
বাংলাদেশ ব্যাংকের জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রান্তিকের মূল্যস্ফীতি বিশ্লেষণ বলছে, সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি কমলেও জ্বালানি, আমদানিনির্ভর পণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের চাপ পুরোপুরি কাটেনি। এর সাথে মজুরি বৃদ্ধির গতি দুর্বল থাকায় সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়মতা চাপে রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা বিভাগের গতকাল প্রকাশিত ওহভষধঃরড়হ উুহধসরপং রহ ইধহমষধফবংয প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) গড় বার্ষিক মূল্যস্ফীতি নেমে এসেছে ৮.৩১ শতাংশে। আগের প্রান্তিকে এই হার ছিল ৯.২১ শতাংশ; অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির হার কমেছে, কিন্তু পণ্যের দাম সার্বিকভাবে কমে গেছেÑ এমন নয়; বরং আগের বছরের তুলনায় দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে।
মূল্যস্ফীতির নতুন গতি-প্রকৃতি : সেপ্টেম্বরে আবার ঊর্ধ্বমুখী
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রান্তিকভিত্তিক বিশ্লেষণে মূল্যস্ফীতির গতি কমার চিত্র পাওয়া গেলেও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ মাসিক হিসাবে সেপ্টেম্বরেই মূল্যস্ফীতি আবার বেড়েছে। ৭ অক্টোবর প্রকাশিত বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.৩৪ শতাংশ, যা আগস্টে ছিল ৮.২৬ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭.০২ থেকে বেড়ে ৭.২২ শতাংশ হয়েছে। বিপরীতে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে ৯.৩০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
এই দুই পরিসংখ্যানের মধ্যে মৌলিক কোনো বিরোধ নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮.৩১ শতাংশ হলো জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের গড় মূল্যস্ফীতি; আর ৮.৩৪ শতাংশ হলো শুধু সেপ্টেম্বর মাসের বার্ষিক তুলনাভিত্তিক হার। প্রান্তিকের গড় কমলেও শেষ মাসে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারেÑ বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটিই ঘটেছে।
খাদ্যে কিছুটা স্বস্তি, জ্বালানিতে চাপ
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রথম প্রান্তিকে খাদ্য মূল্যস্ফীতি আগের প্রান্তিকের ৮.৬৮ শতাংশ থেকে কমে ৭.১৩ শতাংশ হয়েছে। শাকসবজি ও চাল-গমজাতীয় পণ্যের মূল্যস্ফীতিতে অবদান কমে যাওয়ায় এই উন্নতি হয়েছে। তবে দুধ, মাছ, ডিম, গোশত ও ডালসহ প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্যপণ্য খাদ্য মূল্যস্ফীতির প্রধান চালক হিসেবে রয়ে গেছে। এসব পণ্যের সম্মিলিত অবদান ছিল খাদ্য মূল্যস্ফীতির ৫১.১ শতাংশ।
অন্য দিকে ভোজ্যতেল এবং মসলা ও রান্নার উপকরণের অবদান বেড়েছে। ফলে কিছু খাদ্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকলেও পরিবারের নিয়মিত খাদ্যব্যয়ের ওপর চাপ পুরোপুরি কমেনি। বিশেষত স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোকে পুষ্টিকর খাবার কেনার েেত্র ব্যয়সঙ্কোচন করতে হতে পারে।
প্রতিবেদনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক জ্বালানি মূল্যস্ফীতি। জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে এ হার বেড়ে ১৭.৪ শতাংশ হয়েছে, যা আগের প্রান্তিকে ছিল ১৭ শতাংশ। কাঠ, কৃষিজ উপজাত, গোবর ও পাটকাঠির মতো কঠিন জ্বালানির মূল্যস্ফীতি বেড়ে ২২.১ শতাংশ হয়েছে। জ্বালানি ও লুব্রিক্যান্টের মূল্যস্ফীতিও ১৩.৮ থেকে বেড়ে ১৪.৭ শতাংশে উঠেছে। সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে জ্বালানি খাতের অবদানও বেড়েছে। আগের প্রান্তিকে যেখানে এ অবদান ছিল ১১.৮৫ শতাংশ, প্রথম প্রান্তিকে তা বেড়ে ১৩.৪৪ শতাংশ হয়েছে। একই সময়ে মূল বা কোর মূল্যস্ফীতি কমে ৮.৪০ থেকে ৭.৯৩ শতাংশে নেমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সতর্ক করেছে, সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে অভ্যন্তরীণ জ্বালানির দাম বাড়ানোর প্রভাব তখনো বিবিএসের মূল্যসূচকে পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি। ফলে পরিবহন, উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহের ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে আগামী মাসগুলোতে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেপ্টেম্বরের শেষ ভাগে মূল্যস্ফীতি বাড়ার পেছনে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবের কথাও উঠে এসেছে সংবাদ প্রতিবেদনে। ফলে শুধু খাদ্যপণ্যের সরবরাহ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে; জ্বালানির ব্যয় ও পরিবহন খাতের ওপরও নজর দিতে হবে।
আমদানিনির্ভর পণ্যে বাড়ছে চাপ
মূল্যস্ফীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো আমদানিনির্ভর পণ্যের অবদান বৃদ্ধি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে মোট মূল্যস্ফীতিতে আমদানিনির্ভর খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের অবদান আগের প্রান্তিকের ২৪.৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৭ শতাংশ হয়েছে। বিপরীতে দেশীয় পণ্যের অবদান ৭৫.১ থেকে কমে ৭৩ শতাংশ হয়েছে।
