
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
দুই সপ্তাহ বন্ধ থাকার পর আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের জন্য আবারো চালু হয়েছে সৌদি আরবের প্রধান বিমানবন্দর কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। তবে সৌদির রাজধানী রিয়াদ লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রেখেছে ইয়েমেনের হাউছিরা। এমন পরিস্থিতিতে বিমানবন্দরটিকে এখনো ‘অনিরাপদ’ বলে সতর্ক করেছে গোষ্ঠীটি।
বমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গতকাল রোববার কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল ১ ও ২ থেকে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচল আবার শুরু হয়েছে। এর আগে গত সপ্তাহে বিমানবন্দরটিতে সীমিত পরিসরে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট চালু করা হয়েছিল। হাউছিদের প্রাণঘাতী হামলায় বিমানবন্দরটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রায় দুই সপ্তাহ পর আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচলও স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেয়া হলো। তবে হামলার আশঙ্কা এখনো কাটেনি। হাউছি সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বিমানবন্দরটিকে এখনো ‘অনিরাপদ’ বলে উল্লেখ করেছেন। আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক ও স্থানীয় সব বিমান সংস্থা, তাদের কর্মী এবং যাত্রীদের রিয়াদ বিমানবন্দর ব্যবহার না করার সতর্কবার্তা দিয়েছেন তিনি। ইয়াহিয়া সারি বলেন, বিমানবন্দরটি অনিরাপদ এবং তাদের বাহিনীর জন্য সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ফলে বিমানবন্দর চালু হলেও সেখানে ফ্লাইট পরিচালনা ও যাতায়াতের ক্ষেত্রে ঝুঁকি রয়েছে বলে দাবি করেছে হাউছি গোষ্ঠী। এ দিকে সৌদি আরবের সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ তায়েফ ও জাজান অঞ্চলে জারি করা সম্ভাব্য বিপদ সঙ্কেত তুলে নিয়েছে। স্থানীয় সময় বেলা ১২টা ৫৩ মিনিটে (জিএমটি সকাল ৯টা ৫৩ মিনিট) মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বাসিন্দাদের কাছে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছিল। পরে এক বিবৃতিতে সিভিল ডিফেন্স জানায়, বিপদের আশঙ্কা কেটে গেছে। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলতে এবং যেকোনো ধরনের জমায়েত ও ছবি তোলা থেকে বিরত থাকতে বাসিন্দাদের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। রিয়াদের বিমানবন্দর পুনরায় চালু হওয়া সত্ত্বেও হাউছিদের হুমকি এবং রাজধানী লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত থাকার বিষয়টি সৌদি আরবের বিমান চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
মক্কা-মদিনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগ অস্বীকার হাউছিদের
এ দিকে এনডিটিভি জানিয়েছে, সৌদি আরবের মক্কা ও মদিনা অভিমুখে ছোড়া দু’টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি করেছে দেশটির সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ। তবে এসব ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে ইয়েমেনের হাউছি বিদ্রোহীরা। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যেই সৌদি আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে নিরাপত্তা সতর্কতা জারি হয়েছে। শনিবার সৌদি আরবের বেসামরিক প্রতিরক্ষা অধিদফতর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক বিবৃতিতে জানায়, হাউছিদের ছোড়া দু’টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার পর সেগুলোর ধ্বংসাবশেষ মক্কা ও মদিনা অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে পড়ে।
বিবৃতিতে বলা হয়, মক্কার বাইরে ওয়াদি মুঘামাস, জেদ্দার আল-নুঝা এলাকা, তাইফের ওয়াদি জালিল ও রাবিগের একটি জনবসতিহীন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়েছে। তবে এসব ঘটনায় হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়নি। অন্য দিকে মক্কা ও মদিনার মতো ইসলামের দুই পবিত্র নগরীকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার অভিযোগ সরাসরি নাকচ করেছে হাউছিরা। সংগঠনটির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেছেন, সৌদি আরবের পক্ষ থেকে তাদের বাহিনী পবিত্র এলাকাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা।
