, বৈঠক ও গণশুনানি
কমিশন বাড়ানোর দাবিতে এর আগে দেশব্যাপী দুই দিনের ধর্মঘটের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন এলপিজি ব্যবসায়ীরা। এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির নেতারা পরিবহন, শ্রমিকের মজুরি, গুদামভাড়া ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরে কমিশন বাড়ানোর দাবি জানান।
গত ১৪ অক্টোবর বিইআরসি দাবিগুলো নিয়ে শুনানির আশ্বাস দিলে ব্যবসায়ীরা ধর্মঘট প্রত্যাহার করেন। এর আগে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এবং বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এলপিজি অপারেটরদের সাথে বৈঠক করেন। বিইআরসি জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আবেদনের ভিত্তিতেই গণশুনানির আয়োজন করা হয়েছে। শুনানিতে প্রস্তাবের প-েবিপে যুক্তি, ব্যয়ের হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য পর্যালোচনা করা হবে। শুনানি আয়োজনের অর্থ এই নয় যে প্রস্তাবগুলো অনুমোদিত হয়ে গেছে বা এলপিজির দাম নিশ্চিতভাবেই বাড়বে।
কৃত্রিম সঙ্কট নিয়ে উদ্বেগ
এলপিজির বাজারে অতিরিক্ত দাম আদায়ের পাশাপাশি কৃত্রিম সঙ্কট তৈরির অভিযোগও উঠেছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর জ্বালানিমন্ত্রী জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, কোথাও কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি করা হচ্ছে কি না, তা তদন্ত করে দেখতে। দেশে এলপিজি আমদানির জন্য নিবন্ধিত কোম্পানি রয়েছে ৩০টি। এর মধ্যে ছয়টি কোম্পানি নিয়মিত আমদানি করে। পাশাপাশি আমদানিকারকদের কাছ থেকে গ্যাস সংগ্রহ করে নিজস্ব প্ল্যান্টে সিলিন্ডারজাত করার কাজে যুক্ত রয়েছে আরো ১২টি প্রতিষ্ঠান। এতগুলো প্রতিষ্ঠান বাজারে যুক্ত থাকলেও সরবরাহ, মূল্য নির্ধারণ এবং খুচরা পর্যায়ে বিক্রির েেত্র কার্যকর তদারকি কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ভোক্তাদের স্বার্থ রাই বড় চ্যালেঞ্জ
এলপিজি এখন শহর ও গ্রামÑ উভয় অঞ্চলের বহু পরিবারের রান্নার প্রধান জ্বালানি। ফলে এই পণ্যের দাম বাড়লে সরাসরি সংসারের ব্যয় বৃদ্ধি পায়। নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ে। এ অবস্থায় বিইআরসির সামনে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। এক দিকে ব্যবসায়ীদের প্রকৃত পরিচালন ব্যয় যাচাই করে যৌক্তিক কমিশন নির্ধারণ করা, অন্য দিকে ভোক্তারা যাতে নির্ধারিত দামে এলপিজি পান, তা নিশ্চিত করা। শুধু দাম ও কমিশন পুনর্নির্ধারণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; সরবরাহব্যবস্থা, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতা পর্যায়ে নজরদারি এবং অতিরিক্ত দাম আদায়ের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়াও জরুরি।
সবমিলিয়ে, নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েক শ’ টাকা বেশি দিয়ে এলপিজি কেনার পরিস্থিতিতে নতুন করে কমিশন ও চার্জ বাড়ানোর প্রস্তাব ভোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। গতকালের গণশুনানিতে ব্যবসায়ীদের দাবির যৌক্তিকতা যাচাইয়ের পাশাপাশি বাজারে ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, বিইআরসির সিদ্ধান্তে ব্যবসায়ীদের ব্যয়সংক্রান্ত দাবি কতটা প্রতিফলিত হয় এবং সাধারণ ভোক্তারা শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত দামে এলপিজি পান কি না।