এ পরিবর্তন ইঙ্গিত করে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পণ্যমূল্য, আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ ও বিনিময় হারের পরিবর্তনও মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। আমদানিনির্ভর কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্যের ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব উৎপাদন থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। প্রতিবেদনে আরো দেখা যায়, জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে অধিকাংশ নিত্যপণ্যের খুচরা ও পাইকারি গড় দাম আগের প্রান্তিকের তুলনায় বেড়েছে। তবে মাঝারি মানের চাল, সয়াবিন তেল ও সোনালি মুরগির েেত্র ব্যতিক্রম ছিল। কাঁচামরিচ ও পেঁয়াজের দামে উল্লেখযোগ্য ওঠানামা হয়েছে।
মজুরি বৃদ্ধির চেয়ে দাম বাড়ছে দ্রুত
সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্কট বোঝার জন্য শুধু মূল্যস্ফীতির হার নয়, মজুরি বৃদ্ধির গতিও বিবেচনা করা জরুরি। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথম প্রান্তিকে মজুরি ও মূল্যস্ফীতির ব্যবধান কিছুটা কমলেও প্রান্তিকের শেষ দিকে আবার বাড়তে শুরু করে। এর প্রধান কারণ মূল্যস্ফীতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি নয়, বরং মজুরি বৃদ্ধির গতি দুর্বল হয়ে পড়া।
বিবিএসের সেপ্টেম্বরের তথ্যানুযায়ী, জাতীয় মজুরি হার সূচকের বার্ষিক বৃদ্ধির হার আগস্টের ৮.০৫ শতাংশ থেকে কমে সেপ্টেম্বরে ৭.৯০ শতাংশ হয়েছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৩৪ শতাংশ; অর্থাৎ মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে ০.৪৪ শতাংশীয় পয়েন্ট কম।
এর অর্থ গড় হিসাবে মজুরি বাড়লেও সেই আয় দিয়ে পণ্য ও সেবা কেনার সমতা একই হারে বাড়ছে না। যেসব পরিবারের আয়ের বড় অংশ খাদ্য, বাসাভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা ও শিায় ব্যয় হয়, তাদের ওপর এই ব্যবধানের প্রভাব বেশি পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে মজুরি সূচক সব শ্রমিকের প্রকৃত আয় বা সব পরিবারের ব্যয়ের পূর্ণ চিত্র নয়। কর্মসংস্থানের ধরন, কাজের সময়, পরিবারের সদস্যসংখ্যা এবং ব্যক্তিভেদে ব্যয়ের কাঠামোর কারণে বাস্তব চাপের মাত্রা ভিন্ন হতে পারে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতিগত চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে মূল্যস্ফীতি কমার পেছনে অনুকূল ভিত্তি-প্রভাবের ভূমিকার কথা বলা হয়েছে। আগের বছরের তুলনামূলক উচ্চ মূল্যস্তরের কারণে বর্তমান বছরের মূল্যস্ফীতির হার কম দেখাতে পারে। কিন্তু একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সব প্রধান শ্রেণীতেই মাসভিত্তিক মূল্যবৃদ্ধির গতি ইতিবাচক ছিল; অর্থাৎ বার্ষিক হার কমলেও মূল্যস্তর বৃদ্ধির প্রবণতা পুরোপুরি থেমে যায়নি।
এখানেই নীতিনির্ধারকদের জন্য চ্যালেঞ্জ। এক দিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, অন্য দিকে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও বেসরকারি বিনিয়োগে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা যাবে না। শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে সরবরাহজনিত মূল্যবৃদ্ধি সামাল দেয়া কঠিন। খাদ্যপণ্যের সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করা, বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, মধ্যস্বত্বভোগীদের অযৌক্তিক প্রভাব কমানো এবং আমদানি ও পরিবহন ব্যয়ের ঝুঁকি মোকাবেলাও জরুরি। একই সাথে নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য ল্যভিত্তিক সামাজিক সুরা, কার্যকর খাদ্যসহায়তা এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির উদ্যোগ প্রয়োজন। মজুরি বৃদ্ধির সাথে উৎপাদনশীলতার সামঞ্জস্য তৈরি না হলে শুধু প্রশাসনিকভাবে মজুরি বাড়ানোও দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করতে পারে।
সামনে কী অপো করছে
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রান্তিক প্রতিবেদন মূল্যস্ফীতির েেত্র কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখালেও সেপ্টেম্বরের মাসিক তথ্য সতর্ক হওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমার পর আবার বাড়া, জ্বালানি খাতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আমদানিনির্ভর পণ্যের ক্রমবর্ধমান অবদান এবং মজুরি বৃদ্ধির মন্থরতাÑ সব মিলিয়ে মূল্যস্থিতি এখনো নাজুক।
বিশেষ করে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পরিবহন, কৃষি উৎপাদন, শিল্পের কাঁচামাল ও পণ্য সরবরাহের ব্যয়ে কতটা ছড়িয়ে পড়ে, তা আগামী মাসগুলোর মূল্যস্ফীতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হবে।
সারকথা, মূল্যস্ফীতির হার কমা এবং মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমা এক বিষয় নয়। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রকৃত স্বস্তি আসবে তখনই, যখন পণ্যমূল্য স্থিতিশীল হওয়ার পাশাপাশি মজুরি ও আয় বৃদ্ধির গতি বাড়বে, কর্মসংস্থান শক্তিশালী হবে এবং সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়মতার উন্নতি ঘটবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