সৌদিতে ৭ হামলার দাবি হাউছিদের
তবে সৌদি আরবে সাতটি হামলা চালানোর দাবি করেছে ইয়েমেনের হাউছিরা। এক বিবৃতিতে গোষ্ঠীটি জানায়, তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল দেশটির বিভিন্ন বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা ও সামরিক ঘাঁটি। হাউছিদের দাবি, হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ বিমানবন্দর, ইয়ানবুতে আরামকোর স্থাপনা, রাবিগ তেল শোধনাগার এবং পূর্ব থেকে পশ্চিমে অপরিশোধিত তেল পরিবহনের পাইপলাইন ও পাম্পিং স্টেশন। এ ছাড়া দাম্মামের কিং ফাহদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, নাজরান বিমানবন্দর ও খামিস মুশাইত বিমানঘাঁটিও এ হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল। এ ছাড়া পাইপলাইন ও পাম্পিং স্টেশন লক্ষ্য করে চালানো অভিযান সফল হয়েছে বলে দাবি করেছে তারা।
অন্য দিকে সৌদি আরবের সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, মক্কা ও মদিনা অঞ্চলের দিকে হাউছিদের ছোড়া দু’টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। এ ঘটনায় দুই অঞ্চলে সিভিল ডিফেন্সের দল অংশ নেয়। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলায় অনুমোদিত জরুরি ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র দু’টি প্রতিহত করার পর সেগুলোর কিছু অংশ মক্কার ওয়াদি আল মুগাম্মাস এলাকায় পড়ে। এ ছাড়া প্রতিহত করার সময় সৃষ্ট ধ্বংসাবশেষের খণ্ড জেদ্দার আল নুজহা এলাকা, তায়েফের ওয়াদি জলিল ও রাবিগের মাস্তুরাহ সেন্টারে গিয়ে পড়ে। তবে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মক্কা ও মদিনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছে হাউছিরা। গোষ্ঠীটির দাবি, তাদের অভিযান সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করেই পরিচালিত হয়েছে।
১০ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতের দাবি সৌদির
এ দিকে হাউছি বিদ্রোহীদের ছোড়া ১০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত ও ধ্বংস করার দাবি করেছে সৌদি আরব। খবর আলজাজিরার। দেশটির দক্ষিণাঞ্চল লক্ষ্য করে এসব ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল বলে জানিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে বলেন, “সন্ত্রাসী হাউছি মিলিশিয়াদের দক্ষিণাঞ্চল লক্ষ্য করে ছোড়া ১০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত ও ধ্বংস করা হয়েছে।” তবে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ঠিক কোথা থেকে ছোড়া হয়েছিল, প্রতিহত করার সময় কোনও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কি না কিংবা এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়েছেন কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি। ইয়েমেনে হাউছিদের কাছ থেকে উপকূলীয় এলাকা পুনর্দখলে পাল্টা অভিযান শুরু করেছে দেশটির সরকারি বাহিনী। লোহিত সাগরে প্রবেশপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালীর কাছাকাছি এলাকায় এই অভিযান চলছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের উল্লেখযোগ্য অংশ চলাচল করে।
গত মাসে ইয়েমেনে সঙ্ঘাতের তীব্রতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এর ফলে জাতিসঙ্ঘের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়ে। ২০২২ সাল থেকে ওই যুদ্ধবিরতি মোটামুটি বজায় ছিল। সাম্প্রতিক সংঘর্ষ ও পাল্টা অভিযান দেশটির দীর্ঘদিনের সঙ্ঘাতকে আরো জটিল করে তুলেছে। সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি এবং বাব আল-মানদেবের আশপাশে লড়াইয়ের তীব্রতা বৃদ্ধি- দুই ঘটনাই ইয়েমেন ও আশপাশের অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তবে সৌদি জোটের দেয়া তথ্যের বাইরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিষয়ে হাউছিদের কোনো বক্তব্য বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য এখানে উল্লেখ করা হয়নি।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








