
আনাদোলু
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ নামাতে এবং চলমান সঙ্ঘাতের বিস্তার রোধ করতে পারস্পরিক কূটনৈতিক যোগাযোগ ও সমন্বয় জোরদার করেছে মিসর, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। আঞ্চলিক সঙ্কটের একটি স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান খুঁজতে তুরস্ক ও পাকিস্তানকে সাথে নিয়ে গঠিত চার পক্ষীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের সমন্বয় কাঠামোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে কায়রো।
গত মঙ্গলবার মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদুল আতি সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান এবং আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল্লাহ বিন জায়েদের সাথে পৃথক দু’টি টেলিফোন আলাপ করেন। বুধবার মিসরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত আলাদা দু’টি বিবৃতিতে এই ফোনালাপের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়। সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে ফোনালাপে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির সর্বশেষ অবনতি এবং এর সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বর্তমান সামরিক উত্তেজনার তীব্র ঝুঁকি তুলে ধরে মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন যে, সঙ্ঘাতের পরিধি না বাড়িয়ে এখন আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক উপায়ে সঙ্কট সমাধান করা অত্যন্ত জরুরি। আলাপকালে দুই দেশের মন্ত্রীরা দ্বিপক্ষীয় পরামর্শ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি মিশর, পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের সমন্বয়ে গঠিত চার দলীয় কাঠামোর আওতায় সম্মিলিত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছান। এই আঞ্চলিক কূটনৈতিক ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা প্রশমনে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় সাধন করা।
এই কূটনৈতিক তৎপরতার ঠিক আগের দিন মিসরের পার্লামেন্টে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে দেশটির প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসিকে একটি বিশেষ সাংবিধানিক ম্যান্ডেট প্রদান করা হয়। এই অনুমোদনের ফলে সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ড এবং পবিত্র স্থানগুলোর সুরক্ষায় যৌথ পদক্ষেপে যেকোনো প্রয়োজনীয় সামরিক বা প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের এখতিয়ার লাভ করেছে মিসরীয় বাহিনী। চলতি বছরের জুলাই মাস থেকে ইয়েমেনের হাউছি বিদ্রোহী গোষ্ঠী এবং সৌদি আরবের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া সামরিক সংঘর্ষের প্রেক্ষাপটে এই কূটনৈতিক ও সামরিক তৎপরতা দৃশ্যমান হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের অসামরিক বিমান চলাচল কেন্দ্র এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হাউছিদের পক্ষ থেকে ধারাবাহিক হামলা চালানো হয়।
উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ইয়েমেনের রাজধানী সানাসহ দেশটির বড় একটি অংশ হাউছিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং এর বিপরীতে ২০১৫ সালের মার্চ মাস থেকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে পুনর্বহাল করতে একটি সামরিক জোটের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে রিয়াদ।
অন্য দিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল্লাহ বিন জায়েদের সাথে আলাপকালে আঞ্চলিক পরিস্থিতির তীব্র অবনতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বদর আবদুল আতি অভিমত ব্যক্ত করেন যে, বর্তমান পরিস্থিতি যাতে কোনো অবস্থাতেই আরো বিপজ্জনক ও অনিয়ন্ত্রিত মোড় না নেয়, সে জন্য আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাজনৈতিক বন্দোবস্তের পথ সুগম করতে হবে। এই জোরদার আঞ্চলিক কূটনীতির নেপথ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান উত্তেজনা প্রশমনের প্রচেষ্টা এবং হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত জটিলতা। বিশ্ব বাণিজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের পথটি উন্মুক্ত রাখা এবং নৌ চলাচলের শর্ত নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মতবিরোধ এখনো কাটেনি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানকে লক্ষ্য করে আমেরিকা ও ইসরাইল যৌথ সামরিক হামলা পরিচালনার পর এবং এর জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও ইসরাইলে ইরানের পাল্টা আক্রমণের মাধ্যমে সঙ্কট চরমে পৌঁছায়। পরবর্তীতে গত ১৮ জুন দুই পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলেও হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা ও নৌ চলাচলের কড়াকড়ি ইস্যুতে সেই আলোচনা বর্তমানে স্থবির রয়েছে। আঞ্চলিক পরিস্থিতির সার্বিক গভীরতা ও হুমকি বিবেচনা করে কায়রো এখন রিয়াদ, আবুধাবি, আঙ্কারা এবং ইসলামাবাদের সাথে কূটনৈতিক যোগাযোগ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে, যাতে পুরো অঞ্চলটিকে একটি সর্বাত্মক যুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








