
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
কালেভদ্রেই যেন আমাদের পুঁজিবাজারগুলো ভালো আচরণে দেখা যায়। গতকালও তেমনটিই ঘটল। ধারাবাহিক পতনের পর হঠাৎ ঘুরে দাঁড়াল পুঁজিবাজারগুলো। কিন্তু হঠাৎ বাজার আচরণ বদলে যাওয়ার পেছনে কি বাজারে চলমান লভ্যাংশ ঘোষণার ভূমিকা রয়েছে, এমন প্রশ্ন সংশ্লিষ্ট অনেকের। ভালো লভ্যাংশ ঘোষণা করার পরও গত ক’দিন ধরে যেসব কোম্পানি টানা দর হারাচ্ছিল গতকাল সেসব কোম্পানির বেশির ভাগেরই মূল্যবৃদ্ধি ঘটতে দেখা যায়। তাই এ মুহূর্তে পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন- তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ভালো লভ্যাংশ ঘোষণা পুঁজিবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের তলানিতে নেমে আসা আস্থা কি পুনরায় ফেরাতে পারবে?
পুঁজিবাজারের ধারাবাহিক দরপতনের মধ্যেও থেমে নেই তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ ঘোষণা। তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে ভালো কোম্পানি যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানিও। কিন্তু লিস্টিং রেগুলেশন অনুযায়ী অর্থবছর শেষে তালিকাভুক্ত সবগুলো কোম্পানিকেই পর্ষদ সভা করে বিদায়ী অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ ও লভ্যাংশ ঘোষণা করার নিয়ম মেনে চলতে হয়। ১ জুলাই ২০২৫ থেকে শুরু হওয়া অর্থবছর শেষ হয়েছে গত ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই উল্লিখিত সময়ে অর্থবছর শেষ করে কোম্পানিগুলো এ মুহূর্তে পর্ষদ সভা ও লভ্যাংশ ঘোষণা নিয়েই ব্যস্ত।
আমাদের দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে দুইভাবে অর্থবছরের আর্থিক বিবরণী প্রকাশ করার নিয়ম রয়েছে। ব্যাংক, বীমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর অর্থবছর হিসাব করা হয় জানুয়ারি- ডিসেম্বর। অপর দিকে এর বাইরে থাকা কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের অর্থবছর হিসাব করা হয় জুলাই-জুন। সে হিসাবে দেশের সরকারি-বেসরকারি শিল্প ও সেবা খাতের কোম্পানিগুলোর অর্থবছর শেষ হয়েছে ৩০ জুন। ফলে সেপ্টেম্বর মাসের শুরু থেকেই অর্থবছর শেষ করা কোম্পানিগুলো লভ্যাংশ ঘোষণা শুরু করেছে যা আরো কিছুদিন চলবে।
ইতোমধ্যে বাজারে ব্লুচিপস নামে খ্যাত বেশ কয়েকটি কোম্পানি লভ্যাংশ ঘোষণা শেষ করেছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, স্কয়ার টেক্সটাইলস, অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ, বিএসসি পিএলসি, বিএসআরএম লি., বিএসআরএম স্টিলস, মোবিল যমুনা, ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন, ওয়ালটন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজ, ইস্টার্ন হাউজিং, একমি ল্যাবরেটরিজ, শাহজিবাজার পাওয়ার কোম্পানি, মতিন স্পিনিং ও এনভয় টেক্সটাইলসের মতো কোম্পানি। এগুলোর বেশির ভাগই গত অর্থবছরের মতো আবার কোনো কোনোটি তারও বেশি লভ্যাংশ ঘোষণা শেষ করেছে; কিন্তু লভ্যাংশ ঘোষণার কোনো প্রভাব পরবর্তী সময়ের বাজার আচরণে ছিল অনুপস্থিত।
বাজারসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, যত ভালো লভ্যাংশ ঘোষণা করা হোক না কেন, বাজার ভালো না হলে তার কোনো প্রভাব বাজার আচরণে পড়ে না। এটি বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপরই নির্ভর করে। তবে এটাও ঠিক পুঁজিবাজারে কোনো কিছুই আগাম বলা যায়না। এখানে ধারাবাহিক পতন যেমন ঘটছে তেমনি সূচকের উন্নতি ঘটতেও সময় লাগে না। কোনো কারণ ছাড়া গত কিছুদিন ধরে বাজার সূচক হারাচ্ছে। আবার বিনিয়োগকারীরা যদি মনে করেন, কোম্পানি কর্তৃক ঘোষিত লভ্যাংশ বাজারের চলমান মূল্যস্তরের বিচারে ইতিবাচক তখন তারা নতুনভাবে বাজারের প্রতি আস্থা আনতেই পারেন। আর এটাই হয়তো বাজারের ঘুরে দাঁড়ানোর কারণ।
এ দিকে টানা তিন দিন পতনের পর গতকাল দেশের দুই পুঁজিবাজারেই সূচকের উন্নতি ঘটে। লেনদেনের প্রায় পুরোটা সময়জুড়েই ভালো ছিল বাজার আচরণ। এর ফলে সূচকের উন্নতি যেমন ঘটেছে তেমনি বৃদ্ধি পেয়েছে লেনদেনও। এটাই প্রমাণ করে বাজার ভালো থাকলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরতে সময় লাগে না। তবে গতকালের এ আচরণ কতটুকু টেকসই হবে তা সময়ই বলে দেবে। আজ সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসেও বেশ কিছু কোম্পানির লভ্যাংশ ঘোষণার কথা রয়েছে। তাই আজকের বাজার আচরণই বলে দেবে সামনের দিনগুলো কেমন যাবে।
প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৪৬ দশমিক ৭২ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। ৫ হাজার ৩৮৬ দশমিক ৫৪ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি গতকাল লেনদেনশেষে পৌঁছে যায় ৫ হাজার ৪৩৩ দশমিক ২৬ পয়েন্টে। একই সময় পুঁজিবাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৮ দশমিক ৩৯ ও ৭ দশমিক ৭১ পয়েন্ট। অনুরূপভাবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই গতকাল ৫৬ দশমিক ৩৩ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। ১৪ হাজার ৪৮৯ দশমিক ৬১ পয়েন্ট থেকে সকালে যাত্রা করা সূচকটি ওই দিন বিকেলে লেনদেন শেষে স্থির হয় ১৪ হাজার ৫৪৬ দশমিক ১৪ পয়েন্টে। এ সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৪২ দশমিক ৬০ ও ১২ দশমিক ২২ পয়েন্ট।
সূচকের এ উন্নতির ফলে গতকাল ঢাকা শেয়ারবাজারে লেনদেনেরও উন্নতি ঘটে। ডিএসই গতকাল
৪৪০ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ৩৭ কোটি টাকা বেশি। মঙ্গলবার ডিএসই’র লেনদেন ছিল ৪০৩ কোটি টাকা। একইভাবে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারের লেনদেনও পৌঁছে যায় ৫৮ কোটি টাকায় যা আগের দিনের চেয়ে ৪৪ কোটি টাকা বেশি। আগের দিন সিএসই’র লেনদেন ছিল ১৪ কোটি টাকা।
গতকাল ডিএসই’র লেনদেনের শীর্ষে ছিল ব্যাংকিং কোম্পানি সিটি ব্যাংক। ১৫ কোটি ৮৮ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৫৩ লাখ ২৯ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ১৫ কোটি ৩০ লাখ ১২ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে দিনের দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল প্রকৌশল খাতের আনোয়ার গ্যালভেনাইজিং। লেনদেনে ডিএসই’র শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ব্র্যাক ব্যাংক, ইভিন্স টেক্সটাইলস, প্রাইম ফিন্যান্স, ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, প্রাইম ব্যাংক, মতিন স্পিনিং, সায়হাম টেক্সটাইলস, এপেক্স স্পিনিং ও সোনালী আঁশ।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








