গণপূর্তের ইএম শাখায় লটারি নিয়ে অসন্তোষ

ইকবাল মজুমদার তৌহিদ 

Advertisement

গণপূর্ত অধিদফতরের ইলেকট্রিক্যাল-মেকানিক্যাল (ইএম) শাখার নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি ও পদায়নে লটারি পদ্ধতি নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। কর্মকর্তাদের শ্রেণিবিন্যাস, কয়েকটি বিশেষ ক্যাটাগরি তৈরি এবং কিছু কর্মকর্তাকে লটারির বাইরে রাখার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাদের অভিযোগ, লটারির মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কথা বলা হলেও ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিভাগে পদায়নের ক্ষেত্রে বৈষম্য ও পক্ষপাতের সুযোগ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া শ্রেণিবিন্যাসের মানদণ্ড কী ছিল এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সংশ্লিষ্ট শাখার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মতামত নেয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
জানা যায়, ইএম শাখার প্রায় ৩০ জন নির্বাহী প্রকৌশলীকে পাঁচটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে লটারি করা হয়। অন্যদিকে, গণপূর্ত অধিদফতরের সিভিল শাখার প্রায় ১২০ জন নির্বাহী প্রকৌশলীকেও পাঁচটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়। দুই শাখায় কর্মকর্তার সংখ্যার এত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও একই সংখ্যক ক্যাটাগরি করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
তাদের দাবি, ক্যাটাগরি নির্ধারণে কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতা, অভিজ্ঞতা, অতীত কর্মদক্ষতা ও দায়িত্ব পালনের রেকর্ড যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। কয়েকজন কর্মকর্তাকে বিশেষ ক্যাটাগরিতে রেখে পছন্দের কর্মস্থলে পদায়নের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। 
ক্যাটাগরি ‘এ’ নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগকারীদের দেয়া তথ্যে ক্যাটাগরি ‘এ’-তে থাকা কয়েকজন নির্বাহী প্রকৌশলীর নাম উল্লেখ করে তাদের অভিজ্ঞতা, অতীত কর্মস্থল ও পদায়নের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাব্বির ইশতিয়াক, আনোয়ার হোসেন, জুবায়ের মিঠুন, তরিকুল আলম, এস এম ময়নুল হক, কাজী মাশফিক আহমেদ, নাজমুল আলম রব্বানী, রুবাইয়াত ইসলাম, হাসান ইবনে কামাল ও মোর্শেদ ইকবাল।
অভিযোগকারীদের দাবি, ক্যাটাগরি ‘এ’-তে কোন মানদণ্ডে কর্মকর্তাদের রাখা হয়েছে, তা স্পষ্ট করা হয়নি। এ ক্যাটাগরিতে থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে কারো কারো অভিজ্ঞতা ও অতীত দায়িত্ব পালনের রেকর্ড বিবেচনায় নেয়া হয়েছিল কি না, সে প্রশ্নও তুলেছেন তারা।
সাব্বির ইশতিয়াককে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ইএম গণপূর্ত বিভাগ-১-এ পদায়ন করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। তিনি আওয়ামী আমলে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী ছিলেন। এছাড়া ছাত্রজীবনে সরাসরি ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন বলে জানা যায়।
জুবায়ের মিঠুনকে লটারিতে অন্তর্ভুক্ত করার সময় নির্বাহী প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্বের সরকারি আদেশ জারি হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাদের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট সময়ে তার প্রশাসনিক পদমর্যাদা ও দায়িত্বের অবস্থান স্পষ্ট না করে তাকে নির্বাহী প্রকৌশলীদের লটারিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়ে থাকলে তার ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
লটারির বাইরে কারা, কেন
লটারিতে অংশগ্রহণকারী ও বাদ পড়া কর্মকর্তাদের নির্বাচনপ্রক্রিয়া নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কিছু কর্মকর্তাকে বিশেষ বিবেচনায় লটারির বাইরে রাখা হয়েছে। অথচ কয়েক মাস আগে পদায়ন পাওয়া কিছু কর্মকর্তাকে লটারিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকা কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে একই নীতি অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
অভিযোগকারীরা আরো বলেন, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা কেপিআই হিসেবে বিবেচিত কর্মস্থলের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা থাকলে তার লিখিত নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। কোন পদ বা কর্মস্থলকে বিশেষ বিবেচনায় রাখা হয়েছে, কোন কর্মকর্তাকে কেন লটারিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি এবং এসব সিদ্ধান্ত কে নিয়েছেন- তা প্রকাশ করা হলে বিতর্ক কমতে পারে।
তাদের ভাষ্য, লটারির আগে ক্যাটাগরি নির্ধারণের কাজে ইএম শাখার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মতামত নেয়া হয়েছিল কি না, সেটি পরিষ্কার নয়। সরাসরি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মূল্যায়নের পরিবর্তে অন্য কোনো ভিত্তিতে কর্মকর্তাদের শ্রেণিবিন্যাস করা হয়ে থাকলে তার যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করা দরকার।
দরপত্র ও পদায়ন নিয়ে অভিযোগ
লটারিতে অন্তর্ভুক্ত কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দরপত্র, প্রকল্প বাস্তবায়ন, সরকারি অর্থের ব্যবহার এবং ঠিকাদারদের সাথে সম্পর্ক নিয়ে অভিযোগও তোলা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দেয়া তথ্যে এস এম ময়নুল হক, আনোয়ার হোসেন, কাজী মাশফিক আহমেদ ও সৈয়দ তামজিদ হোসেনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
এস এম ময়নুল হকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দরপত্রে অনিয়ম, পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেয়া এবং প্রকল্পে নিম্নমানের সরঞ্জাম ব্যবহারের অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগকারীরা কয়েকটি দরপত্রের পরিচিতি নম্বরও দিয়েছেন। 
আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে সরকারি প্রকল্পের কাজ এবং সম্পদের উৎস নিয়ে অভিযোগের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ জমা পড়েছে।
কাজী মাশফিক আহমেদ ও সৈয়দ তামজিদ হোসেনের বিরুদ্ধেও প্রকল্পের ব্যয়, দরপত্র এবং পদায়ন নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ তোলা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সংশ্লিষ্ট নথি, তদন্তের ফলাফল কিংবা কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। 
দায়িত্ব নিচ্ছে না কেউ
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, লটারি আয়োজন ও শ্রেণিবিন্যাসের দায়িত্ব কারা পালন করেছেন, তা নিয়েও অস্পষ্টতা রয়েছে। তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট দফতরে যোগাযোগ করলে কেউ কেউ লটারির আয়োজনের দায়িত্ব মন্ত্রণালয়ের বলে উল্লেখ করেছেন; আবার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আয়োজনের দায়িত্ব অধিদফতরের বলে জানানো হয়েছে। তবে এ বক্তব্যের স্বাধীন সমর্থন পাওয়া যায়নি।
লটারির মাধ্যমে বদলি ও পদায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে এর নিয়ম, ক্যাটাগরি নির্ধারণের মানদণ্ড এবং বিশেষ বিবেচনায় কাউকে অন্তর্ভুক্ত বা বাদ দেয়ার কারণ স্পষ্ট করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন অভিযোগকারীরা। তাদের মতে, লটারির ফলাফল নিয়ে বিতর্ক এড়াতে পুরো প্রক্রিয়ার নথি সংরক্ষণ ও প্রয়োজন অনুযায়ী প্রকাশ করা উচিত।